মমতার প্রকাশ, পারিবারিক প্রার্থনা

কিছুদিন আগে আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম, পৃথিবীতে নরক কী? 

উত্তরটা সাথে সাথেই পেয়েছিলাম –  সবচেয়ে কাছের জন, ভালোবাসার জন, পরিবার পরিজন- দের সাথে সংঘাত ও দূরত্ব। যেটার কোনো মীমাংসা হবার নয়। 

আমাকে সেদিন একজন বলছিলেন, “আমার এত খারাপ লাগে যে আমি কখনো আমার পরিবার থেকে এমনি এমনি ভালোবাসা পাই নি। ভালবাসাটা যেন আমাকে আদায় করে নিতে হবে। পরীক্ষায় এই রেজাল্ট করলে এরপর ভালোবাসা পাব। খারাপ করলে পাব না। অমুক ভার্সিটিতে পড়লে ভালোবাসা পাব, এছাড়া পাব না। এখন আছি বিয়ে নিয়ে প্রেশারে। আমার বিয়ে হলে এরপর তারা আমাকে ভালবাসবেন। তার আগ পর্যন্ত আমার ওপর তাদের যত চিন্তা টেনশন ফ্রাস্ট্রেশন ঝাড়তেই থাকবেন। আমি আমার পরিবার থেকে একটু মমতা একটু ভালোবাসা কোনোদিন শুধু “আমি” হয়ে পেলাম না।”

শুনে কষ্ট লাগল। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে ওর পরিবার ওকে অবশ্যই ভালবাসে। কিন্তু পরিবারের চাহিদার অস্থিরতায় সে ভালোবাসা ছাইচাপা পড়ে গেছে। ভালবাসাটা প্রকাশ হতে পারে নি কখনো। তাই সে পরিবারে থেকেও এত বঞ্চিত নিঃসঙ্গ অনুভব করে। 

কিন্তু একটা ঘটনার কথা যখন শুনলাম, – 

একজন ক্যান্সার আক্রান্ত তরুণের ঘটনা। তার ক্যান্সার শেষ পর্যায়ে যেতে যেতে এমন অবস্থা, সাড়া শরীরে টিউমার ফেটে পড়বে এমন, তখন ডাক্তাররা ঘোষণা দিলেন যে সে দুই সপ্তাহের বেশি বাঁচবে না। তার পরিবার তাকে বাসায় নিয়ে গেল একটা জ্যান্ত লাশ হিসেবে। 

দু বছর পরে সেই তরুণের হঠাৎ তার ডাক্তারের সাথে দেখা। ডাক্তার দেখে হতবাক। বললেন, যে তুমি এখনো বেঁচে আছ? কীভাবে?? 

তরুণ বললেন, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তো আমি আপনার কাছে এলাম। আমি কী করে এখনো বেঁচে আছি এবং দিব্যি সুস্থ আছি?  

তখন ডাক্তাররা তাকে নিয়ে স্টাডি করলেন এবং দেখলেন যে বাসায় ফেরার পরে সেই তরুণের পরিবার প্রতিদিন একত্র হয়ে সেই তরুণের জন্যে প্রার্থনা করতেন। এই প্রার্থনার শক্তিতেই সে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে। 

এই ঘটনা মেডিকেল জার্নাল JAMA-তে প্রকাশিত হয়েছে। 

স্রষ্টার দয়া একটা ব্যাপার, ঠিক আছে। কিন্তু আমি ভাবলাম, যে ঐ সময়ে, জীবনের শেষ মুহূর্তে যদি আমি আমার সবচেয়ে আপনজনদের থেকে এরকম ভালোবাসার প্রকাশ দেখতাম, যে একত্রিত হয়ে সবাই শুধু আমার কটা দিন বেঁচে থাকার জন্যে স্রষ্টার কাছে এত আকুলভাবে প্রার্থনা করছে, তাহলে তো মরেও শান্তি। 

আমাদের কঠিন সময়গুলোতে আমাদের পরিবারের সবাই কিন্তু একে অপরের জন্যে প্রার্থনা করে ঠিকই, কিন্তু যার যার মতন নীরবে। নীরবে করাও ভালো। আবার প্রকাশ্যে করা, একসাথে করা, এবং ভালোবাসার এমন সরাসরি প্রকাশের মর্ম আলাদা।  

জীবনে যখন আমরা পিছিয়ে যাই বা দুর্বল হয়ে যাই, আমাদের প্রথম ভয় থাকে যে আমার কাছের মানুষেরা বোধয় আমাদের দুর্বল ভাবছে, দোষারোপ করছে, ছেড়ে চলে যাচ্ছে ইত্যাদি। দুর্বল হলে এমনিতেই আমরা ভেতরে ভেতরে জড়সড় হয়ে থাকি, তার ওপর যদি প্রিয়জনদের কাছ থেকে কথা শুনতে হয় খোঁটা খেতে – এর চেয়ে অশান্তির আর কী হতে পারে? 

এবং এই অশান্তি থেকেই যত সংঘাত ও দূরত্ব শুরু হয়। 

কিন্তু এর উল্টোটা যদি হতো?
যে সন্তানটা পরীক্ষায় ফেল করল, সে যদি দেখতো যে তার বাবা-মা, ভাই-বোন তাকে শুধু বকাঝকা করে, কটু কথা না বলে, তাকে হীনম্মন্য না বানিয়ে উল্টো তার জন্যে প্রার্থনা করছে স্রষ্টার কাছে, যে আল্লাহ, ও যেন পরীক্ষায় ভালো করতে পারে তুমি সহজ করে দাও, তাহলে সেই বাচ্চাটা যে ভরসা পাবে যে শান্তি পাবে, মনের মধ্যে যে শক্তি পাবে, পরিবারে যে আশ্রয় পাবে, সেটা দিয়ে সে জীবনের অনেক অনেক ব্যর্থতা অতিক্রম করতে পারবে। 

অথবা ধরুণ স্বামীর কোনো কারণে অভাব দেখা দিল। তখন তার মনে ভয় শুরু হতে পারে, যে আমার স্ত্রী বোধয় আর পাত্তা দিল না, স্ত্রী ছেলেমেয়েদের কাছে বোধয় আমি ব্যর্থ হয়ে গেলাম। এই অনুভূতি থেকে তার মেজাজ আরও খিটখিটে থাকবে, এবং কিছু না বললেও তার কাছে বারবার মনেই হবে যে সেই বোধয় পারল না। এবং নিজের অজান্তেই পরিবারের সাথে হয়তো দূরত্ব বাড়াবে, কটু কথা শোনার ভয়ে।  

কিন্তু এই সময়ে যদি সে লোকটা দেখতো যে উল্টো তাকে নিয়ে তার স্ত্রী সন্তান প্রতিদিন প্রার্থনা করছেন, স্রষ্টার কাছে আকুলভাবে আবেদন করছেন, যেন তার সমস্যাটা দূর হয়, তাহলে তিনি সে সময়টায় তার স্ত্রী সন্তানের যে মমতা অনুভব করবেন, তার কঠিন সময়টাতে তাদের যে ভালোবাসা অনুভব করবেন, এটা তার মনের শক্তি অনেক বৃদ্ধি করে দিবে। অনেক কিছু জয় করার শক্তি সামর্থ্য তিনি মনের মধ্যে পাবেন। 

একই সমস্যা স্ত্রীর বেলায়ও হতে পারে। আমাদের পুরুষশাসিত সমাজে স্ত্রীরা ক্যারিয়রে যতটা প্রতিকূলতার মুখে পড়েন, তার চেয়েও ঢের বেশি পড়েন শ্বশুরবাড়িতে, অথবা হয়তো নিজ পরিবারেই। পারিবারিক সমস্যাগুলো বেশিরভাগই সমাধান হবার নয়। তারা যে হুট করে সব সমাধান চায়, এমনও কিন্তু নয়। তারা চায় যে তার স্বামী তার কথাগুলো শুনুক, একটু অনুভব করুক। একজন স্ত্রী যদি দেখেন তার স্বামী পারিবারিক ঝামেলাগুলোর সমাধানে তার স্ত্রীর জন্যে প্রার্থনা করছেন – ঐ স্বামীর আসলে সাত খুন মাফ হয়ে যাবে! (অসংখ্য স্ত্রী-গণদের দেখে বলছি )

আমি খুব কমন কিছু উদাহরণ দিলাম। এমন আরও নানান রকম পরিস্থিতি আসে যখন পরিবারের একজন সদস্য হয়তো দুর্বল হয়ে পড়েন। এবং সাধারণত যা হয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, যে বাকি সদস্যরা মিলে তাদের দুশ্চিন্তা কষ্ট ফ্রাস্ট্রেশন উল্টো সেই দুর্বল সদস্যের ওপর আরও বেশি করে ঢালতে শুরু করেন। এতে যিনি দুর্বল ছিলেন আরও দুর্বল হয়ে পড়েন। এবং পরিবারের সাথে দূরত্ব বাড়ে। মমতা ভালোবাসা সব ছাইচাপা পড়ে যায়। 

কিন্তু মানুষ মমতা খোঁজে ভালোবাসা খোঁজে, হন্য হয়ে। মমতা ভালোবাসা ছাড়া মানুষ শান্তি পায় না। আর এটা পরিবার ছাড়া আর কেউ দিতে পারে না। কারণ পরিবারে আমরা আসলে কী খুঁজি? অর্থবিত্ত? নাম ধাম? যশ প্রতিপত্তি? বা বাহ্যিক আর কোনোকিছু?
পরিবারে আমরা আশ্রয় চাই। ভালোবাসা চাই। নিঃশর্ত ভালোবাসা। এবং মমতা।

একসাথে পারিবারিক প্রার্থনা এই মমতা ভালোবাসা প্রকাশের অনেক সুন্দর একটা মাধ্যম হতে পারে। একসাথে প্রার্থনা মানে সবাই মিলে একবেলা অন্তত দোয়া করা, জামাতে যেভাবে দোয়া করা হয়। হয়তো বাসার কর্তা করলেন বা কর্তী করলেন, বা সন্তানরাই করল। নাম ধরে ধরে সমস্যার কথা উল্ল্যেখ করে একসাথে স্রষ্টার কাছে চাওয়া।
একটু চোখ বন্ধ করে আপনিই ভাবুন। যদি আপনি শোনেন আপনার বাবা/মা/ভাই/বোন আপনার সামনে আপনাকে নিয়ে প্রার্থনা করছে একসাথে, স্রষ্টার কাছে আন্তরিকভাবে, (এবং অবশ্যই আপনাকে শোনাতে বা দেখাতে নয়), আপনি কতটা কৃতজ্ঞ অনুভব করবেন? কতটা শান্তি অনুভব করবেন? মমতার স্পর্শ অনুভব করবেন?

আসলে বিপদে পড়লে কষ্ট পেলে মানুষ প্রথমে একটু শান্তি খোঁজে। একটু শান্তি পেলে তার মনের ভেতরে শক্তি সঞ্চার হয়। মনে শক্তি সঞ্চার হলে যে জীবনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, তার সর্বস্ব প্রয়োগ করতে পারে, এবং তার জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়। 

তার চেয়েও বড় কথা, পরিবারের সাথে তার শেকড়টা আরও মজবুত হয়। তার জন্যে বিকশিত হওয়ার পথটা সহজ হয়, এবং পরিবারটাও একটা সুস্থ পরিবার হিসেবে বিকশিত হতে পারে। এবং তখন সে পরিবার ভালো মানুষ তৈরি করতে পারে – একটি দেশের জন্যে, জাতির জন্যে, পৃথিবীর জন্যে। 

কিছু সম্পর্কিত রেফারেন্সঃ

প্রার্থনা ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের আয়ু বৃদ্ধি করতে কতটা সহায়তা করে এ নিয়ে একটি গবেষণামূলক আর্টিকেল – The relationship between praying and life expectancy in cancerous patients

ক্যান্সার আক্রান্ত যুবকের ঘটনাটাআ প্রথমে শুনেছিলাম উনার বক্তব্য থেকে – Jamal Rahman on the Beauty and Majesty of Prayer

এই লেখাটা লিখতে গিয়ে আরেকটি ঘটনার কথা মনে পড়ল, কাতারের একজন ক্যান্সার আক্রান্ত মহিলার ঘটনা। কীভাবে বাঙালি এক মাকে সাহায্য করার পর তিনি ক্যান্সার থেকে নিরাময় লাভ শুরু করেন। আমার কাছে ঘটনাটা খুব সুন্দর মনে হয়, তাই শেয়ার করলাম – অন্যের কল্যাণ যখন করবেন, তখন আপনারও কল্যাণ হবে—দুটি ঘটনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *