ফটক

চারিদিক থেকে অনেক ছায়া দেখে তোরণ। ছায়াগুলো সে পেরোতে পারে না। সে অপেক্ষা করতে থাকে। অপেক্ষা করতে করতে মনে হয় হয়তো একদিন দিন ফুরিয়ে যাবে তবু অপেক্ষার পালা শেষ হবে না। আপনজনরা কেউ বোঝে না কিসের এত অপেক্ষা কিসের এত ছায়া। 

ছায়াগুলো যে সে দেখাতে পারে না। সব এত স্পষ্ট, দুইয়ে দুইয়ে চার, তবু বোঝাতে পারে না – কীভাবে ছায়াদের দেখতে হয়, কীভাবে বুঝতে হয় ছায়াদের অস্তিত্ব। 

পৃথিবীর সবাই নানানভাবে নানানকিছু চায়। তোরণ শুধু প্রশ্ন করেছিল – চাওয়াটা কি? 

প্রশ্নটা তাকে আটকে দিল। 

প্রশ্নটা তাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নানান জায়গায় নিয়ে গেল। জীবনের নানান দিক দেখাল। 

তোরণের আশেপাশের সবাই বলল, তোমার বয়স কম, জীবন এখন অতো কঠিন কিছু নয়। বয়স হোক, এরপরে টের পাবে। 

তোরণ জবাব দিল, সহজ তো আমিও চাই, কিন্তু প্রশ্নের যে উত্তর পাই না। 

কী সে আবার প্রশ্ন? আমাদের আসলে চাওয়াটা কী? 

প্রশ্নটা কেউ বুঝল না। তোরণ বুঝল। প্রশ্নের শক্তি যে এতো সে ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারে নি। একটা প্রশ্ন কি করে তার সবকিছু এলোমেলো করে দিল। তার জীবন কীভাবে অগোছালো হয়ে গেল। 

সে তো এমন ছিল না। এমন হওয়ার কথা সে তো কোনোদিন ভাবে নি। সে কলেজে যেত, ক্লাস করত, বাসায় ফিরত, বন্ধুদের আড্ডায় যেত। একই জিনিস একই কথা ঘুরেফিরে শুনত। শুনত তাকে পরিবারের এই অভাবটা পূরণ করতে হবে, শুনত তাকে আরও খাটো-লম্বা-বাকা-ত্যাড়া হতে হবে, শুনত এসবকিছুরই মানে নেই, আবার অনেক মানে আছে, শুনত যে এইসব করে যাওয়াই জীবন, দেখত যে এইসব করে যাওয়ার মধ্যেও এক এক জনের উপলব্ধি এক এক রকম, এক এক জনের বেঁচে থাকার কারণ এক এক রকম, এক এক জনের প্রশ্ন এক এক রকম – আবার কারো কারো প্রশ্ন থাকে না। 

তোরণ যেন সবার মাঝে থেকেও অনেক দূর থেকে চেয়ে চেয়ে সব দেখল।   

দেখতে দেখতেই কী করে যেন সবার থেকে দূরে সরে গেল। তার প্রশ্নটা তাকে যেন ভাসিয়ে নিয়ে গেল দূরে বহুদূরে। 

এই প্রশ্ন কি তার একার? তোরণের মনে নতুন প্রশ্নের উদয় হল। নিশ্চয়ই তার একার হতে পারে না। প্রশ্ন নিয়ে হয়তো মানুষ খেতে পারে ঘুমাতে পারে, দিব্যি গান বাজনা করতে পারে, অন্য প্রশ্নের উত্তর পরীক্ষার খাতায় লিখে আসতে পারে, অন্যের করা প্রশ্নের ঠাস ঠাস জবাব দিতে পারে। 

তাহলে নিজের করা প্রশ্নকে তারা কই রাখে? 

বহু আগে, তোরণের বয়স যখন কম ছিল, তোরণ এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজত। এখন আর খোঁজে না। এখন সে জানে, সবার প্রশ্নের শক্তি এক থাকে না। 

প্রশ্ন সবাই করতে পারে না। 

মহামতি বুদ্ধ প্রশ্ন করেছিলেন, দুঃখের কারণ কি। তার প্রশ্ন তাকে তার গন্তব্যে নিয়ে গিয়েছিল। 

তবে তোরণের দোষ কোথায়? প্রশ্ন করতে? 

আর কেউ প্রশ্ন করছে না বলে তাকেও কি প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকতে হবে? আর কেউ পারছে না বলে তারও পারা যাবে না? 

মানুষ নিজের প্রশ্ন পাক না পাক, তার প্রশ্নকে আটকে রাখতে চাইছে কেন??

তোরণের মনে পরে তার বাবার কথা। 

তার বাবার খুব বাঘ শিকারি হবার শখ ছিল। শিকারীর জীবন তার ভালো লাগত, প্রকৃতির বুকে বিচরণ তার ভালো লাগত। হয়তো তিনি খুব ভালো শিকারি হতে পারতেন। হয়তো তিনি শিকারে যাবার পথে গাছপালা লতাপাতাকে প্রশ্ন করতেন, হয়তো তিনি উত্তরগুলো জলের কুমিরের কাছে পেতেন, অথবা আকাশে ভেসে বেড়ানো শঙ্খচিলের কাছে পেতেন। হয়তো তিনি শিকারী জীবনের কাছে এমন কিছু প্রশ্ন বা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছিলেন, যা আর কিছুতে পান নি।

কিন্তু তিনি পারলেন না। তার ফরেস্টের চাকরিটা দাদাজান ছাঁটিয়ে আনলেন, রেলওয়েতে ট্রান্সফার করলেন। এরপরও বাবা মেনে নিতেন না, কিন্তু  কৃত্রিম আর্থিক সংকটের অজুহাতে মায়ার শেকলে বাবাকে বেঁধে রাখলেন দাদাজান ও দাদীজান। পরিবারের বড় ছেলে ছিলেন বাবা। তাকে বুঝতে দেয়া হল যে তার আয়েই সংসার চলছে, চলবে। তিনি কামাই রুজি না করে জঙ্গলে চলে গেলে সবাই না খেয়ে মরবে। যে দাদার সহায় সম্পত্তি সব পাওনাদারদের দিতে দিতে খোয়া গেছে। আসলে তা ছিল না। 

বাবা আটকা পড়লেন। বাঘ শিকার এর বদলে নিজের জীবনকে শিকার করতে লাগলেন তিনি। তার যেসব অপছন্দ, যা তিনি আগে কল্পনাও করতে পারতেন না – তাই-ই করতে শুরু করলেন। ৯টা ৫টা ডেস্ক জব। কী করেন তিনি নিজেও বোঝেন না। কোথাও কখনো বেড়াতে যান না, কাউকে নিয়ে যান না, এমনকি ছাদেও না। বাসায় ফিরে পত্রিকা পড়েন, টিভি দেখেন এবং এরপর ঘুমিয়ে যান। এবং এভাবে জীবনের অর্ধেক পার করছেন ও করবেন।

এটাই কি খুব স্বাভাবিক নয় যে তিনি তার ছেলের প্রশ্নগুলো ঘৃণা করবেন? 

তার খোঁজার আকাঙ্ক্ষাকে তুচ্ছ করে উড়িয়ে দেবেন? 

তার বুকে চেপে থাকা চরম আক্রোশ তিনি ঢালবেন এই ছেলের উপর – যে জীবন কি না জেনে না চিনে না বুঝে একটা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্যে সন্নাসী হবার স্পর্ধা করে? 

তোরণের বাবা সেদিন ক্রোধে আক্রোশে ফেটে পড়েছিল। ৩০বছরেরও বেশি ধরে পুষে থাকা সব ক্ষোভ একদিনে তার ভেতর থেকে বের হয়ে এসেছিল। তোরণকে বের করে দেয়া হয়েছিল ঘর থেকে। 

তোরণ অবশ্য পথে পথে ঘুরে নি। ফ্রীল্যান্সিং আর টিউশনি করে সে কিছু টাকা জমিয়েছিল। জমানো টাকা দিয়ে ঠিক করল একটা ভিন্ন শহরে যেয়ে থাকবে। সে বাসে উঠে পড়ল। বাস তাকে অচেনা এক শহরে এনে নামালো। ঘন্টাখানিক খানিক ঘুরেফিরে সাধ্যের মধ্যে একটা ব্যাচেলর রুম ভাড়া নিয়ে নিল। বাজার থেকে কিনে আনল একটা মাদুর, একটা সিলিং ফ্যান, একটা কেয়া সাবান আর একটা দেশলাই । 

এরপর ফাঁকা রুমে মাদুর পেতে বসে জানালা দিয়ে চেয়ে ফকফকে আকাশ দেখতে দেখতে দেখল – তার মনের মধ্যে কোনো জমাটবাধা দুঃখ নেই, রাগ নেই, অভিমান নেই। তার বাবার অনেকদিনের পোষা দুঃখকে সে একসাথে দেখেছে। দেখেছে এবং ভেবেছে – বাবার মতো সে হতে চায় না। তার বাবাও চান না সে তার মতো হন, কিন্তু কীভাবে এটা চাইতে হয় না সেটা তিনি জানেন না। 

তোরণ ঠিক করে শীঘ্রই বাসায় একটা চিঠি পাঠাবে, এই বলে যে সে খুব ভালো আছে। সাথে এও যোগ করে যে সে কিছুদিন নিরুদ্দেশ থাকবে। পৃথিবীতে সে একা একা এসেছে, যাওয়ার সময়ও একা যেতে হবে। তাহলে কিছুদিন একা থাকতে দোষ কোথায়? 

 তার পরিবার প্রথমে এটা সহজভাবে মানতে পারবে না। তাকে খুঁজবে। থানায় থানায় কল চলে যাবে। তবে স্বেচ্ছায় সে এসেছে। এখানে তাকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে পুলিশের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। তার পরিবার কিছু টাকা ঢালবে, এবং সে টাকাগুলো তারা গ্রহণ করতে পারবে বড়জোর। কদিন পরই তার পরিবার তাকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে পড়বে। মানুষ যখন অনিশ্চয়তার পেছনে ছুটে, তখন ক্লান্তি সহজে ঝেঁকে ধরে । 

কিছু পয়সা অপচয় কিছু ক্লান্তি – তাও ভালো।  কিন্তু তার প্রশ্নগুলোর সাথে বসবাস করা, চোখের সামনে দেখা কি করে কিছু প্রশ্ন তোরণের জীবনটাকে উল্টে পালটে দিচ্ছে, কি করে কোনো লোভের বশে নয় কামনার বশে নয় – স্রেফ জীবনকে খুঁজতে তোরণ সবকিছু ছেড়ে অচেনার পথে হাঁটছে – এটা তাদের কাছে হবে তিলে তিলে যন্ত্রণা পাওয়ার মতো। কারণ তারা অনেক কিছুর হিসাব মিলাতে চাইবে। কিন্তু পারবে না।  

তোরণ তার নতুন শহরে থাকা শেখে। ছিমছাম শহরে জীবনটাকে গুছিয়ে নেয়া সহজতর মনে হয়। ফ্রীল্যান্সিং-এর কাজ চলতে থাকে। হঠাৎ পরিবর্তন তাকে প্রশ্নের যন্ত্রণা কিছুদিনের জন্যে ভুলিয়ে রাখলেও খুব দ্রুতই সে একঘেয়ে জীবনের কাছে আবার ফিরে যায় – ঘুম থেকে উঠা, খাওয়া দাওয়া, বই পড়া, ল্যাপটপে কাজ করা, কজন পরিচিতদের সাথে কথাবার্তা বলা – আবহাওয়া কেমন, খবরের হেডলাইন কি, ঢাকায় কি হচ্ছে, দেশের কি হবে ইত্যাদি ইত্যাদি,  এবং এরপর নিঃশব্দতা। সে নিঃশব্দতার মাঝে তার প্রশ্নগুলো মাকড়সার জালে ধরা পড়া মাছির মতো নিরুপায় হয়ে ঝুলে থাকে। তোরণ চেয়ে চেয়ে দেখে। 

তোরণ বইয়ে পড়েছে, যখন শিষ্য তৈরি হয়, গুরু নিজে এসে তখন ধরা দেন তার কাছে। 

তার মানে এমন কেউ পৃথিবীতে আছে যে তোরণকে তার উত্তরগুলো পেতে সাহায্য করতে পারে? 

এমন কেউ আছে যিনি তার নিজের প্রশ্নের উত্তরগুলো শেষ পর্যন্ত খুঁজে পেয়েছে?

তোরণ অপেক্ষা করে। 

মনের ভেতরে দিন রাত জেগে জেগে সে অপেক্ষা করে। 

অপেক্ষা করে কিছু প্রশ্নের উত্তরের জন্যে। সে আসলে কী চায়, মানুষ কী চায়, জীবনে চাওয়াটা কী? 

এই প্রশ্নের উত্তর পাবার জন্যে কেউ নিশ্চয়ই তার জীবন থামিয়ে দিয়ে বসে থাকবে না। 

পরীক্ষার খাতা নাহয় ডায়রির পাতায় হয়তো তাদের প্রশ্ন স্থান পাবে। কিন্তু জীবনের প্রশ্ন কি জীবনেই স্থান পাবার কথা নয়? জীবন থেকেই তার উত্তর আসার কথা নয়? 

এটা কি খুব জটিল কিছু? 

তোরণ ভেবে কূল পায় না। 

তোরণ তাই জীবন নিয়ে অপেক্ষা করে। এই জীবন থেকেই তার উত্তর আসবে, যে জীবন থাকে পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে, তাকে দেখা শিখিয়েছে, শোনা শিখিয়েছে, মায়ের স্তন থেকে দুধপান শিখিয়েছে। 

অবশ্যই এই জীবন থেকে সে দাবী করতে পারে যে বেঁচে থাকা কি এর উত্তর তাকে জানাতে হবে। 

জীবন কেন, তাকে জানাতে হবে। 

চাওয়া কী এবং কেন তাকে জানাতে হবে। 

এবং তা জানার জন্যে তোরণ আমৃত্যু অপেক্ষা করবে। যেমন করে জীবন মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করে। সব শুরু শেষ দেখার অপেক্ষা করে। 

একা থাকার সুবিধা হল কেউ তার অপেক্ষায় ব্যাঘাত ঘটায় না। সে কাউকে কিছু বলে না, কেউ খোঁচাতে আসে না। সে সবার সাথে মিশে যেতে পারে, জনসমুদ্রে মিশে যেতে পারে। এবং মনের কোণে বসে মন প্রাণ দিয়ে অপেক্ষা করে। 

অপেক্ষা করতে করতে মাঝে মাঝে মনে হয় সে যেন একটা অন্ধুকূপের ভেতর পড়ে গেছে। নিজেকে উদ্ধার করতে পারছে না। কিন্তু এখানে থেকে সে মুক্ত হবার আশা রাখে কারণ এই কূপের মুখটা খোলা। 

এতদিন সে যে জীবনে ছিল, সেখানে কূপের মুখ বন্ধ ছিল। অথবা সেটা ঠিক কূপ ছিল না। সে মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল। মৃতের মতন। সবাই যেদিকে দেখাচ্ছিল, সে যাচ্ছিল। শুধু তার জীবনটা থেমে ছিল। জীবন কোনোদিকে যাচ্ছিল না, কারণ তা ছিল মাটিচাপা। 

এখন সে নিজেকে একটা কূপের ভেতর নিয়ে এসেছে। কেউ জানে না সে কূপের ভেতরে একা একা বসে আছে দীর্ঘকাল ধরে।

 সে এখন কী করবে? কী করতে পারে সে? চিৎকার করবে? হতাশ হবে? 

নাকি আশাবাদী হবে? 

কেনই বা হবে যখন দুটোরই সম্ভাবনা ফিফটি ফিফটি। 

কেউ তার উদ্ধারে আসতে পারে, নাও আসতে পারে। তার প্রশ্নের উত্তর সে পেতে পারে, নাও পেতে পারে। স্রষ্টা হস্তক্ষেপ করতে পারে – আবার হয়তো নাও করতে পারে? 

সে কীভাবে জানবে যা সে জানে না? 

কীভাবে সে অপেক্ষা করবে যে অপেক্ষার অর্থ সে নিজেও ঠিক বোঝে না? 

মানুষ কত অপেক্ষা করে, কতরকম অপেক্ষা করে। মানুষ মানুষের জন্যে অপেক্ষা করে, প্রাচুর্যের জন্যে অপেক্ষা করে, বস্তুর জন্যে অপেক্ষা করে – তোরণ প্রশ্নের উত্তরের জন্যে অপেক্ষা করে। 

সব অপেক্ষাই কি এক নয়? সব অপেক্ষাই কি মানুষকে সেই অন্ধকূপে নিক্ষেপ করে না? যেখানে সবকিছু ফিফটি ফিফটি চান্সে এসে আটকে যায় – কিছু হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। 

মানুষ তখন কী করে? কী করা তখন মানুষের প্রয়োজন? 

তোরণ মানবজাতির অতীতের দিকে তাকায়। তার কেন যেন ইউসুফের কথা মনে পড়ে। 

ইউসুফ তখনও নবী হন নি। একদিন তার ভাইয়েরা তাকে জনমানবশূন্য এক এলাকায় অন্ধকার কুয়োয় নিক্ষেপ করে চলে যায়। 

সে কুয়ো ছিল পরিত্যাক্ত। আশেপাশে কোনো জনবসতি ছিল না যে চিৎকার করলে শুনবে। 

ইউসুফ সে কুয়োয় বসে রইলেন উদ্ধার হবার আশায়। কেন আশা নিয়ে বসে রইলেন? কেন নিরাশা নিয়ে নয়?

দুটোই সম্ভব ছিল। তিনি আশাকে বেছে নিলেন।  

স্রষ্টাকে ডাকলেন। স্রষ্টা তাকে সরাসরি বললেন না যে কীভাবে তিনি মুক্তি পাবেন, যে কিছু আগন্তুক পথ ভুলে তার কুয়োর খোঁজ পাবেন এবং তাকে কুয়ো থেকে তুলবেন। স্রষ্টা ইউসুফকে কিছু সময় সেখানে রাখলেন। ইউসুফ আশাকেই বেছে নিলেন। দৃঢ় প্রত্যয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন – যে মুক্তি আসবেই। 

তোরণের মনে হল – মানুষ জীবনে বহুবার এই কুয়োর মধ্যে পড়ে। তার চারপাশে শুধু দেয়াল থাকে, কোনো পথ থাকে না। মুক্তি কোথা থেকে  মিলবে সে সন্ধান তার জানা থাকে না। দেখে মনে হয়, এ থেকে বেরোনো অসম্ভব। অসম্ভবের চেয়েও অসম্ভব।  

তখন দুটো কাজ করার যায়। অসম্ভবতায় বিশ্বাস করে সব তছনছ করে ফেলা যায়। তবে জীবনও তো অসম্ভব। এই জীবন কি পাওয়ার কথা ছিল? এই পৃথিবীতে আসার কথা ছিল? প্রতিটি মুহূর্ত কি অসম্ভব নয়? 

অথবা অসম্ভব যে সম্ভব – একে মনে করা যায়। সবকিছুই যে সম্ভব – তা স্মরণ করা যায়। 

আচ্ছা যদি ইউসুফ সেদিন মুক্তি না পেতেন? যদি তিনি সেদিন মারা যেতেন – ?

তবে সেদিন তার মৃত্যুও সুন্দর হতো – অপেক্ষা করতে করতে মৃত্যু, এক বুক আশা নিয়ে মৃত্যু, দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে মৃত্যু। 

তোরণ ঠিক করে, সে প্রশ্নের উত্তর পাবে এই আশা নিয়েই সে অপেক্ষা করবে, নিরাশা নিয়ে নয়। সে চোখ বন্ধ করে ইউসুফকে স্মরণ করে। তার কুয়োতে নিজেকে দেখতে পায়। ইউসুফকে দেখতে পায়। তার মনে হয় সেই মানুষটা তাকে আজ অপেক্ষার নিয়ম শেখাতে সেদিন সে কূপে আটকা পড়েছিলেন। তাই তারা নবী। মানুষের যন্ত্রণাগুলোর পথ দিয়ে  তারা আগে হেঁটে গেছেন, বাকিদের হাঁটা শেখাতে। 

তোরণের মনে শিহরণ জাগে, তার জীবনে আগে কেউ যেন এসেছিল, আগে কেউ যেন এখানে বসে অপেক্ষা করে গেছে। সে এখানে একা নয়। সে একা আসে নি পৃথিবীতে। সকল মানুষের সাথে এসেছে। সকল মানুষের মতোই সে মিলিয়ে যাবে। তবে সে উত্তর পাবে। কারণ কিছু মানুষ তার মতো খুঁজেছিল, এবং তারা উত্তরগুলো পেয়েছিল। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *