(২)
মানুষের হাত ধরা দেখতে আমার বড়ো ভালো লাগে। হাত ধরার ভাষা পড়তে ভালো লাগে। পৃথিবীতে আর কোনো প্রাণী কিন্তু হাত ধরতে পারে না (আর কোন প্রাণীর হাত আছে?)। মানুষ পারে। মুখের ভাষার চোখের ভাষার মতন মানুষের হাতেরও অনেক রকম ভাষা থাকে।
সেদিন সকালে আমি ধ্যানের একটা প্রোগ্রামে বসে ছিলাম। সবাই মিলে সেখানে ধ্যান চর্চা হয়। মনের ভেতর একসাথে ডুব দেয়া হয়। কত রকম কত বয়সের মানুষ যে সেখানে। আমার পাশেই একটা কিশোরী মেয়ে বসে ছিল। ওর বোধয় একটু অস্থির লাগছিল। এই বয়সে মনকে স্থির করার চর্চায় মনোনিবেশ করা বেশ কঠিন কাজ। তাই ও খুটখাট করতে থাকলেও বিরক্ত হলাম না। সহজভাবেই নিলাম। একটু পর টের পেলাম ওর নাড়াচাড়া খুটখাট বন্ধ হয়েছে, ও চুপ করে বসে আছে। কেন আছে? ওর দিকে তাকালাম। দেখি ভারী মনোযোগ দিয়ে সে প্রোগ্রামের সব কথা শুনছে। আর পাশে থেকে ওর মা ওর হাতটা ধরে আছে। মা মেয়ে দুজন দুজনের হাত ধরে ধ্যান নিয়ে আলোচনা শুনছে, একসাথে বসে ধ্যানের চর্চা করছে। এত সুন্দর লাগল। এবার আমিই ধ্যানের আলোচনা থেকে মন ঘুরিয়ে ওদের হাত ধরা দেখতে লাগলাম। সুন্দর দুটো হাত। মায়ের হাতটা নিচে, আশ্রয়ের ছায়ার। আর মেয়ের হাতটা ওপরে, আশ্রয় খুঁজতে চাওয়ার। মা আর সন্তানের হাত ধরার মতন সৌন্দর্য পৃথিবীতে কয়টা আছে? আমি সে এক রাশ সৌন্দর্যের পাশে বসে সেদিন ধ্যানে নিমগ্ন হলাম।
ভাবা যায়? কোলাহলময় এই শহরে কত শত ফুল ফোটে মানুষের মনে। মন থেকে মনে। চোখ থেকে চোখে। হাত থেকে হাতে। আঙুল থেকে আঙুলে…।
(৩)
সেদিন খুব তাড়াহুড়ো করে সকালে অফিসে যাচ্ছি, লেট হয়ে যাচ্ছে। বাসা থেকে অফিস রিক্সার দূরত্ব। পারি তো রিক্সামামাকে বলি উড়িয়ে নিয়ে যেতে। কিন্তু তিনি উড়তে পারেন না। চিরচেনা একই পথ ধরে নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে। সেই একই বেতের ফার্নিচারের দোকানের সামনে দিয়ে। দোকানের বাইরে মেইনরোডের গা ঘেঁষে বহু ফার্নিচার সাজানো। রোজ রোজ সেগুলো দেখতে দেখতে আমি ভাবি, আজকাল বেত নষ্ট হয় না কেন? কী কেমিক্যালের কোটিং করে? উত্তর পাই না, গুগল ও করা হয় না। তো সেদিন তাড়াহুড়োর মধ্যে দেখি সে ফার্নিচারের দোকানের পাশ দিয়ে ছুটছেন আমার চেয়ে বেশি তাড়াহুড়োয় দুজন মানুষ। বাবা আর মেয়ে। সে বাবার মুখে দাঁড়ি, মাথায় টুপি, পরনে জোব্বা। আর মেয়ের মাথায় হিজাব, কলেজে পড়ে সম্ভবত। আমার দেখা বেশিরভাগ বাবারাই ছেলেমেয়ে বড় হবার পর হাত সেভাবে ধরেন না। কেমন সংকোচ বোধ করেন। আর যারা আরবীয় পোশাকে অভ্যস্ত তারা তো আরও না। কিন্তু ভালো লাগল, সে বাবা আর মেয়ে দিব্যি বন্ধুর মতন হাত ধরে রাস্তায় দৌড়াচ্ছেন। সম্ভবত মেয়ের পরীক্ষা আছে, কিন্তু মেয়ের চেয়ে বাবার তাড়াহুড়োই যেন বেশি। বোঝা গেল, একটু সামনেই তাদের গন্তব্য। মেয়েটা বাবার হাত ছেড়ে জোরে একটা দৌড় দিলেই কিন্তু হতো, কিন্তু সে দিবে না। বাবার হাত সে ছাড়বে না। বাবা মেয়ে দুজন মিলে দৌড়াবে, মানে দৌড় টাইপ জোরে হাঁটা যেটাকে বলে, তাও হাত ছাড়বে না।
মানুষের হাত আসলে অদ্ভুত ব্যাপার। হাত নিজেই কিছু কথা বলে যে কথার অর্থ হয়তো আমাদের নিজেদের কাছেই বোধগম্য হয় না অনেক সময়। যেমন এই বাবা আর মেয়ে হাত ছেড়ে কেন দৌড়াচ্ছে না? হাত ধরে রাখার ফলে তো তাদের গতি ধীর হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে কেন তাদের খেয়াল নেই? কারণ মেয়েটা বাবার হাত ধরে আছে এমন শঙ্কিত মুহুর্তে আশ্রয়ের ছোঁয়া পাবার জন্যে। আর বাবাটা ধরে আছে তার মেয়েটাকে উৎসাহ দেয়ার জন্যে, হাতের স্পর্শে মমতার ছায়া দেয়ার জন্যে। দুজনের মূল লক্ষ্য দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছা হলেও তাদের হাত দুটো কত মমতা ভরসা আশ্রয় আদান প্রদান করে ফেলছে এর মাঝে।
প্রশ্নঃ মানুষ কি সবচেয়ে মমতাময় সৃষ্টি?
উত্তরঃ তাই নয় কি?
(৪)
১৫/১১/২০২৩
দোকানে বসে চা খেতে খেতে মানুষ দেখতে ভালো লাগে। আমার অফিসের কাছেই একটা সুন্দর রেস্তোরাঁ আছে, ভালো চা পাওয়া যায়। তবে এ জায়গাটার ভালো খারাপ দুটো দিক আছে। ভালোটা হলো, এখানে অনেকক্ষণ একা বসে বসে চা খাওয়া যায়। আলাদা চেয়ার টেবিল আছে, লোকজন কম থাকে। সবকিছু ঝকঝকে করে রাখা। এবং এর একটা পাশ পুরোটা স্বচ্ছ কাঁচের বিশাল জানালা। জানালার পাশে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে আমি এক মনে মানুষ দেখতে পারি।
আর খারাপ দিকটা হলো, এখানে সবকিছুর দাম প্রায় চার গুণ। ধরুন বাসার জন্যে আপনি হালিমের হাড়ি কিনবেন। দাম কত থেকে শুরু হয়? ~২০০টাকার মতন? এখানে ছোট্ট স্যুপের বাটিতে এক বাটি হালিম আপনাকে দিবে ৩০০টাকায়। আপনি বাইরে সিঙ্গারা খান ১০ টাকায়? এখানে ৪৫টাকা থেকে শুরু। অপচয় আমারও অপছন্দ। কিন্তু তবুও একা একা বসে চায়ের চুমুকে মানুষ দেখার লোভে এই দোকানে আমি চা খেতে যাই।
শীত আসবে আসবে এই নভেম্বরের দুপুরে আমি দোকানে। একাই বসে চা খাচ্ছি। আমার পাশের টেবিলে মধ্যবয়স্ক একজন লোক, স্মার্ট ফোনে চরম উৎসাহ নিয়ে দীর্ঘ এক আর্টিকেল পড়ছেন। দীর্ঘ বলছি কারণ আমি সেখানে ছিলাম প্রায় ২০ মিনিট। পুরোটা সময় তিনি স্ক্রল করে করে একই পাতা পড়তে থাকলেন। স্ক্রিন থেকে একবারও চোখ সরালেন না। তার আঙুলও নড়ল না। স্ক্রল করে ওপর নিচ করা ছাড়া। আর্টিকেলের ভেতরে একজন সুন্দর নারীর ছবি দেখা গেল। উনি সেটা নিচে টেনে কয়েকবার দেখলেন। এরপর আবার পড়তে লাগলেন। সেই আর্টিকেলে যে কী লেখা ছিল জানতে ইচ্ছা হলো, তবে জানা গেল না। এত উৎসাহ নিয়ে কেউ এই যুগে কারো ম্যাসেজও বোধয় পড়ে না।
আমি জানালায় চোখ সরিয়ে নিলাম। দুজন ব্যক্তি চোখে পড়ল। এরাও মধ্য বয়স্ক। একজন কটকটে হলুদ টি শার্ট পরা,বেশ স্বাস্থ্যবান। চেহারাটা হাসি হাসি। পাশে তার প্রাণের প্রিয় টাইপ বন্ধু বা ভ্রাতা জাতীয় কেউ হবে। তিনি টুপি পাঞ্চাবি পড়া, লম্বা দাড়ি। দুজন এত খুশি মনে দুজনের হাতটা ধরে রেখেছেন। হাত ধরে কি সুন্দর পুরোটা রাস্তায় বেশ রিল্যাক্সডভাবে হাঁটছেন। দুজনের মুখেই আনন্দের ছাপ। আমি চেয়ে রইলাম।
পুরুষদের হাত ধরে হাঁটাটা আমাদের সমাজে খুব কমন না হলেও স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এটাকে আধুনিককালে সমকামীতার মধ্যে ফেলা হয়। ছেলে মানুষ হাত ধরে হাঁটছে জড়াজড়ি করছে তার মানেই গে, এই টাইপ ধারণা। অথচ ব্যাপারটা আমাদের সমাজে মোটেই এমন ছিল না কিন্তু। যেমন আমি দেখেই বুঝতে পারি এই দুজন লোক দুজন দুজনকে অনেকদিন পর পেয়ে খুব খুশি। সেই খুশির বহিঃপ্রকাশ তারা করছেন স্পর্শের মাধ্যমে হাত ধরার মাধ্যমে। তাও কি সুন্দর করে ধরেছেন, একেবারে শক্ত করে। একজন আরেকজনকে ছাড়বেন না। অপরজন ছুটতে চাইলেও ছুটতে দিবেন না। কিন্তু আমার ভাগ্নে বা স্কুল পড়ুয়া এখন কাউকে জিজ্ঞেস করা হোক, নির্দ্বিধায় এটাকে গে-র কাতারে ফেলে দেবে।
যাই হোক, আমি এই দুজন ব্যক্তির হাত ধরে হাঁটা লক্ষ্য করতে লাগলাম। যে দেখি কতক্ষণ হাত ধরে রাখতে পারে। আসলেই পারল! পুরো রাস্তা তারা হাসি হাসি মুখে হাত ধরে হাঁটতে লাগল। দুজন মধ্য বয়স্ক লোক, কি খুশি চোখে মুখে। একটু দূরে একটা দোকানে যাওয়া আগ পর্যন্ত তারা হাত ছাড়লেন না। চায়ের কাপ ধরতে হবে বলে শেষ পর্যন্ত হাত ছাড়তে হলো।
✿
হাত ধরে (১) – লিঙ্ক
