ভাবনা ..#১

“চাওয়া তাৎক্ষণিক পূরণের প্রবণতাই
মানুষকে অস্থির ও ক্ষুব্ধ করে তোলে…”

রাজনীতির ব্যাপার স্যাপার আমি কম বুঝি, বৃহৎ ক্ষেত্রে এবং ক্ষুদ্র ক্ষেত্রে। একেবারেই যে বুঝি না তা অবশ্য না, তবে বুঝতে একটু সময় লাগে আর কি।

বেশ খানিকটা সময় নিয়েই আমি জীবনে বুঝলাম, যেটা চোখের সামনে সর্বদাই দৃশ্যমান ছিল – যে রাজনীতি মানুষকে কিছু সময়ের জন্যে কিছু ক্ষমতা দেয়। সে ক্ষমতা নিয়ে বেশিরভাগ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা ভাবে যে সে এখন যা চায় তাই করতে পারবে। যা চাইবে তাই হাতের ভেতরে চলে আসবে।

স্বাভাবিকভাবেই, যখন যা চাওয়া হয় তা এই পৃথিবীতে তৎক্ষণাৎ পূরণ হয় না। ইবলিশেরও ধৈর্য ধরতে হয় ইনসানকে ইবলিশে রূপান্তর করতে। তো রাজনৈতিক ব্যক্তিরা (সবাই না, হয়তো বেশিরভাগ…) তাদের তৎক্ষণাৎ চাওয়া পাওয়া পূরণ না হওয়ার কারণে অস্থির হয়ে পড়েন এবং সে অস্থিরতা ক্রমেই ক্ষুব্ধতার আকারে প্রকাশ পায়। এজন্যেই বোধয় রাজনীতিতে খুন-খারাবি সামাজিকভাবে এতটা “গ্রহনযোগ্য”। সিনেমাতেই তো দেখা যায়, হিরো হিরোইন যতই সাধু হন না কেন, রাজনৈতিক পরিবারের হলেই তারা একের পর এক খুন করেন এবং সেটাতে কোনো দোষ হয় না। কোনো বিচার ব্যবস্থা হয় না এবং সেটাতে কারো আসে যায় না।

তো যা বলছিলাম, রাজনৈতিক মানুষের ফর্মুলাটা আমি এতদিনে এসে বুঝলাম, কেন তাদের এত ক্ষুব্ধ হতে হয়, কোত্থেকে এই অস্থিরতা আসে – চাওয়া মাত্র না পাওয়ার কারণে। এটা হলো বৃহৎ জগতের উত্তর।

এবার আসি ক্ষুদ্র জগতে। এককে। প্রতিটা মানুষের ভেতরে একেক সত্ত্বার ভেতরেও তো রাজনীতি চলে। মানে মনের একেক অংশ চায় একেক রকম। একেক রকম চাওয়া পাওয়া বাস্তবায়িত করতে তারা নানান কূটনীতি কৌশল অবলম্বন করে। তাদের ভেতরে লাগে দ্বন্দ্ব, সেখান থেকে শুরু হয় অস্থিরতা এবং এরপর ক্ষুব্ধতা।

আমরা মাঝে মাঝে কিছু মেজাজী মানুষের দেখা পাই। সে লোকটা বা মহিলাটা অল্পতেই মেজাজ গরম করে তুলকালাম ঘটিয়ে দেয়, তাই সে ব্যক্তি থেকে সবাই সাবধানে থাকার চেষ্টা করে।

ছোটবেলায় আমার এক বান্ধবী ছিল, ওর বাবা প্রতিদিন ঘরে ফিরেই চেঁচামেচি করতো। আমি অবাক হয়ে ভাবতাম, উনি এমন কেন?

আমার মা-র অফিসে একজন কলিগ ছিলেন, ভীষণ বদরাগী আন্টি। ওনাকেও দেখে ভাবতাম, এত রাগ বিরক্তি কোথা থেকে আসে? আপনাদেরও নিশ্চয়ই পরিচিত আশেপাশে কেউ না কেউ আছে যারা এমন ধরণের – মেজাজের জন্যে ‘বিখ্যাত’।

একটা সময়ে মনে হতো এই ধরণের মানুষদের ভেতর বোধয় কোনো সাংঘাতিক ট্রমা কাজ করে। এরপর দেখলাম না, ট্রমা ছাড়াও মানুষ এমন হতে পারে। এমনও মানুষ আছে যারা আগে হয়তো ওরকম মেজাজ দেখাতো না, কিন্তু হঠাৎ তাদের মেজাজ বিগড়ানো শুরু করে। সময়ের সাথে বুঝলাম, এর মূলে রয়েছে অস্থিরতা। আর উপরের এই লেখাটা পড়ার পর আমার উপলব্ধি হলো অস্থিরতার উৎস কী – তাৎক্ষনিক সব চাওয়া পাওয়া পূরণ হয়ে যাবে এমন প্রত্যাশা।

কোনো এক কারণে হয়তো এই মানুষগুলো ভাবেন, তারা যা চান তাই হতে হবে এবং তখনই হতে হবে। কিন্তু বাস্তবরা তো আলাদা, এবং তারা অস্থিরতায় ভুগতে শুরু করেন।

শুধু রাজনৈতিক ব্যক্তি কেন, যে-কোনো ক্ষেত্রে যে-কোনো সেক্টরে মানুষ কিছু ব্যাপারে কিছু ক্ষমতা পাওয়ার পর একই অসুখে ভুগতে শুরু করেন। তাৎক্ষণিক সবকিছু পেয়ে যাবার প্রত্যাশা করেন এবং অস্থিরতা শুরু হয়।

আর আমরা সাধারণ মানুষ, যারা সাধারণ মেজাজেই ছিলাম, তেমন কোনো ক্ষমতার অধিকারী নই, তাই তাৎক্ষনিক কিছু পাওয়ার আশাও করি না, স্মার্টফোন, গেমস আর সোশ্যাল মিডিয়া উঠেপড়ে লেগে গেল আমাদেরও তাৎক্ষনিক চাওয়া পাওয়ার অভ্যাসটা গড়ে তুলতে। এক টিপেই সব এখুনি হাতের কাছে এসে যেতে হবে, যখন দেখতে চাইব হাতের ফোনটা তখনই তাই দেখাবে – এতেই অভ্যস্ত হওয়া শুরু করলাম। এবং ভার্চুয়ালে জগতে এই অভ্যস্ততার পর বাস্তব জগতেও একই আচরণ শুরু করলাম। সচেতন বা অসচেতন মনে আশা করতে লাগলাম, এখুনি যা চাইব এখুনি তা পাইব। হলো আমাদের ভেতর অস্থিরতা শুরু। এবং অস্থিরতা থেকে ক্ষুব্ধতা। ক্ষুব্ধতা থেকে ভায়োলেন্স।

আগে বেশিরভাগ শুনতাম, সন্ত্রাসীরা ক্রাইম করে। আর এখন প্রায়ই শোনা যায়, সাধারণ মানুষেরা ক্রাইম করে। গত এক দশকে সাধারণ মানুষের দ্বারা ক্রাইম রেট যত বেড়েছে, এর আগে কি এতটা ছিল? এবং সময়ের সাথে কি আরও বাড়ছে না?

এরপরও আমরা যারা হয়তো কিছুটা নিরাপদ দূরত্বে আছি এসব থেকে, যারা হয়তো এই অস্থির পৃথিবীতে এখনো কিছুটা স্থিরতার আশ্রয়ে আছি, মাথাটা যাদের এখনো বিগড়ে যায় নি, আমরা বোধয় নিজেদের মাঝে মাঝে একটু জিজ্ঞেস করতে পারি – প্রতিদিনের জীবনে ছোটখাটো যা কিছুই চাইছি, তাৎক্ষনিক চাইছি নাতো? এখনই পেয়ে যেতে হবে এমন ভাবছি নাতো? মাকে এখুনি এটা আনতে হবে, বাবাকে এখুনি ওটা বলতে হবে, স্বামীকে এখুনি সেটা করতে হবে, স্ত্রীকে এখুনি এটা মানতে হবে, ক্লাসে ওটা এখুনি হয়ে যেতে হবে, অফিসে সেটা এখনই পেতে হবে…ইত্যাদি।

যে বিষয়ে যা কিছু চাইছি, একটা সামান্য ফোনের টেক্সটের রিপ্লাইয়ের ক্ষেত্রেও, যদি এখুনি এখুনি চাই, এবং এক্ষুনি না পেলে বিরক্ত হই, তার মানে তাৎক্ষনিক চাওয়া পাওয়ার ভাইরাসে আমরাও আক্রান্ত। আর এই ভাইরাসটা কিন্তু ছড়াতে থাকে। সুতরাং আমরাও অস্থিরতা থেকে মুক্ত নই। ক্ষুব্ধতা, অসহিষ্ণুতা ভায়োলেন্স – আমাদের দ্বারাও অসম্ভব কিছু নয়।

মানুষ তো আবার নিজের দোষটা সহজে দেখতে পায় না। তাই মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করে একটু ঝালিয়ে নেয়া যেতে পারে।

***

যে বই থেকে এই লেখাটা নিয়েছি তা আসলে মহাজাতকের কিছু বাণী সংকলন, এখানে পড়া যাবে – লিঙ্ক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *