ভাবনা… #২

‘বস্তুর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষ এবং মানুষের মধ্যে সম্পর্ক’ 

কথাটা পড়ে প্রথমে মনে হতে পারে এমনটা আমরা কখনোই করি না। মানুষের চেয়ে বস্তুকে অবশ্যই গুরুত্ব দেই না। জামা কাপড় টেবিল চেয়ারকে কি আমরা মানুষের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেই? কিন্তু ব্যাপারটা আরেকটু গভীর।

বস্তুবাদ বলতে শুধু বস্তু বোঝায় না। বস্তুবাদ হলো বস্তুকেন্দ্রিকতা – অর্থাৎ বস্তুকে কেন্দ্র করে যখন মনের জগতটা পরিচালিত হয়। আরও সহজভাবে বলতে গেলে, শুধু দৃশ্যমান জগতের একাংশ নিয়ে বাঁচা। 


আমার মনে হয়, দৃশ্যমান প্রাপ্তির জন্যে মানুষ যা কিছু করে তাই বস্তুবাদিতা।

যেমন, আপনি পড়াশোনা করছেন, অনেক কিছু জানতে পারছেন বুঝতে পারছেন। কিন্তু জানা বোঝা টা আপনার উদ্দেশ্য নয়। আপনার নিয়ত হচ্ছে শুধুই পাশ মার্ক। তখন আপনার পড়াশোনাটা হয়ে গেল বস্তুকেন্দ্রিক। [পাশমার্ক অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জীবনটাকে একটু জানতে বুঝতে চাওয়ার, অর্থাৎ নিজেকে বিকশিত করার অভিপ্রায়টা থাকা আরও গুরুত্বপূর্ণ]

বা আপনি সকালে অফিসে যাচ্ছেন, কাজ করবেন। কিন্তু কাজটা আপনি কেন করবেন সেটা নির্ধারণ করে আপনার কাজটা কি বস্তুকেন্দ্রিক নাকি আত্মিক। যদি শুধু অর্থপ্রাপ্তির জন্যে কাজটা হয়, আর সে অর্থ আয়ের মূল উদ্দেশ্য হয় নামীদামী জিনিসপত্র/অভিজ্ঞতা ক্রয়, মানে কনজিউমার হওয়া, তখন আপনার ঘাম ঝরানো পরিশ্রমটা হয়ে যায় বস্তুকেন্দ্রিক। সে কাজ কখনো আপনাকে ডিপ্রেশন থেকে মুক্তি দিবে না। (তবে আয়ের যে অংশ দিয়ে পরিবারের দায়িত্ব পূরণ করছেন, সেখানে প্রাপ্তি দৃশ্যমান হলেও আত্মিকতা আছে, কারণ আপনার আত্মার সাথে সংযুক্ত মানুষগুলোর যত্ন আপনি নিচ্ছেন এই উপার্জন দিয়ে।) 

আর যে কাজ আপনি করছেন, তা কেন করছেন সে উত্তর যদি আপনার কাছে পরিষ্কার থাকে, তা যদি শুধু অর্থ প্রাপ্তির জন্যে না হয়ে আরও বৃহৎ ও মহৎ উদ্দেশ্যে হয়, নিজের ও অন্যের কল্যাণের জন্যে হয়, তখন কাজটা কোনো অংশেই আর বস্তুকেন্দ্রিক থাকে না। কাজটা আত্মিক হয়ে যায়।

বা ধরুন আপনি একটা ভাবনা শেয়ার করবেন, ফেসবুকে একটা পোস্ট দিবেন। এখন সেটা যদি হয় মানুষের লাইক কমেন্ট কুড়ানো, তাহলে আপনার ভাবনাটাও বস্তুকেন্দ্রিক হয়ে গেল।  

বা আপনার সঙ্গী বা সঙ্গিনী, তাকে আপনি আপনার জীবনের অংশ করেছেন কারণ সে আপনার ইগো-র জন্যে ভালো। তার শারীরিক, আর্থিক বা সামাজিক অবস্থান দেখে লোকে মন্তব্য করে ‘জিতসে!’ দৃশ্যমান প্রাপ্তি। তখন এই বিয়ের সম্পর্কটাও বস্তুবাদে রূপান্তর হলো, এটা আত্মিক সম্পর্ক হতে পারলো না। 


আপনি আপনার মা-কে ভালোবাসেন, তার জন্যে কিছু করবেন। কিন্তু এই করার পেছনে যদি দিন শেষে হয় কিছু মানুষকে দেখানো – যে দেখো আমি কত ভালোবেসে কতকিছু করতে পারি, বা মা-কেই দেখানো, তখন মায়ের প্রতি ভালবাসাটাও হয়ে যায় বস্তুকেন্দ্রিক। 


ঠিক যেভাবে ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস যখন আমরা ভাষা শহীদদের মন থেকে একটু স্মরণ না করে, তাদেরকে একটু জানতে বা বুঝতে চেষ্টা না করে, অন্তর থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে, তাদের কবরে একটু দোয়া পৌঁছে না দিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি সাদা-কালো কালার প্যালেটের জামা কাপড় কিনতে, সেটা হয়ে যায় বস্তুকেন্দ্রিক। (সাদা কালো পড়াতে অসুবিধা নেই, কিন্তু এটা আসে সবার শেষে, কিন্তু ব্র্যান্ডদের মার্কেটিং ক্যাম্পেইনের দৌড়ে এটাই আমাদের মুখ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়)। 

আমি গেলাম সমুদ্র দেখতে। সমুদ্র দেখতে যেয়ে আমি কত সুন্দর সমুদ্র দেখে ফেলেছি আজকে তাই যদি হয় আমার ফেসবুক ইন্সটাগ্রামের স্টোরির বিষয়, তখন সমুদ্রের সাথে আমার গোটা সম্পর্কটাই হয়ে উঠে বস্তুকেন্দ্রিক। 

আর মানুষের সাথে? 

যদি মানুষের সাথে সম্পর্কটা হয় কোনো দৃশ্যমান প্রাপ্তির জন্যে, সে সম্পর্কে বস্তুবাদ চলে আসে। আর বস্তুর মতই সে সম্পর্ক ইগোকে কিছু দিতে পারলেও মনকে আত্মাকে কিছু দিতে পারে না…।

কোথায় যেন পড়েছিলাম, কথাটা ভালো লেগেছিল, বস্তু আর প্রাণের মাঝে পার্থক্য হলো বস্তু সাড়া দিতে পারে না, প্রাণ সাড়া দিতে পারে। 

কোনো সম্পর্ক প্রাণের ডাকে সাড়া দিতে পারে কিনা তা বোঝার খুব সহজ উপায় হচ্ছে তা দৃশ্যমান কোনো প্রাপ্তির ওপর নির্ভর করে কিনা।
যদি না হয়, যদি কোনো সম্পর্ক, হোক মা-বাবার সাথে, বা সন্তানের সাথে, বা জীবনসঙ্গীর সাথে, যদি কোনো দৃশ্যমান প্রাপ্তির ব্যাপার না থাকে, তবে সে সম্পর্ক প্রাণের ডাকে সাড়া দিতে পারে। সে সম্পর্ক মন এবং আত্মা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। কারণ সে সম্পর্কে বস্তু নেই, মানুষ আছে।  

আমাদের এই যুগের একটা বিপদ হলো সপ্তাহে সাত দিন ২৪ঘন্টা আমাদের চোখের সামনে ঝলমল করে যে পর্দা, মানে স্ক্রিন, সে পর্দা বস্তু ছাড়া আর কিছু দেখানোর ক্ষমতা রাখে না। তাই সে বস্তু দেখাতে থাকে, এবং সবকিছুকে বস্তুতে রূপান্তর করে দেখাতে থাকে। যেমন, স্বামী স্ত্রীর মাঝে ভালবাসা কীভাবে দেখাবে? ভালবাসা তো দেখা যায় না। তখন ক্যান্ডেল লাইট ডিনারে বিশেষ উপহার দেয়াকে ভালবাসার সংজ্ঞা বানিয়ে ফেলে। আর আমরা সাধারণ মানুষও স্ক্রিন দেখতে দেখতে সেই বস্তুবাদ দ্বারা সংজ্ঞায়িত সম্পর্ককেই প্রাধান্য দিতে থাকি। ভালবাসা আছে কি নেই তা নিয়ে মাথা ঘামাই না, মাথা ঘামাই পর্দার সংজ্ঞা অনুযায়ী ক্যান্ডেল ডিনার আর অমুক ব্র্যান্ডের গিফটের মাধ্যমে ভালবাসা প্রমাণিত হলো কিনা…।  


আপনার ফোনে স্ক্রিন টাইম দৈনিক কত ঘন্টা? পরিসংখ্যান বলে, এভারেজে একজন সাধারণ মানুষ দৈনিক ৬ ঘন্টা ৪০ মিনিট স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কাটায়। প্রতিদিন এতটা সময় সেখানে কাটালে সে জগতের বাসিন্দা হয়ে ওঠাই কি স্বাভাবিক নয়?

বাস্তব জগতের চেয়ে স্ক্রিনের জগতটাকেই তো বেশি বাস্তব বলে মনে হয় তখন। আসলে আমরা চাই না চাই, বুঝি না বুঝি, অদ্ভুত এক বস্তুবাদের গোলকধাঁধায় আটকে আছি প্রায় সবাই।
আমাদের জীবনের বেশিরভাগ সমস্যাই এখন বস্তুবাদের সাথে জীবনের দ্বন্দ্ব। আমরা জীবনে অনেক কিছুই করছি কিন্তু কেন যে তৃপ্তি পাচ্ছি না, কেন যে সুখী হতে পারছি না, কি একটা যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।
তবে চেষ্টা করলে বুঝতে পারা যায়। চেষ্টা করলে একটা দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠা যায়, ঘুমটা নিজে নিজে ভাঙ্গানো যায়। এর জন্যে স্ক্রিনটাকে সময় না দিয়ে মনটাকে আরেকটু সময় দেয়া প্রয়োজন। এর জন্যে মেডিটেশন। মনের সাগরে ডুবুরি হওয়ার প্র্যাকটিস।  

মেডিটেশন নিয়ে বলব অন্য একদিন, তার আগে বিস্তারিত অনেক কিছু জানতে পারবেন এখানেঃ https://meditation.quantummethod.org.bd/bn

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *