শহর থেকে শহরে, গল্পে গল্পে ছন্দে ছন্দে, মরীচিকার স্তূপ জমা পড়ে। এমনটাই কি হবার ছিল?
সুর ভেসে আসে, শব্দ ভেসে আসে, আওয়াজ ভেসে আসে। ফানুশের মতন টুপ টুপ করে চিন্তা জ্বলে ওঠে, কিছুদূর গিয়ে আবার নিভে যায়। নিভে যায় আবার জ্বলে ওঠে। ফানুশ জ্বালানো হয়তো অভ্যাস হয়ে যায়। ফানুশের ওপর নির্ভর করে খন্ডিত আশার আলো উড়িয়ে দেয়া হয় অন্তরীক্ষের দিকে।
ভালবাসার কথা বলতে বলতে ভালবাসার নদী শুকিয়ে আসে। আমি ভালবাসার কথা বলতে বলতে ভাবি, সব জেনেও ফানুশ উড়াচ্ছি কেন? কি হবে এইসব নিভে যাওয়া আলোদের দিয়ে? এইসব বিভ্রম দিয়ে?
মনে হয় সব মিথ্যা, যদিও জানি, সব মিথ্যা হতে পারে না। মনে হয় সব ভুল, যদিও জানি, সব ভুল হতে পারে না। তবে অনেকটা পারে। অনেক কিছু পারে।
এইসব জীবনের অংক কঠিন থেকে কঠিনতর করে ভাবতে ভাবতে ভাবতে ভাবতে এক সন্ধ্যায় যখন অফিস থেকে বের হয়ে রওনা দেই, আমার একটা ভুল ভাঙে।
সকালবেলা বিবাহিতা কলিগের কাছে শুনেছিলাম, বিয়ের পর বোঝা যায়, ভালবাসা বলে কিছু নেই। সব ডিসফানশনাল ফ্যামিলিগুলোর ডিসফানশনাল প্রোডাক্ট। দুপুরবেলা বান্ধবী বলে গেল, ভালবাসা না ছাই, একেকটা মানুষ যেন অমানুষ। পর্ন আসক্তির কারণে? নাকি ভার্চুয়াল ভাইরাসের? তার আগের রাতে বোন বলে গেল, আসক্তির কারণ যাই হোক, দিন শেষে যার যার স্বার্থ। স্বার্থের পেছনে ছুটে কূল পায় না, আবার ওসব বাসা-বাসির পেছনে ছুটবে কি।
কঠিন অবস্থা।
আমি হেঁটে যাই। কিছু না ভেবে হাঁটার অভ্যাস আমার আছে। হয়তো অচেতন মনে মেনেও নেই কলুষিত শহরকে।
এভাবে কতদিন হেঁটেছি কত পথে? অগণিত।
এরপর একদিন কীভাবে এক সন্ধ্যায় খুব ছোট্ট একটা দৃশ্যে আমার ঘোর ভাঙে। আমি জেগে উঠি বাস্তবতার আরেক পিঠে, হাঁটতে হাঁটতে।
হাতিরঝিল দিয়ে আসছিলাম। বাসস্ট্যান্ডে হঠাৎ চোখে পড়ল একটা ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে, বয়স ৭/৮ হবে। হাতে একটা বেলুন। বেলুনটা ছুটতে চাইছে, আকাশের দিকে। সুতোর কারণে পারছে না। সুতোটা ধরে আচ্ছে বাচ্চা মেয়েটা, মেয়েটাকে তার বাবা। বাবার চেহারায় ক্লান্তির ছাপ। অনেক দূর থেকে যাত্রা করে এসেছেন মনে হলো। মুখ জুড়ে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, খুব সাধারণ বেশ ভূষণ। ঠায় বসে আছেন। নিষ্পলক তাকিয়ে আছেন রাজ্যের ক্লান্তি নিয়ে। চোখের ভেতর ক্লান্তি থাকলেও বিরক্তি নেই।
অপরপাশে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছেন স্ত্রী। তিনিও লং জার্নি করে ক্লান্ত।
আমাদের দেশে পাবলিক প্লেসে সাধারণত মানুষ, বিশেষ করে মধ্যবয়সী মানুষ, এভাবে ঘুমায় না। স্ত্রী স্বামীকে এভাবে জড়িয়ে রাখে না, স্বামীও তার শরীর এভাবে মেলে ধরে না স্ত্রীর জন্যে। তাদের আলিঙ্গনে কাম নয়, আশ্রয় আছে।
বোঝা গেল, স্ত্রী মাঝেসাঝেই এভাবে স্বামীকে ধরে ঘুমিয়ে অভ্যস। আর তাদের মেয়ে অভ্যস্ত বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে থেকে, উরন্ত বেলুন নিয়ে। আর লোকটা অভ্যস্ত দুজনকে তার ছায়ায় জড়িয়ে রাখতে, ঘরে বা ঘরের বাইরে।
প্রেমের প্রকাশ বহুবার দেখেছি, আশ্রয়ের প্রকাশ নয়, অন্তত এভাবে নয়। সেই কিছুক্ষণের ছোট্ট একটা ভালবাসার দৃশ্যে কতটা মায়া ছিল সেটা বোঝাতে এটুকু বলা যথেষ্ট – আমি কাছের অনেক বিবাহিত দম্পতিকে চিনি, যারা ১৫ থেকে ১৭ বছর ধরে সংসার ধর্ম করছেন। তাদের সাথে আমার উঠা বসা। তাদের প্রেমের প্রকাশ আমি বহুবার দেখেছি, কিন্তু এত বছরেও কখনো কাউকে কারো আশ্রয় বানাতে দেখি নি। এবং জানি, এই আশ্রয়টুকু তারা পাবেন না। সেটা ‘সম্ভব না।
শহর আছে, দালানকোঠা আছে, আলোকসজ্জা আছে। আছে অনেক গল্প গান কবিতা। কিন্তু গাছ নেই, গাছের ছায়া নেই। গাছের ছায়ায় আশ্রয় নেবার পথিকও নেই।
আমি আবার হাঁটতে থাকলাম। অজস্র মরীচিকার ভিড়ে কিছুটা ভালবাসা পেলাম। যেন একটা ফুলের তোড়া কুড়িয়ে পেলাম।
ঘরে ফিরে, অফিসে ফিরে, আমি বোন বান্ধবী সহকর্মী কাউকে সে ভালবাসার কথা বলার সাহস পেলাম না। তারা হয়তো শুনে হেসে উঠত, হাসির মধ্যে না পাওয়ার যন্ত্রণা থাকতো। সে যন্ত্রণার মরা ফুলদের নিয়ে আমি কোথায় যেতে পারতাম?
আমি শুধু হাঁটতে লাগলাম।
