সেদিন হোম অফিস করছিলাম। কাজের চাপ বেশি থাকলে সাধারণত বাসাতেই ডুবে যাই সারাদিনের জন্যে। সেদিনও এমন ছিল। আমার রুমে আমি বুদ হয়ে আছি ল্যাপটপে। তুলতুল (আমার বিড়াল) বিরক্ত হয়ে আমার ল্যাপটপকে গালি দিতে দিতে বারান্দায় খেলতে চলে গেল।
তখন বিকেল বেলা। আমি ক্রমাগত কাজ করে যাচ্ছি, রাত নামার আগেই শেষ করতে চাইছি। এটা আমার একটা দোষ। কাজ হাতে থাকলে শেষ না হওয়া পর্যন্ত শান্তি পাই না। ছুটে যাওয়া ট্রেনের পেছনে যেভাবে নায়িকারা দৌড়ায়, আমি কাজ নিয়ে সেভাবে দৌড়াই।
তো আমি ছুটছি। হঠাৎ দেখি স্ক্রিনের কোণায় weather update এলো – আজকের সূর্যাস্তটা সুন্দর!
এ কেমন weather update! সূর্যাস্ত সুন্দর মানে কি!!
এখন তো ছাদে গিয়ে সূর্যাস্ত উপভোগ করা সম্ভব না। আমাকে ছুটতে হবে। ১ মিনিটও এদিক সেদিক তাকানো যাবে না। কাজটা শেষ করে আমি নতুন একটা উপন্যাস ধরব সেই প্রতীক্ষায় আছি। আর আমাকে বলে সূর্যাস্ত সুন্দর! আজকেই কেন!
সাথে সাথে গুগল করলাম – আজকে সূর্যাস্ত কেন সুন্দর? কী হচ্ছে আজকে সূর্যের ভেতরে?
কিছুই পেলাম না। কোনো তথ্য নেই।
কিন্তু আমার মন নিশপিশ করতে লাগল, আজকে সূর্যাস্ত সুন্দর।
আমি সূর্যাস্ত দেখি না কতদিন? মনে নেই। মাঝে মাঝে অফিস থেকে ফেরার পথে গোধূলির আকাশ দেখি, মেঘদের দেখি। কিন্তু আয়োজন করে দেখা হয় না কতদিন।
অবশেষে আমি গেলাম, হাতে ১৫ মিনিট সময় নিয়ে। রিনাকে সাথে নিলাম (ওর বয়স ১৩, আমাদের সাথে থাকে)
আমাদের ছাদটা আশেপাশের ছাদ থেকে বেশ উঁচু। এজন্যে মনে হয় যেন পুরো শহরটাকে দেখা যায়। ছাদে উঠে দেখি একটা স্পষ্ট কমলা গোলাকার বল হয়ে সূর্যটা যেন সরাসরি তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। আকাশ এত পরিষ্কার। কোনো মেঘ নেই, কুয়াশা নেই কিছুই নেই। স্পষ্ট একটা সূর্য আর দিগন্তজুড়ে নীল।
ওদিকে রিনা কথা বলেই যাচ্ছে – আফু! কমলার লাহাইন সূর্য! আফু! দেখো এই টবে কি ফুল! দেখো এই পাতাডা! দেখো এইখানে মাছ! ইত্যাদি ইত্যাদি।
রিনার উৎসাহে বাধা দিতে আমার কষ্ট লাগে। বেচারি এত উচ্ছ্বাসিত হয়ে বলে, চুপ করতে বলতে পারি না। তবু না বলে পারলাম না।
বললাম, রিনা, সূর্যটা ডুবুক, এরপর কথা বলি। এটা আগে দেখো।
বলল, কী দেখমু! প্রতিদিনই তো এমনে ডুবে।
আমি বললাম, তাও। এখন আমরা চুপ থাকবো।
ও চুপ হলো। ওকে দেখে মনে হলো যেন নিঃশ্বাস নেয়া বন্ধ করতে বললাম। তাই সে অনেক কষ্টে নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি সূর্যাস্তের দিকে মনোযোগ ফিরিয়ে নিলাম। দাঁড়িয়ে রইলাম নীরবে। কেমন শূন্য হয়ে। মনে হলো যেন দিগন্তের অনেক কাছাকাছি চলে গেলাম। এর প্রয়োজন আমার ছিল। ব্যস্ততার চাপে বুঝতে পারি নি।
কিছু অনুভূতিকে আঁকার আকৃতি দেয়া যায় না। কিছু ব্যাপার নিয়ে ভেবেছি অনুভব করেছি, যা শুধু এই জীবন নিয়ে নয়, আরও অন্য কিছু নিয়ে। ব্যাখ্যা করে বলতে চাইলেও তা সম্ভব নয়।
কিন্তু খেয়াল করলাম, সবকিছুর মাঝে থেকেও কীভাবে না থাকা যায়। এই যে ছুটছি, কতশত চিন্তা করছি, ভাবছি, হাসছি, কাঁদছি, কতকিছুই আসছে যাচ্ছে এই জীবনে – এই সবকিছুই দৈনন্দিন ব্যাপার। কিন্তু এর বাইরে এত কাছে এত বিশাল আকাশটা যে চেয়ে থাকে সারাক্ষণ, এত কাছে সূর্যটা আয়োজন করে প্রতিদিন ডোবে, আমি দেখবার সময় করি না। এখন শীত নামছে, সকালের ঘাসে শিশির ফোঁটা শুরু হচ্ছে। আমি দেখি না। শহুরে জীবনে এসব দেখার সুযোগ কম – কিন্তু যতটা দেখা যায় সে সুযোগটাও বের করি না।
অথচ একটা আস্ত জীবন চলে যায়। অনেক কিছুই জীবনে যোগ হয় বিয়োগ হয়, কিন্তু এই সময়গুলোতে যেন কিছু নীরবতা থাকে, সে নীরবতায় আমাদের সত্ত্বার আরেক রূপ প্রকাশ পায়, আমাদের মন আরও বড় একটা পৃথিবীর ইশারা পায়। আমরা তাকে বন্দী রেখে দেই চার দেয়ালের নিয়মে।
আমি প্রকৃতি প্রেমিক। শহর থেকে বেরোলে তা জল হোক স্থল হোক, আমার ছোটাছুটি থামানো মুশকিল। কিন্তু শহরে থাকি বলে প্রকৃতি থেকে দূরে থাকতে হবে এমন কোনো কথা নয়। ঠিক করলাম। এখন থেকে নিয়মিত সূর্যাস্ত দেখব। সূর্যদয় দেখতে উঠার মতন নিয়মানুবর্তী মানুষ এখনো হই নি। তবে সূর্যের ডুবটাই নাহয় দেখলাম।
পরদিন অফিসে এসে পাশের ডেস্কের আপুকে বললাম, আপু, এখন থেকে আমরা নিয়মিত অফিসের ছাদে ওঠে সূর্যাস্ত দেখব।
উনাকে দেখে মনে হলো উনাকে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার কথা বললাম।
কিন্তু আমি ডিটারমাইনড। যেহেতু বলেছি এই কাজটা আমি করব। সময় বের করে সূর্যাস্ত দেখব। এবং এই ভুক্তভোগী হবেন আমার আশেপাশের মানুষেরা। তারা মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও আমার সাথে শহরের ছাদ্গুলিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখবেন।
