মহসিন মনে করতে চেষ্টা করে, মনে করতে পারে না, শেষ কবে ভয়ানক দুঃখ পেয়েছিল?
সেতো অনেকদিন আগে, সব দুঃখ ভুলে গিয়ে সে নতুন করে সব শুরু করেছিল। আস্তে আস্তে একটু একটু করে জীবনটা গোছানো শুরু হয়েছিল। তার ঘর জুড়ে দুটো ফুটফুটে শিশু ফুলের মতন ফুটেছিল। তারা তার হৃদয়টা এমনভাবে জয় করে ফেলেছিল, এভাবেও যে জয় করা যায়, কে জানতো? কতকিছু দেয়ার সামর্থ্য যে আছে তার, কতটা আনন্দ, কতটা ভালোবাসা, কতটা মমতা – মহসিনের নিজেরও জানা ছিল না।
সে পিতা হয়েছিল। পিতৃত্ববোধের অনুভূতি তার শিরায় শিরায় কি এক অদ্ভুত শিরহরণের প্লাবন বইয়ে দিয়েছিল। তার অস্তিত্বটাকে একদম উলটপালট করে দিয়েছিল সেই ঝড়ো আনন্দ!
মহসিনের জীবনের অনেক বড় বড় দুঃখ বড় বড় কষ্ট ছোট হয়ে গিয়েছিল এই ছোট্ট দুটো প্রাণের আগমনে।
রোজ ঘুম ভাঙত তাদের নিয়ে, বাচ্চারা কখন উঠবে? দুপুর হতো তাদের নিয়ে, কখন স্কুল থেকে ফিরবে? বিকেল হতো তাদের নিয়ে, ওরা কি খেলতে গেছে? কোনদিনে গেছে? সন্ধ্যা নামত তাদের নিয়ে, বাসায় ফেরার পথে ওদের জন্যে কী নিয়ে যাবে? চিপস? ঝালমুড়ি? না বেলুন? রাত হতো তাদের নিয়ে, ওরা ঘুমাবে কখন? বাবাকে জড়িয়ে? বাবার মুখে গল্প শুনতে শুনতে? আজ কোন গল্পটা বলবে?
মানুষ এক নিমেষে সুখী হতে পারে না। সুখী হওয়ার শক্তি সবার মধ্যে থাকে না। কিন্তু মহসিন কীভাবে যেন খুব সুখী হয়ে গেল হুট করে। তার ঘর জুড়ে স্নেহ মায়া মমতা ভালোবাসা যত্ন সব চলে এলো একে একে, যেভাবে শীতের অতিথি পাখিরা হুট করে এসে ঘেরাও করে বসে গ্রামের আনাচে কানাচে সব খালে-বিল। এমন সুন্দর পাখিদের কি বেমানান লাগে, জীর্ণ বিলের ধারে। তবু তো পাখিরা এসে বসে। অনেরকম কষ্টের মধ্যেও মহসিনের জীবনে স্বর্গীয় সুখ নেমেছে। প্রিয়তমা স্ত্রী ও আদরের দুই সন্তানকে নিয়ে যেন পৃথিবীর বুকে স্বর্গের সুখ চাষ করতে লাগল মহসিন।
পৃথিবীটা ঘুরে যাচ্ছিল তার যথাযথ নিয়মে। সেই নিয়মের কি করে ছন্দপতন হলো? এমন কি হবার কথা ছিল? কোত্থেকে কোন দুর্যোগ নামল, মহামারী আসল। কেউ বলে, এটা নাকি কৃত্রিম মহামারি। অভাবটা কি করে এইভাবে ধেয়ে এলো তার সংসারের দিকে? মহসিনের মনে হতে লাগল, হয়তো এ সাময়িক অভাব। হয়তো সব চুকে যাবে, দুদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে। মহসিন দেখেও না দেখার ভান করতে লাগল। অভাবটাকে কমাতে ঋণ নিতে লাগল। ঋণের সাথে সুদের অংকটাকে হিসেব না করার ভান করে থাকল।
দুটো বছর সময়কে অনন্তকাল মনে হলো মহসিনের। সময় যেন আর গড়াতে চায় না। মহামারী আসে তো আসে না, কিন্তু অভাব ধেয়ে আসে এমন করে…কেন?
মহসিনের মনে এমন এমন সব প্রশ্ন আসতে শুরু করল যা আগে কোনোদিন আসে নি। সমাজ নিয়ে, মানুষ নিয়ে, পৃথিবী নিয়ে।
আচ্ছা, মহামারী তো একটা দুর্যোগ, দুর্যোগ তো সবার জন্যেই হওয়ার কথা। যেমন বন্যা একটা দুর্যোগ। বন্যা হলে সবার ঘরে পানি উঠে, সবাই পানিতে আটকা পড়ে। তাহলে এ কেমন মহামারী যেখানে তার ঘরে শুধু ঋণ বাড়ছে আর অনেকের ঘরে সম্পদের মজুদ হচ্ছে? এ কেমন মহামারী যেখানে রোগে মরবার আগেই মানুষ অভাবে মরে যায়? এ কেমন মহামারী যেখানে তার টেইলার্সটা বন্ধ হয়ে আয় থেমে আছে, কোনো খরিদ্দার আসে না, অথচ বড় বড় ব্যবসায়ীদের মালবাহী অজস্র রঙচটে গাড়ি পণ্যের সমাহার নিয়ে ঘুরে বেড়ায় এদিক ওদিক? তাদের ডেলিভারি ম্যানরা ডেলিভারি দেয় বাক্স ভরে, আকাশচুম্বী এপার্টমেন্টগুলোর গ্যারেজে গ্যারেজে।
এ কেমন মহামারি? মহামারি কি শুধু তার জন্যেই লেখা থাকে? তার মতন গুটি কয়েক অভাগার জন্যে? বা শুধু কি কয়েকজন? শত শত মানুষ রাস্তায় কাতরাচ্ছে। ঘরের ভেতরে কাতরাচ্ছে কত হাজার কে জানে।
কেউ কি শোনে না? কেউ কি দেখে না? কেউ কি একটু এগিয়ে আসে না?
পথে পথে এখনো কত আকাশচুম্বী দালানের কন্সট্রাকশন কাজ চলছে। শপিং কমপ্লেক্সগুলোতে কেনাকাটার ধুম পড়ে আছে। ২০টাকার কফি ৫০০টাকায় বিক্রি হয়, সেখানে বেচাকেনা থামে না। রুটি মাংসের দলা (পিৎজা) হাজার হাজার টাকায় কিনে খাচ্ছে এত মানুষেরা, পথে পথে শুধু পিৎজা ডেলিভারি ম্যান।
এরা সবাই কারা? এরা কি একটু এগিয়ে এসে একটু সহায়তার হাতটা বাড়িয়ে দিতে পারে না? এটা তো দুর্যোগের সময়। সে তো হাতে করে এই মহামারিকে টেনে আনে নি। সে তো কাউকে বলে নি, আমি ঋণ নিতে চাই, আমাকে ঋণ দাও। আমি কাজ করব না, খাটব না। তার তরফ থেকে তো কোনো কমতি ছিল না।
মহামারিটা তো এসে গেছে। একটু সহায়তা কি মানুষ মানুষের কাছ থেকে পেতে পারে না? এমন কঠিন সময়ে??
রোগ-শোকের দুর্যোগ না হয়ে এটা বন্যার মতো হলে সে কি একটা নৌকা নিয়ে বেড়িয়ে পড়ত না? মানুষকে উদ্ধারে? সে কি ধনী গরিব বাছ বিচার করতো? ঠিকই সবাইকে তার নৌকায় তুলে পারাপার করে দিত। নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পৌঁছে দিত।
তবে এই দুর্যোগের সময়ে তাদের উদ্ধারে কেউ আসছে না কেন??
মহসিন দুটো বছর কাটায় নিজেকে ভুলিয়ে ভুলিয়ে। সকালে মনে হয় দুপুর আগে আসুক, দুপুরে মনে হয় রাতটা নামুক। রাতে মনে হয় পরদিন ভোরে দেখা যাবে। ইচ্ছা করে যে কতটা ভুলে থাকা যায়, চোখ কান মুখ বেঁধে রাখা যায়, নিঃশব্দে নীরবে, মহসিনের জানা ছিল না।
এরপর হঠাৎ একদিন মহসিনের বাচ্চারা মন খারাপ করে স্কুল থেকে ফিরল, তাদেরকে নাকি পরদিন থেকে স্কুলে যেতে নিষেধ করা হয়েছে কারণ বেতন দেয়া বাকি রয়ে গেছে অনেকদিনের।
মহসিন তার সন্তানদের চোখের দিকে তাকাতে পারলো না। সেখানে কি ছিল? অপমান? ব্যর্থতা? লজ্জা? ঘৃণা? নাকি বাবার প্রতি করুণা?
মহসিন আর পারলো না। মহসিনের কোনো হিসেবই আর মিলল না। মহসিন তার সন্তানদের চোখের দিকে আর তাকাবে কীভাবে? তার সন্তানদের চোখ কীভাবে ভুলে থাকবে? কতদিন ভুলে থাকবে?
মহসিন চলে গেল। নাম না জানা আরও শত মহসিনের মতো…।


মহসিনের গল্পটা সত্যিকারের, যদিও গল্পের রঙটা আমি যোগ করেছি কল্পনা থেকে। মহসিনের জীবনটা আরও কঠিন ছিল, নির্মম ছিল। তার খবর পত্রিকায় ছাপা হয়েছে – সন্তানের স্কুলের বেতন দিতে না পেরে বাবার মৃত্যু ।
আপনি আমি আমরা যারা মহসিনের চেয়ে ভালো আছি, অনেক অনেক ভালো আছি, আমরা যেন মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে না ভুলি। যার যেটুকু সামর্থ্য, মাসে একবার হলেও দান করার চেষ্টা করি, বিশেষ করে কোনো ফাউন্ডেশনে বা প্রকল্পে যেখানে অনেকের দান একসাথে মিলিয়ে গঠনমূলক কাজ করা হয়। এবং দেয়ার আগে নিশ্চিত করে নিবেন যে আসলেই দানের অর্থ মানুষের অভাব মোচনে সঠিকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে কিনা।
কারণ হুট হাট করে যাকে তাকে দান করা, বা ভিক্ষুক ব্যবসায়ীদের করুণা করে ৫/১০টাকা দেয়া বা ফেসবুকে ইমোশনাল কন্টেন্ট দেখে ৫০০টাকা বিকাশ/নগদ/রকেট করলে তা কিছু মানুষের সাময়িক কিছু উপকারে আসলেও সামগ্রিকভাবে কোনো কাজে আসছে না।
আমি ব্যক্তিগতভাবে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের (donate.quantummethod.org.bd) মাধ্যমে করি, তাদের কাজগুলো আমার নিজ চোখে দেখা এবং ভেরিফাই করা। আপনারা যে যেই সংস্থার উপর ভরসা করতে পারেন, তাদের ফান্ডেই করুন। কিন্তু ভেরিফাই করে এরপর করুন। এবং করুন। কারণ আপনি একা তেমন কিছু করতে পারবেন না, কিন্তু কয়েকজন একসাথে নিয়মিত দান জমালে অনেক কিছু করা সম্ভব। শতজন/হাজারজন মিলে না করলে সত্যিকারের সাহায্য করা আসলে সম্ভব না। আপনার দেয়া ১০০টাকা দিয়ে কিছুই হয়তো হবে না, কিন্তু ১০০০মানুষের দান করা ১০০টাকা মিলে ১০০,০০০ টাকা দিয়ে বহু মহসিনকে বাঁচানো যাবে…।
