
রামায়ণ বোঝার ইচ্ছে ছিল অনেকদিনের। কিন্তু সত্যি বলতে শ্লোকের অনুবাদ পড়ে পুরো কাহিনীটা বোঝা আমার পক্ষে কঠিন ও সময়সাপেক্ষ ছিল। আবার কিছু বইয়ে এত বেশি সরলভাবে উপস্থাপন করা থাকে যে গভীরতাটা যেন ঠিক ছোঁয়া যায় না। তো একদিন দক্ষিণ ভারতের এক শহরে হাঁটতে হাঁটতে ফুটপাথের এক খোলা দোকানে এই বইটা পেলাম। এবং পড়তে শুরু করলাম। অবশেষে আমি রামায়ণ কাহিনী অনেকটা ধরতে পারলাম। পুরো প্লটটা বুঝলাম। অনেককিছু পরিষ্কার হলো। লেখিকা বেশ সুন্দরভাবে গুছিয়ে এবং গভীরতাটাও ঠিক রেখে বইটা লিখেছেন। দারুণ লাগল! যে কেউ রামায়ণ বা মহাভারত পড়া শুরু করতে চাইলে এই লেখিকার বই বেছে নিতে পারেন।
তো রামায়ণের এই বইয়ে কিছু অংশ খুব মনে ধরেছে, একটু শেয়ার করি –
“It is nothing but fate that is pulling me in this uncertain, unknown direction. The only way to know what fate has in store is by flowing along and letting the events unfold. This is also why I am accepting exile. It is futile fighting destiny.”
“আসলে ভাগ্যই আমাকে এই অদ্ভুত অজানা পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ভাগ্য আমার জন্যে কী রেখেছে তা জানার একমাত্র উপায় হলো এর স্রোতে ভেসে যাওয়া এবং ঘটনা যেভাবে ঘটবার সেভাবে ঘটতে দেওয়া। এই কারণেই আমি নির্বাসন মেনে নিয়েছি। নিয়তির সঙ্গে লড়াই করা অর্থহীন।”
রামকে রাজা ঘোষণা করার আগমুহুর্তে যখন অন্যায়ভাবে বনবাসে পাঠিয়ে দেয়া হয়, তিনি কোনো প্রতিবাদ না করে নীরবে মেনে নিয়েছিলেন। কারণ ঐ মুহূর্তে তার মনে হয়, যেখানে এতসব কিছু ঠিক হয়েও সব উলটপালট হয়ে গেল, রাজমুকুট পড়ার বদলে তাকে জঙ্গলে সন্ন্যাসের জীবন বেছে নিতে হলো, তখন এ নিয়তিরই বিধান। এবং নিয়তিকে কখনো কখনো মেনে নিতে হয়। কারণ নিয়তিরও নির্দিষ্ট গন্তব্য থাকে। সেই গন্তব্যের পথে চলাটাই তখন বুদ্ধিমানের কাজ। রাম তার নিয়তির সেই গন্তব্যকে খুঁজতেই এক কাপড়ে বেরিয়ে পড়েন।
“Does that mean people should accept whatever fate they are dealt with, and not even fight a just fight?
Not at all.
Rama has categorically said that when a situation develops. suddenly -and unexpectedly, throwing all our plans out of the window, despite our best efforts and nothing we know at that time can explain the situation then such a situation could be attributed to fate.
When events happen which are beyond our control, notwithstanding our best efforts, rather than crib and complain, it is better to accept the situation and let it unfold. It might just usher a whole new phase of life. We have seen such turns of events in the lives of many great people–events that seemed devastating at that time but eventually turned out for the better.”
“তাহলে মানুষ কি শুধু তার ভাগ্য মেনে নিবে? মানুষ কি ভাগ্যের সাথে লড়বে না?
ব্যাপারটা ঠিক তা নয়।
রাম আসলে বলছেন—যখন হঠাৎ ও অপ্রত্যাশিতভাবে এমন কোনো পরিস্থিতির সূচনা হয়, যা সব পরিকল্পনাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়, যার কোনো ব্যাখ্যা বা কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না—তখন তাকে ভাগ্য হিসেবে মেনে নেয়াই শ্রেয়।
আমাদের সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঘটে যায়, তা নিয়ে অভিযোগ বা আক্ষেপ না করে তাকে মেনে নেয়াতেই মঙ্গল। এসময়ে ঘটনাকে তার স্বাভাবিক প্রবাহে ঘটতে দেয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
হয়তো এই পরিস্থিতিই জীবনে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে। বহু মহৎ মানুষের জীবনে এমন ঘটছে — যে ঘটনা আপাতদৃষ্টিতে ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক বলে মনে হয়েছিল, তা-ই শেষ পর্যন্ত আরো বড় কল্যাণের দুয়ার খুলে দিয়েছিল।”
আমরা অনেকেই বোধয় জীবনের সাথে এই সত্যকে মেলাতে পারি। অনেকসময় অনেককিছু হওয়ার থাকে। কিন্তু হয় না। হাতের কাছে এসে চলে যায়। বিজ্ঞরা বলেন, সেই চলে যাওয়াটা নিয়ে আফসোস করা বোকামি ছাড়া কিছু নয়।
এই চলে যাওয়া হতে পারে ধন-সম্পদ, কোনো স্বপ্ন বা লক্ষ্য, সঙ্গী/সঙ্গিনী, বিশেষ কোনো সুযোগ – যেকোনো কিছু।
জীবনে এই চলে যাওয়াটা হজম করত পারা এবং নতুন গন্তব্যের পথে হাঁটাটাই তো ‘সবর’।
সবরের অর্থ অবশ্য অনেকের কাছে অনেকরকম হতে পারে। আমার কাছে সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য লেগেছে মহাজাতকের সংজ্ঞা। তিনি বলেন, “সবর হচ্ছে নিজের লক্ষ্য অর্জনের জন্যে ঠাণ্ডা মাথায় নিরলস পরিশ্রম করা—যেকোনো প্রতিকূলতার মুখে, কষ্টের মুখে লক্ষ্যে অবিচল থাকা এবং সেই লক্ষ্যের জন্যে সর্বস্ব ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকা।” [বই – হাজার প্রশ্নের জবাব ২, অধ্যায় – সবর]
রামায়ণ কাহিনীতে উঠে আসা জীবনের সত্যগুলো খুব মনে ছুঁলো। রাম ছিলেন বিশেষ গুণের অধিকারী। সর্বেসর্বা। তার মানসিক শারীরিক আত্মিক বিকাশের মাত্রা ছিল অনন্য। কিন্তু তার জীবনে যেন সুযোগ, ক্ষমতা, আধিপত্য এবং সুখ বারবার আসতে নিয়েও আসে না। বারবার হাতের মুঠোয় এসেও চলে যায়।
রাম প্রতিবারই অভিযোগ না করে সবর করে গেছেন। নিয়তির গন্তব্যের পথে হেঁটেছেন।
