সুন্দর মানুষ

পৃথিবীতে কত সুন্দর সুন্দর গল্পের সৃষ্টি হয়, এক জীবনে সবগুলো গল্প জানবার সময় হয় না। তা ছাড়া, পৃথিবীর সব গল্পের শেষে, নিজেদের অভিজ্ঞতার গল্পগুলোই কেবল নিজের কাছে থাকে। আমাদের আশেপাশের মানুষেরাই হয়ে থাকে আমাদের জ্বলজ্যান্ত গল্পগুলোর চরিত্র।

জীবনে বিভিন্ন রকমের মানুষকে জানবার কিছুটা সুযোগ হয়েছে আমার। যদিও সীমিত সময়ে সীমিত জ্ঞানে এ অনেকের তুলনায় একেবারেই অল্প। কিন্তু এর মধ্যেও, যখন কেউ এসে জিজ্ঞেস করে যে আমার চোখে দেখা সবচেয়ে সুন্দর মানুষ কে, তখন কিছু চিন্তা না করেই কিছু মানুষের ছবি মনের চোখে চট করে ভেসে ওঠে, যা একেবারেই আমার সচেতন মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।

এদের মধ্যে একজন হলেন দুলা মিয়াঁ। নরসিংদীর ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া আড়িয়াল খাঁ নদীর মাঝি ছিলেন তিনি ।

ছোটবেলায় প্রায়ই যাওয়া হতো ওদিকে। তখন আমার বয়স ১২ কি ১৩। বদ্ধ শহর থেকে ছাড়া পেয়ে আমাদের ছোটদের মন খুব চাইত ছুটে বেড়াতে এখানে সেখানে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে যেতে দিত না বড়রা। আবার আমাদেরকে নিয়ে একটু দূর থেকে ঘুরে আসবে, সেই সময় সুযোগও কারো হতো না তেমন। দেখা যেত বাড়ির চার দেয়ালের ভেতরেই মেতে থাকতো সবাই।

তো দুলা মিয়াঁর বড় মায়া লাগত আমাদের দেখে। আমরা নদীতে ভেসে বেড়াতে চাই, এ আর এমন কি পাপ। তিনি আমাদের গার্জিয়ানদের বলে বড় নৌকার ব্যবস্থা করতেন এবং  একা সবার দায়িত্ব নিতেন। পরিবারের বাইরে একমাত্র এই মানুষটার ওপরই ভরসা করতে পারতেন বড়রা। তো দুলা মিয়াঁ নদীর বুকে ভেসে পড়তেন আমাদের নিয়ে। সে কি যে আনন্দ! তিনি বলতেন, “যতক্ষণ খুশি নদী বেড়াও, অসুবিধা নাই”।  দুপুরের খাঁ খাঁ রোদে পুড়ে উনি নৌকা বাইতেন, আর আমরা ছোটরা চরম উৎসাহে আড়িয়াল খাঁ নদীর বুকে নিজেদেরকে সিন্দাবাদ ঘোষণা করতাম।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাদের নিয়ে নৌকায় করে ঘুরে বেড়াতেন দুলা মিয়াঁ। আঙুল তাক করে যেদিকে দেখাতাম, সেদিকেই নিয়ে যেতেন। আর আমাদের ছোটদের তো আবদারের শেষ নেই। আগে কখনো কাছ থেকে মাছ ধরার ফাঁদ দেখি নি, তিনি নৌকা সেই ফাঁদের কাছে নিয়ে যেতেন। কচুরিপানার মধ্যে ফুটে থাকা একটা ফুল সুন্দর লেগেছে, কচুরিপানার মধ্য দিয়ে ঐ ফুলের কাছে নিয়ে যেতেন। হঠাৎ মনে হয়েছে দূরের ঐ গ্রামটা খুব সুন্দর। ঐ গ্রামেই নৌকা ভিড়াতেন। ঘাটে নেমে লক্ষ্য করতান যে সে গ্রামে তেমন বিশেষ কিছু নেই, দূর থেকেই ছবির মতন সুন্দর লেগেছে। তো আবার নৌকায় করে অন্য আরেক গ্রামে নিয়ে যেতেন। একবার আমার ইচ্ছে হয়েছিল ইট ভাটার ভেতরে যাওয়া। একমাত্র কারণ – আগে কখনো যাই নি! উনি তাই-ই নিয়ে গেলেন। ইট ভাটার শ্রমিকরা আমাদের ছোটদের হুড়োহুড়ি দেখে খুব ত্যাক্ত বিরক্ত হলেন, কিন্তু আমাদের আনন্দ দ্যাখে কে!  

আড়িয়াল খাঁ নদীর মাঝি দুলু মিয়াঁ সেই ছোটদের মনে আনন্দ দিয়েছিলেন নিঃস্বার্থভাবে। তার এই কাজকে নিঃস্বার্থ বলছি কারণ ঐ সময়টায় বড়দের একটু আধটু সাহায্য করলে তিনি অনেক দিক দিয়েই ঢের বেশি সুযোগ সুবিধা পেতেন। আমরা ছোটরা গিয়ে যে তার ব্যাপারে সুপারিশ করব বা কোনো সাহায্য করতে পারব – ব্যাপারটা এমন ছিল না। তিনি আমাদের আনন্দটুকু দিয়েছিলেন শুধু আনন্দ দেবার জন্যেই। তার ঘরে বড় অভাব ছিল। নদীর পারে ছোট্ট একটা কুঁড়ে ঘরে জীবন কাটিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। নদীর সাথেই থাকতেন সারাদিন। তাই তার মনটাও বোধয় নদী হয়ে গিয়েছিল।

তো সেই ছোট আমরা বড় হয়ে গেলাম। সেই নদীর কাছে আর যাওয়া হয় নি বহু বছর। একদিন ফোনে পেলাম তার মৃত্যুর সংবাদ, বার্ধক্যজনিত কারণে। বিয়ের কয়েক বছর পর স্ত্রীকে হারিয়ে দুলু মিয়াঁ একাকী জীবন বেছে নিয়েছিলেন। আর বিয়ে করেন নি। সবার থেকেই বিচ্ছিন্ন থাকতেন। তাই তার মৃত্যু কাউকে তেমন নাড়া দেয় নি। কিন্তু আমাদের দিয়েছিল।

সেই মানুষটার দেয়া আমার ছোটবেলার জগতে নিঃস্বার্থ আনন্দটুকু অনেক বড় কিছু। ছোটবেলার আনন্দগুলো বুঝি খুব প্রবল হয়, তাই তার ছাপ এত স্পষ্ট থেকে যায়। জীবনে দেখা সুন্দর মানুষ বা সবচেয়ে আনন্দময় স্মৃতির কথা উঠলেই এই মানুষটার ছবি আপনাআপনি ভেসে ওঠে। মনে হয়, মানুষ আসলেই খুব অদ্ভুত। সে যেখানে যেভাবেই থাকুক না কেন, তার ভেতরে সৌন্দর্যের ধারণক্ষমতা বোধয় অপরিসীম।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *