শাহিন-তুলি, হারানো…

শাহিন ও তুলির সম্পর্কটা স্বামী-স্ত্রীর, প্রেমিক-প্রেমিকার এবং বন্ধুর। ভিন্ন দুজন মানুষের কাছে স্বাভাবিকভাবেই জীবনটা দুরকম। এই দুজন দুজনের চোখে জীবনটাকে জানতে চায়, দেখতে চায়, বুঝতে চায়। এই নিয়ে তাদের গল্প। ভালবাসার হাত ধরে জীবনকে খোঁজার গল্প…

তুলিঃ তুমি অনেক বড় বড় কথা বল। বড় বড় কথাগুলো শুনতে ভয় লাগে বড়ো। 

শাহিনঃ কীরকম? 

তুলিঃ এই যে, সত্যের কথা বল, সততার কথা বল, ভালোবাসার কথা বল। এই কথাগুলো কেউ বলছে না। তুমি বলছ কেন? তুমি কি দেখছ না মানুষ বড্ড ক্লান্ত হতাশ বিষণ্ণ? তুমি নিজেও কি ক্লান্ত হও নি? ধাক্কা খাও নি? কষ্ট পাও নি? এরপরও কী করে বল? 

শাহিনঃ এমনি এমনি তো বলি না তুলি 

তুলিঃ জানি তুমি এমনি বল না। কিন্তু কি করে বল আমি বুঝে পাই না। মাঝে মাঝে মনে হয় তুমি বড় একটা বাচ্চা। যে বাচ্চার এইমাত্র চোখ ফুটেছে, তাই পৃথিবীটার রঙ রস দেখার সাহস পাচ্ছে। যে বাচ্চাটা অন্ধকার দেখে নি। যদিও আমি জানি, অন্ধকারের ভেতর দিয়ে তুমি হেঁটেছ বহুবার…  

শাহিনঃ আমাকে কি খুব অদ্ভুত লাগে? 

তুলিঃ বিশ্বাস করতে ভয় লাগে 

শাহিনঃ কীরকম ভয়? 

তুলিঃ যদি একদিন দেখি, তুমি আর সবার মতো হয়ে গেছ, তোমার ভেতরের এই শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলেছ। যদি দেখি, তোমার কাছে যে আশ্রয় আমি খুঁজতে এসেছিলাম, তা নিভে গেছে। অনেক ক্লান্তি অবসাদে জড়িয়ে গেছ তুমি। আর সবার মতো। তখন আমি তোমাকে কোথায় পাব? 

শাহিনঃ সে উত্তর আমার জানা নেই, তবে কিছু উত্তর আমি দিতে পারি…  

তুলিঃ তাহলে দাও, একটু আশ্বাস পাই 

শাহিনঃ মানুষ একা বাঁচতে পারে না। সে নিজে নিজে তার ভেতরের শক্তিকে বের করে আনতে পারে না। কিছুটা পারলেও পুরোপুরি পারে না। বা বেশিরভাগ পারে না। বারবার সে তার পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। তার শারীরিক শক্তি বিকাশের জন্যে যেমন ট্রেইনার প্রয়োজন হয়, মানসিক শক্তি বিকাশের জন্যে জ্ঞান প্রয়োজন হয়, সেই জ্ঞানটা কিন্তু আমরা অন্য মানুষের কাছ থেকে নেই। তাদের লেখা থেকে বই থেকে কথা থেকে। আমাদের আগে যারা এসেছেন, তাদের কাছ থেকে। 

তুলিঃ আর? 

শাহিনঃ আর থাকে আত্মিক শক্তি, অন্তরের শক্তি। সে শক্তি উপলব্ধির জন্যে আত্মিক আধ্যাত্মিক মানুষদের সংস্পর্শ প্রয়োজন। তাদের ছায়া ছাড়া এর বিকাশ থমকে যায়। তার জন্যে নবী রসুল, আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, আত্মিক গুরু – তাদের ছায়াতল প্রয়োজন। আর এর সাথে যদি একজন জীবিত আত্মিক গুরুকে পাওয়া যায়, তার কাছাকাছি থাকা যায়, তাহলে পথটা অনেক সহজ হয়ে যায়।

তুলিঃ তুমি এ কোন জগতের কথা বলছ শাহিন? এরকম আমি শুনি নি। এই জগতের সাথে আমি পরিচিত নই। 

শাহিনঃ জীবনের প্রতিটা দিনই তো অপরিচিত, তুলি। প্রতিটা মুহূর্ত। এই ব্যাপারটা অপরিচিত হওয়া তো দোষের কিছু নয়। 

তুলিঃ তা নয়… 

শাহিনঃ মানুষ অজানাকে ভয় পায়। এ তোমার দোষ নয়। 

তুলিঃ হ্যাঁ, কেন যেন ভয় পাচ্ছি শুধু শুধু 

শাহিনঃ আত্মিক জগতে ভয়ের কিছু নেই তুলি। এই ব্যাপারে সুনিশ্চিত থাকতে পারো। এখানে অন্ধ ভক্ত হওয়া বা কোনো কাল্ট ফলো করার কোনো ব্যাপার নেই। এখানে সবকিছু খোলামেলা, দৃশ্যমান হয়েও অদৃশ্য। সুফিদের দেখো। রুমিকে দেখো। শামস তাবরিজকে দেখো…  

তুলিঃ আমার বোধয় হারিয়ে যাবার ভয় হয়। যদি হারিয়ে যাই, যদি তুমি হারিয়ে যাও? 

শাহিনঃ আবদ্ধ হয়ে থাকার চেয়ে হারিয়ে যাওয়াই কি ভালো নয়? একসাথে হারালাম? 

তুলিঃ একসাথে হারাবো? 

শাহিনঃ প্রভু যদি চান 

তুলিঃ যদি না চান? 

শাহিনঃ তবে অপেক্ষায় রবো।

তুলিঃ থাকবে তো? 

শাহিনঃ থাকব। 

বাকি পর্বগুলো –
তোমার কাছে ফেরা || শাহিন-তুলি – লিঙ্ক
পর্বঃ ৬ || শাহিন-তুলি – লিঙ্ক 
বন্ধুর হাত ।| শাহিন-তুলি – লিঙ্ক
ভয়গুলো, ভুলগুলো || শাহিন-তুলি, – লিঙ্ক   
পর্ব-৯ || শাহিন-তুলি  – লিঙ্ক 
খুঁজে পাওয়া… || শাহিন-তুলি – লিঙ্ক 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *