ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের দর্শন – ১

হন্যে হয়ে খুঁজছি ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের লেখা বইগুলো। ঢাকায় বেশিরভাগ অনলাইন অফলাইন বুক স্টোর চষে ফেলেছি, এখন পর্যন্ত পাই নি। তবে একটা সাইটে তার বইয়ের কিছু অংশ পেয়েছি এবং পড়ে বিস্মিত হয়েছি। কী শক্তি তার শব্দে ! তার দর্শন, তার উপলব্ধির প্রকাশ কতটা সহজ সাবলীল! অথচ তার বইগুলো কিনা বাজারে খুঁজে পাই না! তো যতটুকু পেয়েছি ও পড়তে পেরেছি, তা নিয়েই কিছু ভেবেছি, কিছু লিখেছি।

“সর্বপ্রথম আমাদের দুর্বলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। সাহসী হতে হবে, বীর হতে হবে। পাপের জ্বলন্ত প্রতিমূর্তি ঐ দুর্বলতা। তাড়াও, যত শীঘ্র পার, ঐ রক্ত শোষণকারী অবসাদ উৎপাদক ভ্যাম্পায়ারকে। স্মরণ করো তুমি সাহসী, স্মরণ করো তুমি শক্তির তনয়, স্মরণ করো তুমি পরমপিতার সন্তান। আগে সাহসী হও, অকপট হও, তবে জানা যাবে তোমার ধর্মরাজ্যে ঢোকবার অধিকার জন্মেছে।”

দুর্বলতা আমার নিজের ভেতরে টের পাই বলে খুব কাছ থেকে বুঝতে পারি – দুর্বলতা কী। জেনেও মানতে না পারাই দুর্বলতা। জানছি, পড়ছি, বুঝতে পারছি, কিন্তু কিছু করতে পারছিনা- এটাই বোধয় মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

“এতটুকু দুর্বলতা থাকলেও তুমি ঠিক ঠিক অকপট হতে পরবে না; আর যতদিন তোমার মন-মুখ এক না হচ্ছে ততদিন তোমার মলিনতার গায়ে হাতই পড়বে না। মন মুখ এক হলে আর ভিতরে গলদ জমতে পারে না-গুপ্ত আবর্জনা ভাষায় ভেসে উঠে পড়ে। পাপ গিয়ে তার ভিতর বাসা বাঁধতে পারে না। হটে যাওয়াটা বরং দুর্বলতা নয়কো কিন্তু চেষ্টা না করাই দুর্বলতা। তুমি কোনোকিছু করতে প্রাণপন চেষ্টা করার সত্ত্বেও যদি বিফল মনোরথ হও, ক্ষতি নাই। তুমি ছেড় না, ঐ অম্লান চেষ্টাই তোমাকে মুক্তির দিকে নিয়ে যাবে।”

আমাদের মস্তিষ্ক আমাদের চেয়ে ভালো কাজ করে – এর একটা সুবিধা হলো দুর্বল হয়েও দুর্বলতাকে প্রশ্রয় না দেয়ার ক্ষমতা আমাদের ভেতরে আছে। দুর্বলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার শক্তি আমাদের আছে।

ব্যক্তিগত জীবনে আমার সামনে ভালো কোন সুযোগ এলে আমি হতচকিয়ে যাই । নিজের দুর্বলতাগুলো মনের মধ্যে দাঁড় করিয়ে বারবার প্রশ্ন করি – আমি কি এর যোগ্য ? সুযোগ যেহেতু এসেছে সামনে, এর অর্থ, নিশ্চয়ই আমি এর যোগ্য। তবু নিজের দুর্বল দিকগুলোকে এত স্পষ্টভাবে দেখে বারবার প্রশ্ন না করে পারি না – আমি কি আসলেই এর যোগ্য?

মনের ভেতর প্রশ্ন করতে করতে উত্তরটা ভেতর থেকেই আসে । মনের মধ্যে কেউ বলে ওঠে – আমি দুর্বল হতে পারি, কিন্তু দুর্বলতাকে তো সমর্থন করি না। আর যা সমর্থন করি না, তা যেভাবেই হোক, আমি প্রশ্রয় দেব না। তার বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়োগ আমি করবই। পারি না পারি, চেষ্টা আমি করবই, আর চেষ্টা যতক্ষণ করব, ততক্ষণই আমার সফলতা।
আসলে চেষ্টাটাই নতুন উপলব্ধির সোপানে নিয়ে যায়, আর নতুন উপলব্ধি ভেতরে নতুন শক্তি সঞ্চার করে।

“দুর্বল মন চিরকালই সন্দিগ্ধ, তারা কখনই নির্ভর করতে পারে না। বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে তাই প্রায়ই রুগ্ন, কুটিল, ইন্দ্রীয়পরবশ হয়। তাদের নিকট সারাটা জীবন জ্বালাময়। শেষে অশান্তিতে সুখ দুঃখ ডুবে যায়, কি সুখ কি দুঃখ বলতে পারে না। বললে হয়তো বলে বেশ, তাও অশান্তি; অবসাদে জীবন ক্ষয় হয়ে যায়।”

প্রশ্ন আর সন্দেহ এক না। অনেকেই এই দুটোকে এক করে সন্দেহকে সমর্থন করতে চেষ্টা করেন।
কিন্তু প্রশ্ন তো খোলা মনে জিজ্ঞাসাবাদ – যে সঠিক উত্তরটা জানতে চাই, জানতে পারলে মানবো।
আর সন্দেহ হচ্ছে উত্তরটা জানার পরও বারবার জিজ্ঞাসা। না মানার অজুহাত। সত্যিকারের জিজ্ঞাসা করতে শক্তি লাগে, কিন্তু সন্দেহে কোনো শক্তির ব্যাপার নেই। সন্দেহের ভেলায় চড়ে নিঃসংকোচে ভেসে যাওয়া যায়, স্রোতের সাথে।

“দুর্বল হৃদয়ে প্রেম ভক্তির স্থান নেই। পরের দুর্দশা দেখে পরের ব্যথা দেখে, পরের মৃত্যু দেখে নিজের দুর্দশা, ব্যথা বা মৃত্যুর আশংকা করে ভেঙ্গে পড়া, এলিয়ে পড়া বা কেঁদে আকুল হওয়া – ওসব দুর্বলতা। যারা শক্তিমান, তারা যাই করুক, তাদের নজর নিরাকরনের দিকে; যাতে ও সব অবস্থায় আর না কেউ বিদ্ধস্ত হয়, প্রেমের সহিত তারই উপায় চিন্তা করা—বুদ্ধাদেবের যা হয়েছিল। ঐ হচ্ছে সবল হৃদয়ের দৃষ্টান্ত।”

দুর্বলতাকে জেনেও আঁকড়ে রাখা একজন মানুষ কেন এর থেকে সরে দাঁড়াবেন? দুর্বলতাই তো সবচেয়ে সহজ পথ, আয়েশের পথ। যেভাবে আছি সেভাবে থাকাটাই তো সহজ, পরিবর্তন আনাটাই তো কঠিন। কারও দুঃখ দেখে নিজের দুঃখের ভয় করাটা সহজাত, দুঃখের কারণ উপশমের জন্যে কাজ করাটা সংগ্রামের।

“তুমি বলো না তুমি ভীরু, বলো না তুমি কাপুরুষ, বলো না তুমি দুরাশয়। পিতার দিকে নজর করো, আবেগভরে বলো ওগো আমি তোমার সন্তান; আমার আর জড়তা নেই, আমি আর কাপুরুষ নই, আমি আর তোমাকে ভুলে নরকের দিকে ছুটে যাব না, আর তোমার জ্যোতির দিকে পেছন ফিরে অন্ধকার অন্ধকার বলে চিৎকার করব না।”

জীবনে যা কিছু হয় তার সবকিছুই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমাদের নিজেদেরই সিদ্ধান্ত। এর ব্যাখ্যা বিজ্ঞরা বিভিন্ন সময়ে দিয়েছেন, আর এখন কোয়ান্টাম মেকানিক্স দিয়েও দারুণভাবে এটার ব্যাখ্যা করা যায়। যে আমরা দৃশ্যমান বাস্তবতায় যা প্রত্যক্ষ করি তাও আমাদের মনেরই সিদ্ধান্ত। যে পার্টিকেল আকারে দেখবো নাকি তরঙ্গ আকারে দেখবো, এটাও আমাদের মনের সিদ্ধান্ত। আমরা তাই দেখি যা দেখতে চাই…।
দুর্বল হয়ে বেঁচে থাকাটাও এক প্রকার সিদ্ধান্ত, সাহস করাটাও একটা সিদ্ধান্ত। ভাবতে যদিও অবাক লাগে, তবে সত্য তো এটাই। তাই হয়তো ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র বিষয়টাকে এভাবে প্রকাশ করেছেন, যে করার আগে “তুমি বলো” – যে তুমি সিদ্ধান্ত নাও।

*[২০২৬ সাল। আমি এখনো পর্যন্ত ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের বই যোগাড় করতে পারি নি। কেউ যদি খোঁজ জেনে থাকেন, যেখানে তার বই আমি পেতে পারি, জানালে খুব উপকৃত হবো। ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *