লালাখালের নীলে

লালাখালে গেলাম জীবনে এই প্রথমবার। লালাখালের অদ্ভুত নীল রঙের খালের ছবি ভিডিও বহু ভ্লগে আমি দেখেছি। সবসময়ই মনে হয়েছে, কিছুটা হলেও ফিল্টার করা। কিন্তু বাস্তবে চোখে না দেখা পর্যন্ত বোঝা যায় না যে এই জল ইন্সটাগ্রামের ফিল্টারের চেয়েও বেশি নীল! আর খাল যে শুধু অদ্ভুত নীল রঙ ধারণ করে আছে তাই নয়, এখানের আকাশ বাতাস গাছ গাছালি পাখিরাও এই নীলের অংশ।

তারা সবাই বেশ সচেতন যে এই নীল হ্রিদের রাজ্য সচরাচর মেলে না। তাই নিজেদেরকে তারাও সেভাবে রাঙিয়ে নিয়েছে যেন। এখানে আসলে খেয়াল করবেন, গাছগুলো বেশ আর্টিস্টিক ঢঙে ডালপালা ছড়িয়ে চেয়ে আছে আপনার দিকে। বক এবং আরও কিছু সুন্দর সুন্দর পাখি (নাম জানা নেই) বেশ সন্তর্পণে হ্রিদের ধারে হাঁটছে, শিকার করছে – এমনভাবে যেন প্রতি মুহূর্তে তাদের ছবি তুলে দু একটা এওয়ার্ড জেতা যাবে। আর খালের দু ধারে একটু পরপর চোখে পড়বে বুনোফুল, হালকা বেগুনি রঙের। ফুলগুলো ফুটে যেন নীলের পানে চেয়ে থাকাই তাদের কর্তব্য। এই ফুলগুলো আলাদা করে কেউ এখানে লাগিয়েছে মনে হয় নি। মনে হয় সে নিজে নিজেই হয়েছে, লালখালের মুগ্ধতায়। অথবা প্রকৃতির মনে হয়েছে এই ক্যানভাসে ফুলগুলো রাখা দরকার।
আমি আসলে বলার জন্যে বলছি না। ভাষার অলংকারণ মূল উদ্দেশ্য নয়। লালখালের চারপাশের প্রকৃতির সবকিছু এই নীল সবুজ হ্রিদকে তাদের ভেতরে খুব যত্ন করে ধারণ করে আছে। সিনেমা হলে যেভাবে দর্শনার্থীদের জন্যে হলের লাইটিং চেয়ার ব্যাকগ্রাউন্ড সবকিছু ডিজাইন করা হয়, প্রকৃতিও ঠিক একই কাজটা করছে।
আর এর সাথে এই অঞ্চলের মানুষরাও তাই করছে। এত সুন্দর সুন্দর নৌকা, ঘন্টার পর ঘন্টা অনায়াসেই ঘোরা যায়। আর নৌকায় বসে যদি সবকিছু ছেড়ে, মানে ফোন গালগল্প সব বাদ দিয়ে নীরবে চেয়ে থাকেন, আপনি হারিয়ে যাবেন।
আর পরিবার প্রিয়জনদের নিয়ে আসলেও সময়টা খুব ভালো কাটবে। আমরা বেশ কজন বন্ধু মিলে গিয়েছিলাম। গল্পও জমেছে আবার চুপ করে প্রকৃতির মাঝে বিচরণও হয়েছে। তবে ইচ্ছে আছে, কোনো একবার একদম নিঃশব্দে এই নীলের হ্রিদে ভেসে থাকার। শুধু চেয়ে দেখার। কোনো ফোন না আয়োজন না কিছুই না। সারাদিন শুধু জলের নীলে ভেসে থাকা…।
হযরত শাহজালালের মাজার

সত্যি বলতে মাজারে গিয়ে মহা হতাশ হলাম। কারণ এক, হযরত শাহজালালের কবরের কাছে কোনো নারী যেতে পারে না। আকাশের মতন বিশাল একটা মানুষকে ঘিরে এত করুণ সংকীর্ণতা!
দুই, হযরত শাহজালালকে নিয়ে বা তাঁর একটা বাণী নিয়ে একটা বইও ধারে কাছে কোথাও খুঁজে পেলাম না। তাঁর জীবন তাঁর বাণী – কিছুই পেলাম না। মানুষটাকে জানার খুব আগ্রহ আমার অনেক দিনের। ভেবেছিলাম মাজারের আশেপাশে কিছু বই অন্তত পাব। বই বাদে কেনাকাটার বহু জিনিস দেখলাম, আসলটাই পেলাম না…।
জলের বনে, রাতারগুল
এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত, ভ্রমণের অর্ধেক হলো সঙ্গ, আর বাকি অর্ধেক হলো সে ভ্রমণের স্থান। আমরা ভেবেছিলাম রাতারগুল যাব, জলের ভেতর অরণ্য দেখব, কিছু ছবিও তুলব, এরপর দিন থাকতে চলে আসব। জলের ভেতর অরণ্য কেমন হয় – এর আগে দেখার সুযোগ হয় নি আমার।
সত্যি বলতে, আমার খুব মনে চায়, মোবাইল ফোনটাকে হোটেলে রেখে ঘুরতে বেরোই। কোনো ছবি তুলব না, কিচ্ছু না, শুধু চোখ ভরে সবুজ আর জলের খেলা দেখব। সে আর হয় না। সুন্দর কিছু দেখলেই নিজ চোখে ভালো করে দেখার চেয়ে ফোনের চোখে দেখা শুরু করি আগে।
তো সেদিন রাতারগুল গেলাম আমরা, বেলা চারটা করে। ঘাঁটে একজন মাঝি ঠিক করে তার নৌকায় চেপে বসলাম। মাঝির বয়স ৪০ এর কোঠায় হবে, আমাদের দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছেন।, যেন খুব চাইছেন একটু আলাপ জমাতে। কিছুদূর যেতেই গল্প শুরু করলেন। নানান গল্প তিনি পারেন। আরেকটু আগ বাড়িয়ে আমাদের ছবি তুলে চাইলেন। আম্র ভেবেছিলাম, কি না কি ছবি তুলবেন উনি, তবুও চাইছেন যেহেতু তাই ফোনটা দিলাম। তার তোলা ছবি দেখে তো চোখ ছানাবড়! এ যেন একেবারে পেশাদান ফটোগ্রাফার!! নিজে নিজেই তিনি সবচেয়ে বেশি শাখা প্রশাখা মেলানো গাছগুলোর নিচে গিয়ে নৌকা ভিড়ালেন এবং নানা কসরত করে আমাদের ছবি তুললেন। ছবিগুলো এত সুন্দর এলো এবং তার আতিথিয়তা এত চমৎকার ছিল যে সত্যি বলতে আমি রাতারগুলের জঙ্গলের চেয়ে তার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠলাম। তার ট্যুরিস্ট আপ্যায়নের দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব দেখে মুগ্ধ হলাম! আমাদের সব মনোযোগ ঘুরে গেল তার দিকে। চোখে তো আমরা রাতারগুলের জল আর জলের গাছ দেখছিলাম। কিন্তু মনটা ছিল মাঝির আতিথিয়েতায় মুগ্ধ। এক পর্যায়ে ভেবেছিলাম, না জানি এইসব ছবি তোলার জন্যে কত চার্জ করে বসে। কিন্তু না, কিছুই চাইলেন না। তখন কি আর বেশি বখশিশ না দিয়ে ফিরে আসা যায়? মন থেকেই তো আসে।

বন জঙ্গলে গেলে আমার একটা ব্যাপারে আফসোস হয় যে এত সুন্দর এত কিছু দেখি, তবু সবকিছু যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। চট করে তো ঝোপ ঝাড় পেরিয়ে যেতে পারি না। চাইলেই গাছের মগডালে উঠে যেতে পারি না। এতরকম পাখিদের ডাক শুনি, মন চায় তাদের সামনে বসিয়ে ডাকগুলো শুনি, গানগুলো শুনি। সে কি আর হয়?
আমার চোখে রাতারগুল কেমন? – যদি প্রশ্ন করা হয়, উত্তরে বলব – এক, ভরা বর্ষায় গেলে জমবে ভালো, দুই, যখন আশেপাশে সব ট্যুরিস্টরা হই চই করছে আর ছবি তুলছে, সে সময় স্থির হয়ে জঙ্গলের সাথে ভাব করা বেশ কঠিন। আমার কাছে স্বাভাবিকভাবেই অসাধারণ সুন্দর লেগেছে কিন্তু আমি এ জলের জঙ্গলের সাথে ঠিক ভাব করার সুযোগ পাই নি। এত কোলাহলের ভেতর দিয়ে আমার ভেতরে সেই স্থিরতা আনতে পারি নি। দোষটা নিজেকেই দিচ্ছি। মনের শক্তিটাকে আরও বাড়ানো গেলে ভালো হতো।
অবশেষে সিলেটে এক কাপ ভালো চা
অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এবং সিলেটবাসী বাদে বাকি অনেকেই আমার সাথে একমত হবেন, সিলেটের টঙে বা রেস্তোরাঁয় ভালো চা পাওয়া যায় না। তবে অবশেষে একেবারে পথের ধারে খুব সুন্দর একটা ছোট্ট দোকানে ভালো চায়ের সন্ধান পেয়েছি আমার বর ও তার বন্ধুদের কল্যাণে।
যারা এরপর সিলেট যাবেন তাদের ছোট্ট একটা টিপস দেই – এয়ারপোর্ট রোডে ক্যাডেট স্টাফদের জন্যে করা হাইওয়ের ধারে ছোট্ট সুন্দর একটা রেস্তোরাঁ চোখে পড়বে। সাদা বেড়া দিয়ে ঘেরা। সেখানে অবশ্যই নামবেন এবং খোলা জায়গায় বসে ডিমের চপ আর এক কাপ চা খাবেন। এরপর কেমন লাগল আমাকে জানাবেন। দূর থেকে দেখে জায়গাটাকে আহামরি কিছু মনে হবে না, কিন্তু ভেতরে ঢুকেই কেমন এক পিকনিক পিকনিক ভাব। তেমন কিছুই নেই সেখানে কিন্তু তবু কেন যে এত ভাল লাগল। সুন্দর ছিমছাম দুটো খাবারের দোকান, আর একটুখানি খোলা জায়গায় পেতে দেয়া কিছু টেবিল চেয়ার। হয়তো সে পথটা পাহাড়ের গল্প বলে, হয়তো বৃষ্টি আর চা-বাগানের ঘ্রাণ সেখানে আছে, কিছু একটা আছে। কেন যেন খুব শান্তি লাগে।
[আর হ্যাঁ, অখানে একটা অদ্ভুত দোলনা আছে, দোল খেলেই খাদে পড়তে হবে এমন টাইপের। আমরা সেটার নাম দিয়েছি সুইসাইডাল দোলনা। সেটাতে আবার চড়তে যাবেন না যেন।]
আমাদের সিলেট ট্রিপটা শেষ হয়েছিল বন্ধুর ও তার স্ত্রীর আতিথিয়তায়। সন্ধ্যাবেলা্য তাদের ডাইনিং টেবিলে আড্ডা বেশ জমে উঠেছিল। কে যেন বলছিল সারা রাত আড্ডা দেয়া গেলে ভালো হতো। ইচ্ছে হচ্ছিল আমাদেরও। কিন্তু সব সখ তো পূরণ হয় না। হয়তো অনেক শখ পূরণ হবার মাঝে কিছু কিছু বাকি থাকাটাও সখের একটা অংশ।
আমরা তড়িঘড়ি করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।
