জীবন কঠিন না মৃত্যু? (২)

সেদিন সকালে ঘুম ভাঙার সাথে সাথে একটা খবর পেলাম। আগের রাতে নাকি আগুন লেগেছে কোথায়। আমার বোনের শ্বশুরবাড়ির দিকে তিন আত্মীয় পুড়ে মারা গেছেন। ভোর ৬টায় আমার বোন ঢাকা মেডিকেলের মর্গে গিয়েছিলেন, এবং ওখান থেকে ফেরার পর কারো সাথে কথা বলতে পারছেন না, শকের কারণে। 

শুক্রবার সকাল। আমার ঘুমের ঘোর তখনও কাটে নি। রাতে কোথায় যে এত বড় আগুন লেগে গেল, বুঝতে পারলাম না। আগের রাত, মানে বৃহস্পতিবার রাতে কজন বন্ধুর সাথে বাইরে খেতে যাবার কথা ছিল। কিন্তু কোথায় যাওয়া যায় আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। পরে আলসেমি চেপে বসল, আর যাওয়া হয় নি। দুলাভাইও বলছিলেন পরিবারের সবাই মিলে ডিনারের কথা। বেইলি রোড সবারই কাছে হয়। কাচ্চি ভাইয়ে যাবে কিনা জিজ্ঞেস করছিলেন। কেন যেন ওটাও ক্যান্সেল হয়ে গেল। বেইলি রোডে আমাদের সবসময়ই যাওয়া আসা। ওখানে কি এমন আগুন লেগে গেল ভাবতে ভাবতে টিভিটা ছাড়লাম, শিরোনাম – আগুনে পুড়ে ৪৬জনের মৃত্যু, ১২জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক! একই পরিবারের পাঁচজন। একই পরিবারের তিনজন। একই পরিবারের দুজন। সবাই মারা গেছেন। বোনেরা মিলে গেছে শপিং করতে। ফেরার সময় রেস্তোরাঁয় খেতে ঢুকেছিল। এক পরিবার খাগড়াছড়ি যাবে। খেয়ে রওনা দিবেন বলে রেস্তোরাঁয় ঢুকেছিলেন। কেউ ফিরে নি। একেকটা পোড়ার খবর একেকটা মৃত্যু – আমি সেখানে দেখতে পারছিলাম আমাকে, আমার পরিবারকে। আমার বোনদেরকে, আমার ভাগ্নেদেরকে। আমার বন্ধুদেরকে, সহকর্মীদেরকে। ওদের জায়গায় তো আজকে আমি হতে পারতাম, হওয়াটা খুব স্বাভাবিক ছিল। 

যারা মারা গেছেন তারা তো গেছেন। কিন্তু যাদেরকে রেখে গেছেন, যাদের পরিবার পরিজন আত্নীয় স্বজন,  ভালোবাসার মানুষজন, তারা কীভাবে মেনে নিবেন এই মৃত্যুকে? হাসতে খেলতে সন্ধ্যাবেলায় যে মানুষটার সাথে দেখা হলো কথা হলো, সে আগুনের ভেতর চলে গেল। মৃত্যু খারাপ কিছু নয়। জীবনের মতোই তা স্বাভাবিক। কিন্তু এই অস্বাভাবিক চলে যাওয়া, কোনো বিদায় না দিয়ে, কোনো শেষ কথা না বলে, শেষ মুহুর্তে একটা ফোন কলে, বাঁচার আকুতি জানিয়ে, কাচ্চি ভাইয়ের ক্যাশিয়ারের মতন ফোনে মায়ের সাথে কালেমা পড়তে পড়তে… এ কেমন চলে যাওয়া?  

কিছুদিন আগে আমার চাচা চলে গেলেন। তিনি গ্রামে ছিলেন, স্ট্রোক করেছিলেন। এম্বুলেন্সে করে ঢাকায় আসার পথে, শুয়ে শুয়ে তিনি জীবনের সব হিসাব নিকাশ সেরে ফেলেছিলেন। কে তার কাছে কী পায়, কাকে কী বলা বাকি, জীবনের কোন হিসাবগুলো মেলানো বাকি, কোন ব্যাপারগুলো সমাধান বাকি। রাত ২টায় আইসিইউতে যখন আমার বোনরা তাকে দেখতে যায়, তিনি ধমক দেন, এত রাতে কি, তারা যেন দ্রুত বাসায় চলে যায় ইত্যাদি। সবাই সান্তনা পান। এভাবে যেহেতু ধমক দিয়ে বাসায় যেতে বলছে, তাহলে চাচার তেমন কিছু হয় নি, সুস্থ হয়ে যাবেন। ঠিক করেন বাসায় গিয়ে রান্নাবান্না করে পরদিন হাসপাতালে আসবেন। কিন্তু বাসায় ফেরার দুই ঘণ্টা পরই খবর আসে, চাচা চলে গেছেন, এবং তিনি জানতেন যে তার শেষ সময় চলে এসেছে। কেউ যেন ভয় না পায় তাই সবাইকে বিদায় করে দিয়েছিলেন। এরপর তার বড় ছেলের পাশে শুয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চাচাকে বিদায় দিতে গিয়ে আমরা দুঃখ পেয়েছি, কিন্তু কষ্ট হয় নি। সবকিছু প্রস্তুত ছিল গোছানো ছিল। কিন্তু সেদিন যে মানুষগুলো মারা গেল, কতকিছু গোছানোর বাকি ছিল তাদের….

কিছুদিন আগে একটা বিশেষ প্রোগ্রামে যাওয়া সুযোগ হয়েছিল আমার, মৃত্যুর আড্ডা বা ডেথ ক্যাফে। আমরা জীবনের নানান বিষয়ে নানান রকমের আয়োজন করি প্রস্তুতি নেই , জন্মদিন গ্রাজুয়েশন বিয়ে শাদি এনিভারসারি ইত্যাদি। কিন্তু মৃত্যুটাও জীবনেরই একটা অংশ একটা ঘটনা। এটা নিয়ে আমাদের কোনো আয়োজন বা প্রস্তুতি থাকে না আমাদের। এমন না যে এই প্রস্তুতি না নিলে মৃত্যু পেছাবে বা আসবে না। মৃত্যু ঠিকই তার সময় মতন এসে যাবে। কথা হচ্ছে মৃত্যুটা কি তখন আমাদের কাছে আফসোসের হবে, আক্ষেপের হবে, নাকি শেষ সময়ে শেষ কিছু কথা বলে কিছু ইচ্ছা পূরণ দেখে তৃপ্তির সাথে বিদায় নেয়া যাবে। 

সেদিনের আড্ডা মূলত সঞ্চালন করছিলেন ভারতের কেরালায় কমিউনিটি বেজড প্যালিয়াটিভ কেয়ারের প্রবর্তক ডক্টর সুরেশ কুমার, এবং তার বন্ধু, আমাদের দেশের প্যালিয়াটিভ কেয়ারের জনক, ডক্টর নিজামউদ্দিন আহমেদ। দুজনই মৃত্যু নিয়ে কাজ করা মানুষ, এবং অদ্ভুত রহস্যময় মানুষ। হাজার হাজার মৃত্যু পথযাত্রীর শেষ সময়কে খুব কাছ থেকে দেখেছেন তারা। এত মানুষকে এত আফসোস নিয়ে মারা যেতে দেখেছেন যে, মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় – তার জীবন থেকে বিদায় নেয়ার সময়ে এই আফসোসগুলো যেন আর না থাকে সেজন্যেই উদ্যোগ নিয়েছেন ডেথ ক্যাফের। 

তো সেদিন ডেথ ক্যাফেতে একটা মেঝেতে আমরা প্রায় ২০/২৫ জন গোল হয়ে বসলাম। ডাক্তার, নার্স থেকে শুরু করে ভলান্টিয়ার, রোগী ও আমার মতন আগ্রহী অনেকে ছিলেন। এরপর শুরু হলো মৃত্যু নিয়ে ভাবা। যে মৃত্যুকে আমরা যতই দূরের মনে করি না কেন, মৃত্যুটা খুব কাছে, এবং জীবনের আর সবকিছুর মতই খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা। এরপর চিন্তা করা যে আমরা কেমন মৃত্যু চাই। বাসায়, নাকি হাসপাতালে। কারো পাশে শুয়ে, নাকি একা একা। মৃত্যুর সময় শেষ ইচ্ছাগুলো কী হবে। কোন অপূর্ণ ইচ্ছাগুলোর জন্যে আফসোস হবে। কোন কোন কাজগুলো রেখে যেতে চাই, কাকে শেষ কিছু কথা বলে যেতে চাই, কোন হিসাবগুলো মিলিয়ে যেতে চাই। এরপর, মৃত্যুর পর, দাফন, নাকি সমাধি নাকি সৎকার। কোথায় চাই, কেমন করে চাই। ইত্যাদি। 

ডেথ ক্যাফের অন্যতম নিয়ম হলো এই আড্ডায় যা কিছু কথা হবে তা কখনো বাইরের শেয়ার হবে না, এবং যে যা কিছু বলবে, তাকে এই ব্যাপারে কোনো জিজ্ঞাসা বা মন্তব্য করা যাবে না। তো একে একে সবাই মন খুলে সবাই বলতে লাগলেন সেদিন। আমিও বললাম। বলতে বলতে বের হলো মনের কোণে জমে থাকা গভীর কিছু সুখ দুঃখের কথা, চাওয়া পাওয়ার কথা, প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির কথা। অনেকেই বলতে বলতে কেঁদে দিলেন। কেউ কেউ প্রিয়জনদের মৃত্যুর স্মৃতিচারণ করলেন। প্রত্যেকে সমমর্মী হয়ে একে অপরের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন, নিজের কথাগুলো বললেন।

এভাবে চলল প্রায় দু ঘন্টা। দু ঘন্টা পর যখন সে আড্ডা থেকে উঠে এলাম, মনে হলো যেন নিজের মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরলাম। আবার জীবনের কাছে ফিরলাম। কিছু হিসাব নিকাশ করার সময়টা নিয়ে ফিরলাম। অদ্ভুত লাগতে শুরু করল জীবনকে, বেঁচে থাকাকে।   

ডক্টর সুরেশ কুমার হাজার হাজার রোগীদের শেষ সময়কে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, যেহেতু মৃত্যু পথযাত্রীদের নিয়েই তিনি কাজ করেন। তিনি খুব অন্তর থেকে বলছিলেন যে, তিনি সর্বদা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকেন, কারণ তিনি দেখেছেন মৃত্যু মানুষের কতটা কাছে। কীভাবে মুহুর্তেই গোটা জীবনের সবকিছু পাল্টে যেতে পারে। তাই তার মনে হয় একেকটা দিন যে তিনি বেঁচে আছেন, এর পুরোটাই বোনাস। প্রতিটা দিন বোনাস। এবং তিনি সবকিছু রেডি করে রেখেছেন, যেন যেকোনো সময় যেকোনো কোথাও মৃত্যু হলে তার  কিছু বাকি রয়ে না যায়।  আমাদেরকেও বারবার অনুরোধ করেছিলেন, যে আমরা যেন এই সত্যকে উপলব্ধি করি, এবং সেভাবে বাঁচি। কারণ আমরা বেশিরভাগ মানুষই ধারণা করতে পারি না যে আগামীকাল আমি ঘুম থেকে উঠব বা উঠব না – এই দুটোর সম্ভাবনাই ফিফটি ফিফটি। 

বেইলি রোডে যা হলো তা আমাদের যে কারো সাথেই হতে পারতো, বা প্রভু না করুন, সামনে হতেও পারে। বা অন্য কিছু হতে পারে। ভূমিকম্প, ঘুমের ভেতর স্ট্রোক, আরও কত কি। আমরা জানি না কি হবে। শুধু জানি যে হবে। তাই আমাদের যার যার জায়গা থেকে ডেথ ক্যাফের মতো একটা আয়োজন করে রাখা খুব দরকার। 

ডেথ ক্যাফে কীভাবে করতে হয় তা নিয়ে লিখছি, যে কেউই করতে পারেন – 

২/৫  জন হলেই হবে। খাতা কলম নিয়ে বসলে ভালো হয়, ভাবনাগুলোকে তৎক্ষণাৎ টুকে রাখার জন্যে।  এই আড্ডার প্রধান শর্ত হলো কেউ কাউকে কোনোকিছু জিজ্ঞেস না করা বা মন্তব্য না করা, এবং আড্ডার সব কথা নিজের মাঝে রাখার অঙ্গীকার করা। কারো কথা কখনো বাইরে যাবে না। 

এরপর একেকটা প্রশ্ন বাছাই করা এবং একজন একজন করে উত্তর দেয়া। আলোচনা করা।

প্রশ্নগুলো যেমন হতে পারে –  

১। আমি কি হঠাৎ মারা যেতে চাই, নাকি কিছু সময় নিয়ে মারা যেতে চাই, কতটা সময় নিয়ে? নাকি ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু?

২। আমি কেমন মৃত্যু চাই – পরিজনদের হাত ধরে, নাকি একা, করো হাত ধরে, কারো চোখের দিকে তাকিয়ে…ইত্যাদি [লাইফ সাপোর্টে মারা যেতে না চাইলে তা স্পষ্ট করে লিখে রাখা, ও পরিবার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করা]  

৩। এখন যদি মৃত্যু এসে হাজির হয় তাহলে কোন আফসোসগুলো আমার থাকবে – যে  অমুক জায়গা যাওয়া হলো না, অমুক সখটা পূরণ হলো না, অমুক কাজটা করা হল না ইত্যাদি। 

৪। সে আফসোগুলো এখন থেকেই কিভাবে মেটানো যায়? [তার একটা লিস্ট ও ক্যালেন্ডার করা]  

৫। আমার কি কারো কাছে ক্ষমা চাওয়ার আছে, কাউকে কিছু বলে যাওয়ার আছে? – সেগুলো কিভাবে বলা যায় বা চিঠি লেখা যায় 

৬। আমি কোন জায়গায় কবর/সমাধি/সৎকার চাই। কে গোসল করবে বা চিতায় আগুন দিবে। কোথায় কখন – সব জায়গা নাম বিস্তারিত। এবং তার একটা কপি পরিবারের কাছে রেখে দেয়া। 

৭। আমার মৃত্যুর পর আমার কোন কাজগুলো আমি কার মাধ্যমে করাতে চাই বা কোন আবদারগুলো রেখে যেতে চাই। যেমন সম্পদের বন্টন, নিজের জিনিসগুলো বন্টন, ভালো কাজে দান, ইত্যাদি। 

৮। এতক্ষণ যা বললাম, তা আমি এখন থেকেই কীভাবে করা শুরু করতে পারি এবং করে ফেলতে পারি। কারণ বাস্তব সত্য এই যে আমরা যে কেউ যেকোনো সময় যেকোনো কোথাও, এমন কি ঘুমের মধ্যে মারা যেতে পারি। আর মনের শেষ ইচ্ছাগুলো প্রকাশ না করলে কেউই কখনো জানতে পারবে না, এবং শত চাইলেও সে কাজগুলো করতে পারবে না। তাই এখন থেকেই তা শুরু করা এবং প্রকাশ করা। 

মনে হতে পারে যে মৃত্যু নিয়ে এভাবে ডুব দেয়া খুব ভারী বা গম্ভীর ব্যাপার স্যাপার। হয়তো খুব কষ্ট লাগবে বা দুঃখ বোধ হবে। মোটেই না। উল্টো দেখবেন খুব ভালো লাগা শুরু করছে। যে আপনি এখনো বেঁচে আছেন। এখনো সময় আছে, সুযোগ আছে। সব শেষ হয়ে যায় নি। যে যতক্ষণ আপনি নিঃশ্বাস নিচ্ছেন ততক্ষণ সবকিছু সম্ভব। জীবনটাকে খুব জীবন্ত মনে হবে তখন।  

এবং আপনার মৃত্যু – সে আজকে কালকে ৫/১০/২০ বছর পরে যখনই আসুক, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে তখন আপনি নিজেকে বিশাল একটা ধন্যবাদ দিবেন। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারবেন। 

অথবা হয়তো, মৃত্যুর এই প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আপনার জীবনটাই পাল্টে যাবে। এমন অনেক কিছু হয়তো করা হবে যা মৃত্যুর কথা না ভাবলে আপনার করা হতো না। এবং সেগুলো করার মাধ্যমে জীবনটা নতুন করে শুরু হবে। জীবন তো বারবার শুরু করারই নাম। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *