মানুষের ভেতর মানুষের মৃত্যু

শাহিন ও তুলির সম্পর্কটা স্বামী-স্ত্রীর, প্রেমিক-প্রেমিকার এবং বন্ধুর। ভিন্ন দুজন মানুষের কাছে স্বাভাবিকভাবেই জীবনটা দুরকম। এই দুজন দুজনের চোখে জীবনটাকে জানতে চায়, দেখতে চায়, বুঝতে চায়। এই নিয়ে তাদের গল্প। ভালবাসার হাত ধরে জীবনকে খোঁজার গল্প…

“শাহিন, তোমার মৃত্যুকে ভয় হয়?”
“জানি না তুলি, আসলে কোনটাকে ভয় হয়, জীবনকে নাকি মৃত্যুকে”
“আমরা কেমন ভয়ের মধ্যে বেঁচে থাকি, তাই না? যা আছে তাই ভয়, যা নেই তাও ভয়, যা হতে পারে বা পারে না, সবকিছু নিয়ে শুধু ভয় আর ভয়”
“তোমার ভয় হয় মৃত্যুকে?” 
“সত্যি বলতে, মৃত্যুকে যেন আমিও বুঝতে পারছি না এখনো। তবে হ্যাঁ, মানুষের ভেতরে মানুষের মৃত্যু আমাকে ভাবায়”
“মানুষের ভেতর মৃত্যু মানে?”
“মানে, মানুষ মানুষের ভেতর বেঁচে থাকতে পারে, আবার মানুষ মানুষের ভেতর মরে যেতে পারে”
 “বিচ্ছেদের কথা বলছ?”
“না, শুধু বিচ্ছেদ নয়, যে-কোনো ভাবেই এটা হতে পারে তো। কাছে থেকেও মৃত্যু হতে পারে, আবার দূরে যেয়েও মৃত্যু হতে পারে”
“হুম?”
“আবার উল্টোটাও হতে পারে। দূরে থেকেও বেঁচে থাকা যেতে পারে, বাস্তব মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকা যেতে, মানুষের ভেতরে…”
“তুলি, তুমি কিন্তু ছুটে যাচ্ছ, আমি ধরতে পারছি না”
“ওহ স্যরি, বলতে বলতে হারিয়ে যাই কেমন, হেহে”
“হেহে না, কাছে আসো। এত ঠান্ডা লাগছে।”
 “লাইট নিভিয়ে দিব?”
“দাও”
“তাহলে পর্দা সরিয়ে দেই?”
“এই মধ্যরাতে পর্দা সরাবে কেন?!”
“রাতের কুয়াশা দেখবো…”
“ওটা দেখতেও তো শীত লাগে! আচ্ছা বাবা, কর, যা মন চায় কর, করে এদিক আয়”
“আসলাম!”
 “(দীর্ঘশ্বাস ফেলে) অন্ধকারের কুয়াশা! চোখের ভেতরও শৈত্য প্রবাহ!”
“হিহি”
“কি খুশি!”
“আমরা না মৃত্যুর কথা বলছিলাম?”
 “ওহ হ্যাঁ, মৃত্যু, মানুষের ভেতর মৃত্যু”
“হু, তো জীবিত থেকেও মৃত্যু হয়, আবার মৃত্যুর পরও মৃত্যু হয়”  
“কীভাবে হয়, তুলি?”
“যখন আমরা ভুলতে শুরু করি, তখন। কাউকে ভুলে যাওয়া মানেই তোমার জগতে তার মৃত্যু হওয়া”
“কাছে থেকেও সেটা সম্ভব?”
“কাছে থেকেই তো বেশি হয়, শাহিন। ঐ মৃত্যুটা আরও করুণ। যেমন, ধরো একটা ঘর। ঘরে স্বামী স্ত্রী ও দুই সন্তান, একটা ছেলে একটা মেয়ে। তাদের চারজনের চারটা রুম। চারটা রুমে চারটা জগত। তারা বুদ হয়ে আছে তাদের জগতে। ঘরে যতক্ষণ থাকছে, একে অপরকে ভুলে থাকছে। কেউ কাউকে দেখছে না, কথা বলছে না, মনোযোগ দিচ্ছে না। যদি ১২ ঘন্টা ঘরে থাকে তো ১১ ঘন্টা তারা ব্যয় করে নিজের মধ্যে। বাকি এক ঘন্টা, যা না বললেই নয়, সেটুকু রোবটের মতন বলে যাওয়া। এভাবে কাছে থেকেও পাশের মানুষগুলো তাদের কাছে মৃত হয়ে যায়।” 
“তার মানে, ভুলে থাকাকেই মৃত্যু বলছ?”
 “হ্যাঁ, শাহিন। মানুষ একসাথে খুব বেশি কিছু ধারণ করতে পারে না। সে যা মনে করে, মনের কাছে রাখে, মনোযোগ দেয়, সেটাই তার কাছে জীবিত থাকে। আর বাকি সব মরে যায়।”
 “হতে পারে। আর দূরে যেয়ে?”
 “দূরে গেলে তো মৃত্যুটা আপনা আপনিই হয়ে যায় শাহিন। মানুষ দূরে গেলে ভুলে যায়, আজ নাহয় কাল, সেটাই সহজাত।”
“আমি দূরে গেলে ভুলে যাবে?”
“এখন আমি একটা সিনেমার ডায়ালগ দিব –  তুমি বাস্তব মৃত্যুর ওপারে চলে গেলেও তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার শক্তি আমার আছে”
“শক্তি?”
“অবশ্যই। দুর্বল চিত্তে ভালবাসা সম্ভব না। ভালবাসতে শক্তি লাগে”
“হুম”
“কি হুম?”
“তোমার শক্তির উত্তাপ টের পাচ্ছি। ঠাণ্ডা লাগছে না আর। চোখের ঠাণ্ডাও চলে গেছে”
 “খুউব, তাই না?”
 “হুম। খুব।” 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *