আমি রোজ রোজ তাকে দেখি।
সে আমাকে কি দেখে? ঠিক কতটা দেখে?
সকালবেলাগুলোতে সেভাবে ঠিক দেখা হয় না তাকে। সকালে রোদ থাকে, আলো থাকে, ছুটোছুটি থাকে। নতুন শুরুর ব্যস্ততা থাকে।
সন্ধ্যাবেলায় ফেরার পথের ক্লান্তি থাকে। ক্লান্তি এলে ঘুম পায়। ঘুম পেলে আমি ক্লান্ত চোখে রাজ্যের ভার নিয়ে তাকিয়ে থাকি তার দিকে।
চোখগুলো কেমন আরাম পায়, মনটা শান্ত হয়ে যায়।
আমি শান্ত মনে নরম সুরে বলতে থাকি এটা ওটার কথা। বেশিরভাগ সময় অবশ্য দুঃখের কথাই বলা হয়ে থাকে। তাকে দেখে মনে হয় সে নিতে পারবে দুঃখদের।
তার সাথে আমার কথা হয় সব চোখে চোখে। সে আমার দিকে চেয়ে থাকে, আমি তার দিকে।
অথচ তার কথা আমি শুনতে পাই না।
তার মুখে যদি কোনো ভাষা থাকতো, অথবা হাত থাকতো, হাতের ইশারা থাকতো।
আমার মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় যে, অনেক আগে হয়তো সে অন্যরকম ছিল, বা অন্য রঙের ছিল।
এখন যেমনটা গুরুগম্ভীর দেখাচ্ছে, হয়তো এমন ছিল না। আরও স্বচ্ছ ছিল, প্রাণবন্ত ছিল।
তার ভেতরে প্রাণের স্পন্দনকে পরিষ্কার দেখা যেত। তাকে দেখে আমার মতন কেউ আনন্দিত হয়ে উঠত।
আনন্দ! আনন্দ!
আচ্ছা আনন্দের কথা আমরা এভাবে ভুলে গেছি কেন?
আমরা হাসি দিতে শিখেছি, হাসতে কি শিখি নি?
আরাম আয়েশ আর ভুলে থাকা আছে, ডিসট্র্যাকশন আছে। আনন্দ কই গেল?
শেষ কবে আনন্দ পেয়েছিলাম আমি? বা আপনি? বা আমরা?
এ যেন মরুভূমির বুকে তৃষ্ণার্ত ক্লান্ত পথিকের মতন। সে পথিকের এক গ্লাস পানি প্রয়োজন, ভুঁড়িভোজ নয়। ভোজন কীভাবে করতে হয় সে কথা সে ভুলে গেছে, যেভাবে আমরাও আনন্দের কথা ভুলে গেছি। আমাদের জন্যে পরম তৃপ্তির বিষয় হচ্ছে শুধু এক গ্লাস পানি। যে পানি ক্লান্তি ফেরাবে।
তো যার কথা বলছিলাম, তার সাথে আমার দেখা হয়েছে আজকে রাত ৮টায়, বাড়ি ফেরার পথে। আজ আমার ঘুম পায় নি। আমার পাশে তখন জাফর বসেছিল।
একটা সময় ছিল যখন আমার জীবনে জাফর না থাকার দুঃখ প্রকাশ করতাম তার কাছে। জাফরকে তখনো আমি চিনতাম না। একটার পর একটা ভুল মানুষে ক্লান্ত হয়ে দীর্ঘ সময় একাকীত্বের কোলাহলে কাটিয়েছি। তাই প্রবল প্রতীক্ষায় ছিলাম। প্রতীক্ষায় আবার ক্লান্ত হতে শুরু করেছিলাম যে, কেউ কি আর আসবে না? কারো সাথেই কি আর দেখা হবে না? কথা হবে না? সেভাবে…?
আমরা আমাদের দুঃখগুলোকে কত বড় ভাবি। দুঃখ যদি অতো বড় না হয়? যদি ক্ষণস্থায়ী হয়?
জাফর তো এলো। এরপর নতুন দুঃখের লিস্ট শুরু হলো।
দুঃখগুলোর যন্ত্রণা এত, অথচ কারণগুলো কত তুচ্ছ!
আজকে আমার পাশে জাফর বসে আছে। জাফর আমাকে দেখেও দেখতে না পাওয়ার আক্ষেপ আমার আছে। এই দুঃখ করছি আজ তার সাথে।
তার পাশ দিয়ে কতজন রোজ রোজ চলে যায়। তারাও কি দুঃখের কথা বলে ওঠে এভাবে?
আনন্দ পাওয়ার ধরণ তো আমরা ভুলতে বসেছি। দুঃখের কথা বলাই স্বাভাবিক।
আমার তাকে মাঝে মাঝে বলার প্রচন্ড ইচ্ছা জাগে – যে চলো, আমরা মুক্ত হই! তুমি যেখানে যাবে, যেখানে যাব আমি। চল, রুদ্ধশ্বাসে ছুটে চলি মন প্রাণ খুলে। যার যেদিকে যাহোক হোক। কোথাও ভাঙ্গুক বা জোড়া লাগুক, আমরা শুধু ছুটব ছুটব ছুটব। আমরা আমাদের ভেতর থেকে বেরিয়ে আরও বড় কিছুর সাথে মিশে যাব। এবং আমরা আরও বড় হবো। আর মহৎ হবো। আরও বিশাল হবো।
এবং সেজন্যে আমাদের নিজ থেকে বের হতে হবে, যেটা খুব কষ্টের পথ, খুব অদ্ভুত পথ।
নিজ থেকে বের হতে হলে তার মাটি খুঁড়ে নতুন পথ তৈরি করতে হবে। আমারও একই কাজ, শুধু কাজটা হবে ভেতরে। মনটাকে খুঁড়তে হবে। খুঁড়ে খুঁড়ে অন্তরের সাথে মিশে যেতে হবে। খুঁজে বের করতে হবে নদীর ভেতরে নদী, মনের ভেতরে মন। এরপর আরেক মন, তারপর আরেক মন, তারপর আরেক।
আমি সন্ধ্যায় তাকে দেখি। শহরের কোলাহলদের প্রতিচ্ছায়া পড়ে তার ওপরে।
সে আলোদের ঝিকিমিকি কোলাহল কি তার ভালো লাগে? তার কি আকাশের পানে চেয়ে হিংসা হয়, যে তার ভেতর কিছু আলো ফুটে থাকতো নাহয়, এর বদলে? তারাদের মতন করে? এবং সে আলোগুলো তার আঁধারকে গিলে ফেলতে পারতো না। সে আলোগুলো উল্টো তার আঁধার কত গাঢ় তাই প্রকাশ করতো।
কিন্তু তার ভেতরে কি অন্তরীক্ষের সমান আঁধার আছে? রহস্য আছে? বিশালতা আছে? নেই। তাহলে কেমন করে সে ভেতরে আলো ফোটাবে? তার তো সমুদ্রে গিয়ে আগে মিশতে হবে। সমুদ্রের আঁধার আছে, রহস্য আছে, বিশালতা আছে। শহরের কোনো কোলাহলই সমুদ্রকে স্পর্শ করতে পারে না। তার আঁধার এত গভীর এত পূর্ণ যে কৃত্রিম আলোরা প্রতিচ্ছায়া ফেলতে চাইলেও ডুবে যায় সে আঁধারের ভেতরে। তাই তাকেও সে পরিমাণ বড় হতে হবে, অনেক বড়।
এবং আমিও কি জীবনে একই স্থানে দাঁড়িয়ে নই?
আমার মনের সমুদ্রকে যতদিন না পাচ্ছি, এই প্রতিদিনের জীবনের ক্ষুদ্র কারণগুলো, সুখ দুঃখগুলো, অহেতুক ড্রামাগুলো আমার জীবনের সবটা হয়ে থাকবে। যতদিন না এর ঊর্ধ্বে উঠতে পারছি। যতদিন না ক্ষুদ্রতা থেকে বের হতে পারছি।
তার সাথে আমার এ বড় অদ্ভুত মিল।
আমাদের ওপর এলোমেলো এইসব প্রতিচ্ছায়াদের কারণে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়ছি, দূষিত হয়ে পড়ছি। আমাদের আশেপাশের মানুষেরা একে স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছে। আমাদের দূষিত ঘোলাটে জল দেখে অবাক হয় না কেউ। আমাদের দূষণের দুর্গন্ধ খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছে সবার কাছে, যেন এমনটাই হবার ছিল।
সবাই আমাদেরকে এভাবে মেনে নিয়েছে, তাই আমরাও নিজেদের মেনে নেয়া শিখে গেছি, এবং আটকে গেছি। আমরা যে তিলে তিলে মারা যাচ্ছি তা দেখেও দেখছি না। কৃত্রিম আলোকসজ্জায় মোহিত হয়ে সব ভুলে থাকছি। তারার আলো ভুলে মরিচ বাতিতে নিজেদের মেলে ধরে ভাবছি, বেশ তো সুন্দর দেখাচ্ছে আমাদের। এবং আমরা আটকা পড়ে গেছি।
আমাদেরকে সমুদ্রের কাছে পৌঁছাতে হবে, যে করেই হোক।
