প্যালিয়াটিভ জীবন

না, আশা নেই, মিথ্যা নয়। মৃত্যু শিয়রে দাঁড়িয়ে, মিথ্যা নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সীমারেখা স্পষ্ট, মোটাদাগে। মিথ্যা নয়। জীবনের চেয়েও বেশি মৃত্যুর যোগ্য সে জীবন, মিথ্যা নয়। আর কিছুদিনও নয়। এখুনি, বা তখনই। কাল বা পরশু। মিথ্যা নয়। এবারই শেষবার, হয়তো। মিথ্যা নয়।

সমাপ্তিকে বরণ,পরিণতিকে গ্রহন। নিয়তির নিকট আত্মসমর্পণ। মিথ্যা কিছুই নয়। তবে সত্যটাও ঠিক সত্যের মতন স্পষ্ট নয়…শেষও যদি শেষ না হয়? সীমিতও যদি সীমানাকে ছাড়িয়ে যায়? জীবন যদি অতিক্রম করে মৃত্যুকে? অসময় বলতে যা বোঝায়, যদি সুসময় হয়ে পড়ে? যদি আশা তবু বেঁচে থাকে? জীবনের আরও কিছু প্রস্তুতি। ইচ্ছাপূরণ? চলে যাবার আগে যদি কেউ বলে, ভালোবাসি, বলে গেলাম, ভালো থেকো, দিয়ে গেলাম, ভালো রেখো, রেখে গেলাম। যা প্রয়োজন বিয়োজন আয়োজন সব।

যদি কেউ আশা খুঁজে পায়, মৃত্যুর আগ মুহূর্তে, এক পশলা বৃষ্টি, এক কাপ চা, এক দমকা হাওয়াতে। বা আইসক্রিমে। সেও তো জীবন। জীবনের অংশ।  

শেষের ভেতরও শুরু। সে তো মৃত্যু নয়। যেমনটা নিজাম স্যার বলেন, মৃত্যু কেবল একটি ঘটনা, বাকি পুরোটাই জীবন।

প্যালিয়াটিভ কেয়ারের নাম কি শুনেছেন? চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনেক বড় একটা অধ্যায় চাপা পড়ে আছে, ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক নয় বলে। প্যালিয়াটিভ সেবা হলো মৃত্যুর পথযাত্রীদের চিকিৎসা। নিরাময় অযোগ্য অসুখের ভোগান্তি যেন কম হয় সে চিকিৎসা। 

যেমন, কিছু কিছু রোগ কখনোই ভালো হবার নয়। কিন্তু হাসপাতাল বলে, ভালো হবে। রোগীর পরিবার চিকিৎসা চালিয়ে চান, লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করেন। ধনীদের জন্যে তা নাহয় ঠিক আছে। বিপাকে পড়েন সাধারণ মানুষ। জীবন তো চলে যায়ই, সাথে চলে যায় সব অর্থ সম্বল। 

তো বাংলাদেশে প্যালিয়াটিভ সেবার প্রতিষ্ঠাতা ডা. নিজাম উদ্দিন আহমেদ স্যার। তিনি যে কি বিশাল কাজ করেছেন করে যাচ্ছেন তা বোঝার পুরো ক্ষমতাও যেন আমার নেই। সমুদ্র সমান মানুষ। 

স্যারের মুখে সেদিন শুনছিলাম, তার একজন রোগী, মৃত্যুশয্যায়, তার কাছে প্যালিয়াটিভ সেবা নিচ্ছেন। যেকোনো সময় মারা যাবেন অবস্থা। তিনি বলে উঠলেন, তার কলেজ লাইফে বন্ধুদের সাথে আইসক্রিম খেয়েছিলেন। সেই স্মৃতি মনে পড়ছে খুব। স্যার সেটা শুনে পুরো হাসপাতালে (তাদের প্যালিয়াটিভ কেয়ার ইউনিটে) আইসক্রিম পার্টির আয়োজন করলেন। সবাই মিলে আইসক্রিম খেলেন। 

স্যার বললেন, খরচ কত হয়? কয় পয়সা? অথচ একটু উদ্যোগ নিলেই একটু এগিয়ে আসলেই একজন মৃত্যুপথযাত্রীর আশাগুলো পূরণ করা সম্ভব। সেটাও আশা। 

আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম। এও আশা হতে পারে? একটা আইসক্রিম? মৃত্যুর আগে? 

আশা আসলে কী? আমার বিস্ময় এখনো কাটেনি। 

এই কবিতায় সেই আইসক্রিমের কথাই উল্ল্যেখ করা হয়েছে।

প্যালিয়াটিভ কেয়ার নিয়ে বিস্তারিত জানতে তাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করতে পারেন এবং সরাসরি ফোন করতে পারেন – প্যালিয়াটিভ কেয়ার সোসাইটি

যদি আপনার পরিচিত কেউ থাকে যিনি ক্যান্সারের শেষ স্টেজে বা নিরাময় অযোগ্য ব্যাধীতে ভুগছেন, তাকে প্যালিয়াটিভ কেয়ারে যত দ্রুত সম্ভব, প্লিজ নিয়ে যান। প্যালিয়াটিভ সেবা অন্যান্য চিকিৎসা মাধ্যমের চেয়ে অনেক বেশি সাশ্রয়ী। যাকে নিবেন তার জীবন হয়তো বাঁচবে না, কিন্তু তিনি যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন তিনি একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারবেন। এটা যে তার জন্যে কত বিশাল ব্যাপার, যারা মৃত্যুর এত কাছাকাছি অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, তারা ছাড়া আর কেউ বোঝা সম্ভব নয়…।

নিজাম স্যারের কাছে শুনছিলাম, আরেকজন মা, তার মুখের ক্যান্সার, গালের এক পাশ কেটে ফেলা হয়েছে, দাঁত হাড় মাড়ি সব দেখা যায়। তিনি বস্তিতে থাকেন। তাকে চিকিৎসা করে স্যার তাকে বললেন, মা, আমরা তো তোমার কিছুই করতে পারলাম না। তুমি যেভাবে এলে, সেভাবেই তো চলে যাচ্ছ।
তখন সে মা মাটিতে বসে পড়ে, এবং কাঁদতে কাঁদতে নিজাম স্যারের হাঁটুতে মাথা ঠুকে বলে, “স্যার, আফনে যে আমার কী করলেন আফনে জানেন না। আমার মুখে ঘা। গন্ধ। পোকা দেইখা কেউ কাছে আয়ে না। আমার ছুডু মাইয়াডা আমারে দেখলে ডরায়। আফনেরা আমার ঘা পরিষ্কার কইরা দিলেন, গন্ধ দূর কইরা দিলেন, আমি অহন মুখের এক পাশ ঢাইকা রাখতে পারি। ছুডু মাইয়াডা রাতে আমার বুকে ঘুমায়। এর চেয়ে বড় শান্তি নাই, স্যার!”

প্যালিয়াটিভ কেয়ার সোসাইটিতে ভলান্টিয়ার হওয়ার এবং ট্রেনিং নেয়ার সুযোগ আছে। যে কেউ এই ট্রেনিং (ছোট্ট একটা ওয়ার্কশপ) নিতে পারেন। যদি কেউ আগ্রহী হন, তাদের ওয়েবসাইটে যোগাযোগ করতে পারেন, বা আমাকে ইনবক্স করতে পারেন।

প্যালিয়াটিভ সেবা নিয়ে নিজামুদ্দিন স্যারের মুখেই শুনতে ইউটিউবে এই ভিডিওটি দেখতে পারেনঃ মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখা – Dr. Nizamuddin Ahmed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *