দিনগুলি, (২০২৪)

২৫/২/২০২৪

শবে বরাতের সন্ধ্যা। অফিস থেকে বেরিয়ে রিক্সা খুঁজছি। পাশেই এক বেকারির দোকানে শবে বরাত উপলক্ষে নানান রকম রুটি হালওয়া সাজিয়ে বসেছে। বিশাল সাইজের রুটি দেখে জিজ্ঞেস করলাম, এটা কী রুটি? অর্থাৎ ভেতরে কী দেয়া আছে জানতে চাইছিলাম। দোকানদার অতি আগ্রহী হয়ে রুটির বিশেষত্ব বোঝাতে উত্তর দিলেন, এট ‘আধুনিক’ রুটি! দাম ৩৫০টাকা! এক রুটি এত দাম দিয়ে কেনার মনে হয় না। আমি আধুনিক রুটি কেনা বাদ দিয়ে রিক্সা খুঁজতে লাগলাম। একটু পরেই একটি মেয়ে এসে দাঁড়ালো সেখানে। সেও ‘আধুনিক’ রুটির দরদাম করে কিনতে আগ্রহ দেখালো না, বেকারির অন্যান্য আইটেম কিনতে চাইল। 

মেয়েটার হাতে একটা ৫০০ টাকার নোট, সম্ভবত টাকাটা ভাঙতি করতে চায়। বয়স ২৫/২৬ হবে। টুকটুকে লাল কামিজ আর জিন্স পড়া, কপালে কালো টিপ। দেখে মাস্টার্সের ছাত্রী মনে হলো। দোকানদাররা দেখলাম বেশ উৎসাহী হয়ে গেল মেয়েটির কাছে ‘আধুনিক’ রুটি বিক্রি করতে। প্রায় জোর করতে লাগল। মেয়েটি এক দাম বলল ২০০টাকা। ওদিকে দোকানদার ৩৫০ থেকে নেমে এলো ২৫০ টাকায়। মেয়েটি নাছোড়বান্দা, রুটি কিনবে না। ওদিকে দোকানদাররা তাকে না কিনিয়ে ছাড়বে না। অবশেষে বলল, আপু, ৫০ টাকা তো কত কাজেই অপচয় করেন তাই না? আমাদের দিয়ে দিলেন আজকে।  

মেয়েটিকে দেখে শান্ত লাজুক টাইপ মনে হচ্ছিল, কিন্তু সে দেখি সাথে সাথে বেশ স্পষ্টভাবে জবাব দিল, না ভাই, আমি ৫০টাকা অপচয় করি না, আমি চাকরি করি। 

দোকানদাররা যেন একটু থমকে গেল। এই মেয়ের কাছ থেকে এরকম উত্তর আশা করেন নি তারা। তারা হয়তো মনে করেছিলেন ধনীর দুলালী, কত কাজেই টাকা উড়ায়, সহজেই গছিয়ে দেয়া যাবে। সেখানে তার স্পষ্ট জবাব, ধনীর দুলালি হলেও ৫০টাকার মূল্য দিতে সে জানে কারণ সে নিজে উপার্জন করে। 

দোকানদাররা সাথে সাথে বলে উঠল, আপা নিয়ে যান। এই দামে কখনো দেই নাই, আপনারে দিয়া দিলাম। 

তারা ২০০টাকায় রুটিটা দিয়ে দিলেন। দেয়ার সময় আমি লোকগুলোর চোখ খেয়াল করছিলাম। চোখে এক প্রকার দায়িত্ব ও সম্মান প্রকাশ পাচ্ছে। তারা ওই দোকানে কর্মরত। তারাও চাকরি করেন। উপার্জিত অর্থের মূল্য তারা বোঝেন। এবং মেয়েটির উপার্জন করাকে সম্মান জানিয়েই দিয়ে দিলেন। 

আমাকে অবাক করল মেয়েটি নয়, বরং দোকানদাররা। দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে মেয়েটি নেহায়েত কম উপার্জন করে না। কিন্তু সে বেকারিতে যারা চাকরিরত, তাদের আয় খুব সীমিত। তবু তারা অর্থের মূল্য দিতে পারার ব্যাপারটাকে সম্মান করেন। এই শহরে এক সচ্ছল ঘরের মেয়ে নিজ হাতে উপার্জন করে খরচ করে এটাকে তারা সম্মান করেন। 

আসলে অর্থ হাতে থাকুক বা না থাকুক, সবাই অর্থের মূল্য দিতে পারে না। মূল্য বলছি এই অর্থে যে অর্থ খরচ করাটা কিন্তু কোনো বাহাদুরি নয়। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আপনি পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে পোশাক না কিনে যদি ৪ হাজার টকা দিয়ে কিনেন, আর বাকি ১ হাজার টাকা অভাবীকে দান করেন, তখন সে টাকার মূল্য আপনি বুঝতে পারবেন। যে একটু বাড়তি খরচ কমিয়ে কত মানুষের কত বড় উপকার করা যায়। যে এক হাজার টাকা কত মানুষের কত কাজে লাগতে পারে, কত কষ্টকে নিবারণ করতে পারে, কতজনের মুখে অন্ন তুলে দিতে পারে। শুধু অভাবে পড়লেই যে অর্থের মূল্য বুঝতে হবে, ব্যাপারটা এমন নয়। 

কোথায় যেন পড়েছিলাম, অর্থ আয় করার চেয়ে ব্যয় করা কঠিন। অর্থ আয় করা যায়, কিন্তু যথাযথভাবে ব্যয় বা খরচ সবাই করতে পারে না। হাতে পয়সা থাকা সত্ত্বেও অপচয় না করে ফুটানি না করে, বা শুধু স্বার্থের পেছনে অর্থ না ঢেলে, অন্যের প্রয়োজনকে অনুভব করা, অর্থটা যার প্রয়োজন তার কাছে পৌঁছে দেয়া, নিজের ও অন্যের কল্যাণে ব্যয় করা, নিঃস্বার্থভাবে দান করা, এটা করতে এক প্রকার শক্তি লাগে। এবং সে শক্তিকে সচ্ছল অসচ্ছল নির্বিশেষে সকল মানুষই সম্মান করে। 

১৫/০১/২০২৪  

মানুষ কি নিজের প্রয়োজন সবসময় বোঝে? কেউ কেউ বোঝে, কেউ কেউ বোঝে না। মানুষ নিজেও অনেক সময় টের পায় না যে সে বুঝতে পারছে না। 

একজন মেয়েকে আমি চিনি, কলেজ পড়ুয়া। খুব একাকীত্বে ভুগে। তার সমবয়সী কাউকে সে বন্ধু বানাতে পারে না, কারণ হয়তো সেভাবে তাদের সম্মান করতে পারে না। অমুক লেখক তমুক কবি তমুক নাট্যকার, এদের সাথেই তার উঠবস হওয়া চাই।
আরেকজন ছেলেকে চিনি, একাকী বিষণ্ণ, ও প্রচণ্ড নেতিবাচক। তার কোনো বন্ধু নেই। যাদের সঙ্গে চলে তারা খুব পয়সাওয়ালা। পয়সাওয়ালা মানুষদেরকেই সে সঙ্গ হিসেবে প্রাধান্য দেয়।
একজন নারীকে চিনি, খুব মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও চরম বিষণ্ণতায় আক্রান্ত। কাছ থেকে দেখেছি, এলিট পর্যায়ের না হলে সে নারী কারো দিকে ঘুরেও তাকায় না। 

এই তিনজন মানুষই খুব একা, নিঃসঙ্গ, ডিপ্রেশনে আক্রান্ত। কিন্তু নিজেদের ধারণার বাইরে কাউকে তারা গ্রহণ করতে পারছে না কেন? কলেজ পড়ুয়া মেয়েটির হাস্যোজ্জ্বল কত স্মৃতি হতে পারতো সমবয়সী বান্ধবীদের সাথে। সেই ছেলেটি কত ভালো সময় কাটাতে পারতো সাধারণ পরিবারের ছেলেদের সাথে। সেই নারী কিছু শুদ্ধ ভালো মানুষের সঙ্গ পেলে ডিপ্রেশন ও একাকীত্ব থেকে বেরিয়ে আসার দরজাটা হয়তো পেয়ে যেত। 

আমরা কাছের জিনিস দেখি না। দূরের জিনিস, বিভ্রম হলেও, সেটা দেখার জন্যে মুখিয়ে থাকি। বাস্তবতার চেয়ে কল্পনাকে বেশি প্রাধান্য দেই।

ভার্সিটি পড়াকালীনও আমি ভাবতাম, আমাকে অনেক বড় কিছু করতে হবে। তাই নাসায় বিজ্ঞানী হলে বা সার্নে কাজ করলে আমার বড় মাপের কোনো কাজ করা হবে। কিন্তু বাড়ির পাশে মানুষের সেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানের দিকে আমার চোখ যায় নি। আমি তো বড় কাজ চেয়েছিলাম, বড় দালানকোঠা নয়, ট্যাগলাইন নয়, বড় বড় কর্পোরেশন নয়। আমার মনের ইচ্ছাটা প্রভু শুনেছেন, এবং এমন সময়ে এমনভাবে সাড়া দিয়েছেন যে এভাবে না হলে এর মর্মই আমি বুঝতে পারতাম না।

আসলে আমাদের চোখ যে কতভাবে বন্ধ থাকে। চোখগুলোকে খুলতে পারা, পৃথিবীটা দেখতে পারা, সৃষ্টির ভেতরে সৃষ্টার মহিমা বুঝতে পারা অনেক বড় ভাগ্যের ব্যাপার। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *