আলম সাহেব একজন কর্তৃত্বপরায়ণ মানুষ। হাতে গোনা কজন মানুষের ওপরে কিছুটা কর্তৃত্ব আছে তার। পরিবারের সদস্য, অফিসে কর্মচারী, এবং আশেপাশে পাড়া প্রতিবেশি। যে কারণেই হোক, আলম সাহেবকে তারা ভয় পান। তাই যে আদেশই তিনি দেন, তারা দাসের মতন পালন করে যান। আলম সাহেব এতে বেশ প্রফুল্ল বোধ করেন।
তবে কখনো সখনো কেউ তার আদেশ পালন করতে অস্বীকৃতি জানালে তার পক্ষে তা সহ্য করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে। সে ব্যক্তিকে নির্মম ‘শাস্তি’ ভোগ না করানো পর্যন্ত আলম সাহেব ঠিকমতন ঘুমাতে পারেন না।
তবে সবাই তার হুকুম পালন করে গেলেও যে তিনি খুব শান্তিতে থাকেন, ব্যাপারটা তা নয়। কারণ তারা সবাই আলম সাহেবের আদেশ শোনেন, কেউ তার কথা শোনেন না। আলম সাহেব ঠিক বুঝতে পারেন না যে এতকিছুর পরও কোথায় কী যেন একটা বড় ফাঁক রয়ে যায়। থেকে থেকে হঠাৎ কেমন এক নিঃসঙ্গতার তীব্র অনুভূতি তার মনটাকে খুব অস্থির করে তোলে। আলম সাহেব সে অনুভূতির কোনো ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারেন না। তিনি যা পারেন তা হলো অধিনস্তদের প্রতি আরও কঠোর ও নির্দয় হতে। সেটুকুই তিনি একনিষ্ঠভাবে করে যান।
হঠাৎ একদিন বলা নেই কওয়া নেই আলম সাহেবকে এক অদ্ভুত রোগে ধরল। হঠাৎ তার প্রচন্ড তৃষ্ণা পেল। এমন তৃষ্ণা যেন বুকের ছাতি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। যেন কত শত বছর ধরে তিনি মরুপ্রান্তরে হাঁটছেন, এক ফোঁটা পানি মেলে নি। পানির জন্যে জান যায় যায় অবস্থা। পাশের ঘরেই ডাইনিং, টেবিলে জগ ভর্তি পানি রাখা আছে। আলম সাহেব এক দৌড়ে যেয়ে আস্ত জগটা আলগে সেখান থেকেই সরাসরি পানি পান করতে লাগলেন। পানি গড়িয়ে তার মুখে পড়ল, শরীরে পড়ল, শার্টের কলার ভিজে গেল। পুরো এক জগ সাবার করে ফেলা হলো – কিন্তু কিছুই যেন হলো না। তৃষ্ণাটা বুকের ভেতরে রয়ে গেল। নিবারণ হলো না। আলম সাহেব ঠিক বুঝতে পারলেন না। স্ত্রীকে আদেশ দিলেন আরেক জগ পানি আনতে। তিনি আরেক জগ পানি পান করলেন। পানি মুখের ভেতর ঠিকই যায়, পেট পর্যন্ত পৌঁছায়, কিন্তু বুকের ভেতরে সেই তৃষ্ণার্ত জায়গায় এক ফোঁটা স্পর্শও লাগে না। তীব্র তৃষ্ণা তেমনই রয়ে যায়। আলম সাহেবের বুক শুকিয়ে আসে, গলা শুকিয়ে আসে। তিনি জগের পর জগ পানি ঢালতেই থাকেন গলার ভেতরে, লাভ হয় না।
তার হুকুমের দাসরা সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দেয় পানি আনতে। কেউ নদীর পানি, কেউ পড়া পানি, কেউ জমজম কূপের পানি আনে। সব আলম সাহেবের মুখে ঢালা হয়, মুখ থেকে সব পেটে, এরপর ব্লাডারে যায়। কিন্তু বুকের ভেতরে পৌঁছায় না। আলম সাহেবের বুকের ভেতর খাঁ খাঁ করে, ছাতি ফেটে যায় অবস্থা। তিনি হাহাকার করে উঠেন এবং পর মুহুর্তেই ক্রোধে ফেটে পড়েন। গালি গালাজ, ধমকা ধমকি কিছু বাদ রাখেন না। কিছুতেই কিছু হয় না। এক পর্যায়ে তার জেদ চেপে বসে। তিনি হুকুম দেন – দুজন তার মাথা ধরে রাখবে, আর দুজন ধরবে দুই হাত। এরপর তিনজন মিলে গ্যালনের পর গ্যালন পানি ঢালতে থাকবে তার মুখের ভেতরে। তার কড়া হুকুম, পানি ক্রমাগত ঢেলেই যেতে হবে যতক্ষণ না পর্যন্ত তার বুকের সেই তৃষ্ণার্ত অংশে পানি পৌঁছায়। তিনি প্রকৃতির বিধান ও বিধাতাকে কিছুটা হুমকি ধামকিও দেন, যে পানি কীভাবে না পৌঁছায় তিনি দেখে নিবেন!
আলম সাহেবের ‘দাস’-রা আদেশ মানতে অভ্যস্ত। ভয়ে ভয়েই তারা যথারীতি আদেশ মেনে যান। কিছুক্ষণের মধ্যেই আলম সাহেব ব্লাডার ফেটে মারা যান। তার নিথর দেহটা ফিল্টারের পানিতে ভিজে থাকে। মুখে, বুকে, পেটে, পিঠে, সর্বাঙ্গে পানি, কিন্তু তার বুকের তৃষ্ণার্ত সে অংশে পানি কোনোদিন পৌঁছায় না।
হয়তো জীবিত থাকলেও আলম সাহেব কোনোদিন বুঝতে পারতেন না যে তিনি কেন এত তৃষ্ণার্ত হয়েছিলেন, যে পানি তার আসলে কোথায় প্রয়োজন ছিল।
——————————-
ডিক্টেটর হওয়ার বেশ কিছু সুবিধা আছে। তার মধ্যে একটি হলো – ডিক্টেটর হলে অনেক কিছু নিয়ে ভাবতে হয় না। না ভেবেই অনেক কিছু করে ফেলা যায়। এবং করে ফেলার পর যতই ভুল ত্রুটি হোক, ডিক্টেটরের বিশেষ কোনো অসুবিধা হয় না। সে তার জায়গায় ঠিক থাকে, আগের মতনই থাকে।
যে বিষয়গুলো ডিক্টেটরদের ভাবতে হয় না তার মধ্যে একটি হলো – অন্য একজন মানুষ কি অনুভব করল। কেউ কি কষ্ট পেলো, কারও কি দুঃখ হলো, কারও কি কোনো অসুবিধা হল – এইসব একজন ডিক্টেটরের কখনো ভাবতে হয় না। এগুলো ভাবতে হয় প্রজাদের প্রতিনিয়ত। কারণ তাদের অনেকের সাথে মিলে মিশে থাকতে হয়। কাউকে আঘাত দিয়ে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে উড়ে বেড়ানোর সুযোগ তাদের নেই।
তো এই পৃথিবীতে ডিক্টেটর শুধু রাষ্ট্রীয়ভাবে না, সমাজে নানান স্তরে বিভিন্ন রোলে থাকতে পারে। অফিস আদালতে থাকতে পারে, পরিবারে থাকতে পারে, বন্ধু বান্ধবদের মাঝে থাকতে পারে এবং একক ব্যক্তিও ডিক্টেটরের মতন চলাফেরা করতে পারেন।
ডিক্টেটর হওয়ার ব্যাপারটা হয়তো এক প্রকারের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। যে আমার কোনো লজিক বোঝার প্রয়োজন নাই, আমি যাই বলব তাই হতে হবে, ভুল হইলেও সেটাকে ঠিক মেনে নিতে হবে, এবং সবাই আমার হুকুমের দাস। কেন দাস, কোত্থেকে দাস – এইসব কোনো প্রশ্নের উত্তর এখানে মেলে না।
গল্পটা বলছিলাম এই কারণে যে ‘ডিক্টেটর’ মানসিকতার মানুষের ঠিক এভাবেই নিঃসঙ্গতার তৃষ্ণায় অন্তর শুকিয়ে যায়। অন্যদের তখন তারা হুকুম করে যান তাদের তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে পানি ঢালতে। কিন্তু কোন পানি যে আসলে তাদের কোথায় প্রয়োজন, হয়তো তারা বুঝতে পারেন না কখনো।
[কেউ যদি ভাবেন আমি বাস্তবে কোনো একজনকে দেখে এমনটা লিখেছি তবে তিনি ভুল। কারণ আমি একজন না, বহুজনকে দেখেছি ‘ডিক্টেটর’ মেন্টালিটির। তাদের হাতে ক্ষমতা থাকলে এবং সুযোগ থাকলে বহু জায়গায় তারা নিজ নিজ ভার্সনে হলোকাস্ট পুনরাবৃত্তি করতেন।]
