মুন্নার নিয়ে লিখতে ইচ্ছা করে। আমি বারবার শুরু করি। এবং শুরু করতে করতেই হারিয়ে যাই। লেখা আর শেষ হয় না।
আমি কি করে বোঝাবো দক্ষিণ ভারতে কেরালার ঐ মুন্নার পাহাড়ে আমি কী রেখে এসেছি?
একটা প্রতিশ্রুতি, যে আমি আবার ফিরব।

কেন?
কেন-র উত্তর এই মুহুর্তেই না হয় না খুঁজলাম।
কিছু জায়গা কিছু মুহূর্ত আমাদের এমনভাবে ছোঁয়, এমন এক প্রভাব রেখে যায় এত অল্প সময়ের মধ্যে, সেটা আজীবনের জন্যে কেমন গেঁথে যায় মনে। কেন গেঁথে যায় সেটা সময়ের সাথে বোঝা যায়। মুন্নারকে আমি আরও সময়ের সাথে বুঝব। আপাতত বিশেষ তাড়া নেই।
আজ সকালে একটা সুন্দর কথা পড়লাম। একটা বইয়ে পড়েছিলাম। দাগ দিয়ে রেখেছি – “Perhaps the greatest gift we receive from the natural world is the moment when we understand something that is deeply important.”
এই বুঝতে পারার জন্যেই কি মানুষের জীবন নয়?
ফেরেশতারা স্রষ্টাকে মানে। মানুষেরা আগে বোঝে, এরপর মানে।
মজার ব্যাপার হলো, মুন্নারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় যে স্থান – কুরুক্কুমালাই, সেখানেই আমার যাওয়া হয় নি। যাওয়ার জন্যে প্রস্তুত হয়েছিলাম যদিও।
আমরা মুন্নারে গিয়েছিলাম ফেব্রুয়ারি মাসের কনকনে শীতে। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু চা বাগানের রাজ্যে, সমুদ্রপৃষ্ঠা থেকে ৭ হাজারের ফিটেরও বেশি উপরে। বছরজুরে ওখানে দিনে বসন্ত রাতে শীত।
তো কুরুকুমালাইইয়ের পথে রওনা দিতে হয় রাত ৩টা বাজে। এর জন্যে আগে থেকেই সাফারি জিপ ও গাইড ভাড়া করতে হয়।
এইসব কাজে অতি দক্ষ আমার স্বামী সব ঠিকঠাক করলেন এবং রাত ৩টায় কম্বলের আরাম ছেড়ে না ওঠার মন্ত্র জপ করতে লাগলেন।
আর ওদিকে আমি হাড়কাঁপানো শীতে কাঁপতে কাঁপতে অতি উৎসাহে এক ডজন মোজা টুপি পড়ে স্বামীকে হুমকি দিতে লাগলাম – ঠান্ডা পানি ঢেলে দিব।
এমন সময়ে হঠাৎ ফোন এল। জানা গেল, এই কমিউনিস্ট রাজ্যে (তখন কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায়) শ্রমিকরা হরতাল ডেকেছেন। এবং হরতাল মানে হরতাল। সবকিছু একেবারে বন্ধ। কোনো জীপ সেদিন আর কুরুক্কুমালাই যাবে না। পাহাড়ের রাজ্যে সূর্যোদয়ের অদ্ভুত স্বর্গীয় মুহুর্ত আমার দেখা হবে না।
খবরটা শুনে আমার স্বামী অতি আনন্দের সাথে অতি দুঃখী হওয়ার ভান করলেন। আর আমি কিছুটা ডিনায়েল মোডে চলে গেলাম।
বললাম, মুন্নার চায় আমরা আবার এখানে আসি। তাই সব রূপ এখন দেখাবে না। কিছু রেখে দিবে।
একদম সিনেমাতে যেমন নায়ক অন্য কাউকে বিয়ে করলে ডিলিউশনাল নায়িকা ভাবে – ও আমাকে এত ভালবাসে যে আমাকে ওর থেকে বাঁচাতে অন্য একজনকে বিয়ে করেছে!! এরকম টাইপ ফিলিংস।
তবে ডিলিউশনটা আমার মধ্যে সত্যি সত্যি রয়ে গেল। আমার এখনও মনে হয়, কেন যেন খুব বিশ্বাস হয়, আমি শিঘ্রই একদিন ভোরে কুরুক্কুমালাইয়ের ওপর সূর্যোদয় মন ভরে দেখব। একটাও ছবি তুলব না। ফোনই সাথে নিব না। শুধু আমার সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে পৃথিবীরে বুকে ঐ স্বর্গটুকুকে আমি ছোঁব।
আমি জানি, পৃথিবিতে আরও অনেক সুন্দর সুন্দর সূর্যোদয় দেখার জায়গা আছে। নানান দেশে নানান কিছু আছে। কিন্তু ওসব যে আমাকে টানে না।
মুন্নার আমার হৃদয়ে কিছু একটা ছুঁয়ে দিয়েছে। খুবই আচমকা ভাবে।
সে কি মানুষ? সে কি পাহাড়? সে কি সংস্কৃতি?
হয়তো সবকিছু, এবং আরও কিছু…।
কেরালার মানুষ খুব ভালো, কথাটা প্রথম শুনেছিলাম আমার শ্বশুর বাবার মুখে। খুব ভালো আর কতটা ভালো হবে? আমি তখনও বুঝতে পারি নি।
তবে কোচি এয়ারপোর্টে নেমেই টের পেলাম – এখানে একটা ব্যাপার আছে।
মুন্নারে হরতালের দিনে আমার স্বামীর সাইনাস আসি আসি করছে, সব দোকানপাট তখনো বন্ধ। তাও বেরুলাম ফার্মেসির খোঁজে। ২/৩টা দোকান খোলা পেয়েও গেলাম।
প্রতিটা দোকানে গিয়ে ও ওষুধের কথা জিজ্ঞেস করতে লাগল, আর আমি একটু পেছনে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করতে লাগলাম। দোকানদারদের আচরণ। অদ্ভুতরকম বিনয় কাজ করে তাদের মধ্যে। বিনয়টাই বোধয় এখানের সংস্কৃতি। ভালো লাগল।
হয়তো মুন্নারের এই ব্যাপারটাই আমাকে টেনেছে এত। রূপের এত ঐশ্বর্য থাকার পরেও এতটা বিনয় তারা ধারণ করেন।

মহাজাতকের একটা লাইন পড়েছিলাম – অন্যের হৃদয়ে প্রবেশের সহজ পথ বিনয় ও সততা।
এই দুটো ব্যাপারই আমি মুন্নারে পেয়েছি। তাই বোধয় হৃদয়ের কিছুটা অংশ সেখানে রেখে আসতে বাধ্য হয়েছি।
প্রমাণ দেই।
ঢাকায় অফিস থেকে ফেরার পথে যখন সন্ধ্যায় তীব্র জ্যামে বসে থাকি, আমি দুচোখ বন্ধ করে মুন্নারকে দেখি।
সাথে সাথে যেন টেলিপোর্ট হয়ে যাই। মুন্নারের পাহাড়দের সেই দিগন্তের কাছে বসে থাকি।
এবং ভাবি, হৃদয়ে এইটুকু সুন্দরকে ধারণ করে বারবার ফিরতে পারার ক্ষমতাটা প্রভুর নেয়ামত। এই নেয়ামতের জন্যে যথেষ্ট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি নি তাঁর কাছে…।
