দুর্যোগের সময়ে আমাদের দৃষ্টি কোথায় যায়? 

২১শে জুলাই আমি অফিসে ছিলাম। সবে লাঞ্চ করে ফোনটা হাতে নিতেই দেখলাম আমার পরিচিত এক উত্তরাবাসী পোস্ট দিয়েছেন, মাইলস্টোন স্কুলে বিমান ক্র্যাশ করেছে। তখনও সংবাদ মাধ্যমে কিছুই আসে নি। আমি ভাবতে লাগলাম, হয়তো স্কুল ছুটি হয়ে গেছে, খুব বেশি কিছু হয়নি, অথবা খুব ভয়ানক কিছু ঘটে গেছে। ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই বুঝতে পারলাম, দুঃখজনকভাবে আমার দ্বিতীয় ধারণাটা ঠিক। দেশের ইতিহাসে অন্যতম মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। এই শোক থেকে সত্যিকার অর্থে আমাদের দেশ কবে বেরুতে পারবে, আমার জানা নেই। 

এবং যা হয়, কেন এমনটা হলো কী জন্যে হলো আসল দায় কার – এ নিয়ে নানান আলোচনা বাকবিতন্ড চলতে লাগল। এখনো চলছে। যদিও সবাই জানি, আসল দায়টা আমাদের (গুরুত্বপূর্ণ পদের কিছু ব্যক্তিদের- ) খামখেয়ালী। অনেক কিছুই আমরা খামখেয়ালীভাবে করি। রানওয়ের সামনে স্কুল বানাই, লক্করঝক্কর বিমান সে স্কুলের উপর দিয়ে উড়াই। অবশ্য বিমানটা উড়ার আগে টেস্টিং এর সময় যে সেখানে খামখেয়ালী ছিল না, আমরা বলতে পারি না। 

আমরা খামখেয়ালে যেখানে সেখানে আবাসিক এলাকায় দোকান বসাই। দোকানে লভ্যাংশ বাড়াতে খাদ্যের বদলে যা যা মেশানো যায়, মেশাই। এতে কার ক্যান্সার হলো কার কিডনি নষ্ট হলো, “খেয়াল” করা হয় না, যেহেতু সেটা সামনে সরাসরি ঘটছে না। এবং আমরাই খামখেয়ালে সেইসব দোকানে আবার চা নাশতা লাঞ্চ ডিনার খেতে যাই। ক্যান্সার উপাদান আছে জেনেও খাই। ইউটিউবে মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালত থেকে বিনোদন লাভ করে ভুলেই যাই, যে যাদেরকে ধরেছিল, সেই দোকানগুলোতেই আবার যাচ্ছি নাতো? ঐ দোকানগুলোর কী হলো? খেয়াল থাকে না আমাদের।

এবং খামেখেয়ালীর কারণে আমরা শেকড়কে না জেনে ইতিহাসকে না জেনে – জানতে না চেয়ে – শেকড় সম্পর্কে ভুল তথ্য উপাত্ত পৌঁছে দেই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে।

আমরা ইতিহাসবিদ সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের গবেষণা পৌঁছে দিয়ে বলতে পারি না যে ৬০০ বছর আগে বাণিজ্য করতে এলে চীনারা বাঙালিকে দুটো সার্টিফিকেট দিয়েছিল। এক- তারা মিথ্যা বলে না। দুই- তারা কারো সাথে প্রতারণা করে না। 

আমরা পৌঁছে দেই ঔপনিবেশিক শাসন এবং শোষণের ইতিহাস যা আমাদের সমাজ কাঠামোকে ওলটপালট করে দিয়েছিল, এবং এই অঞ্চলে দুর্নীতি ও ঘুষের উৎপত্তি তাদের হাত ধরেই হয়েছিল। 

ব্যাপারটা এরকম যে আপনার পরিবারে সবাই সুখে শান্তিতে ছিল। এমন সময়ে হঠাৎ বাইরের কেউ আপনার পরিবারকে দখল করে ফেলল। সব ক্ষমতা তার হাতে। সে খুব ঠাণ্ডা মাথায় সুচিন্তিতভাবে আপনার পরিবারের ভেতরে চুরি লুটপাটের করার প্রচলন শুরু করল। এবং আপনি, সেই পরিবারের সন্তান, পরবর্তীতে আপনার সন্তানদের শেখাতে লাগলেন – আমাদের পরিবারের সবাই চোর, বাটপার- এটাই আমাদের ইতিহাস, এটাই পরিচয়!

এবং ঔপনিবেশিকদের লক্ষ্য থাকে এটাই – নৈতিকতার মেরুদণ্ডটা ভেঙে দিতে। কারণ যখন মানুষ নিজের শেকড়কে সম্মান করতে পারে না, তাকে মানসিকভাবে দাস বানানো খুব সহজ হয়। সে তখন নিজের দেশের জন্যে কিছু করতে ইচ্ছা করে না। তাকে শোষণ করা সহজ হয়। 

যেমন, যখন আপনি নিজের পরিবারকে চোর ডাকাত হিসেবে ভাবতে শুরু করেছেন, তখন কি আর নিজের বাবা-মা ভাই বোনের জন্যে কিছু করবেন? তখন তো মনে হবে, ওরা চোর, তাই এমন পরিবার ছেড়ে পালাতে পারলেই মঙ্গল! 

দুঃখিত, এক কথার ভেতর অনেক কথা আনছি। কিন্তু ঘুরেফিরে সব একই। 

আমি সাধারণ মানুষ, আমার দৌড় সাধারণ মানুষ পর্যন্তই। আশেপাশে সাধারণ মানুষদেরই আমি দেখতে পাই। 

মাইলস্টোনের ঘটনার পর পর মানুষের মুখে মুখে এবং ফেসবুকে শুনতে থাকলাম আমাদের সমাজের বীভৎসতার কথা – ২ লিটার পানি বিক্রি হয়েছে ৬০০ টাকায়, ২০০টাকার ভাড়া সিএনজি হাসপাতালে মুমুর্ষ রোগীদের নিতে চাইছে হাজার টাকা!! আমিও ভেতরে ভেতরে ক্রোধে ফেটে পড়েছি, ঐ অমানুষগুলোকে ধরে আচ্ছামতন ধোলাই দিতে পারলে শান্তি পেতাম। এবং মর্মাহত হয়েছি। যে কোথায় গেলাম আমরা। আমাদের সমাজটা কি এতটাই নিষ্ঠুর? এতটাই পাষাণ হয়ে গেল…? 

এর দুইদিন পর। সেখান থেকে প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে জানা গেল। বহু মানুষ এগিয়ে এসেছিল সেইদিন। এমন দোকানদাররা ছিলেন যারা দোকান খালি করে বিনামূল্যে পানি বিতরণ করেছিলেন। এমন বহু রিকশাওয়ালা ছিলেন যারা শুধু সেই স্পট আর হাসপাতালে ট্রিপ মেরেছেন, এক পয়সা নেন নি। তারা নিজ থেকে এগিয়ে এসেছেন। কই? তাদের কথা তো আমি শুনি নি? তাদের নাম পরিচয় তো আমি জানি না? তাদের একটা ছবি তো আমি ফেসবুকে দেখলাম না? কেন দেখলাম না? 

সেই মানুষদের মূল্যায়ন তবে কম? নেগেটিভ নিউজ মানুষকে বেশি আকর্ষণ করে তাই নেগেটিভ প্রচারণা বেশি? ফেসবুকের নাহয় এলগরিদমের ব্যাপার আছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের মুখে সেই মানুষগুলোর নাম নেই কেন? 

আমরা কেন আমাদের মাঝে ভালো মানুষগুলোকে ভালো কাজগুলোকে এত ধামাচাপা দিয়ে রাখি? 

খামখেয়ালে? 

১০টা মানুষের মধ্যে ২টা মানুষ খারাপ – এটা কোথায় নাই? ২টা মানুষ অমানুষ হতে পারে। কিন্তু সেই ২জনকে নিয়ে এত নাচানাচি মাতামাতি। আর সেই আটজন মানুষ, তাদের কাজ শ্রম সব বৃথা? 

বাস্তবতা খুব কঠিন। দেখুন, সেদিন যে দোকানদার তার দোকানের সব খালি করে পানি বিলিয়েছেন, দিন শেষে কিন্তু সে পানির বিল তাকে একাই পরিশোধ করতে হয়েছে। যে রিকশাওয়ালা তার আয় বাদ নিয়ে রোগী নিয়ে দৌড়েছেন, সেদিনও কিন্তু তার পরিবারে ভাতের ক্ষুধা ছিল। সে ক্ষুধা তিনি কীভাবে নিবারণ করেছেন আমরা জানি না। 

তো সে মানুষগুলোকে তো আমরা গণায় ধরি না। তাদের সম্মান বা সাহায্য তো দূরে থাক। আমরা বরং ব্যস্ত হই অমানুষদের তুলাধুনা করতে। 

তো দুর্যোগের সময়ে আমাদের চোখ কোথায় যায় এটা আসলেই এক প্রশ্ন। কাদেরকে আমরা এত হাইলাইট করি? কাদের নিয়ে আমাদের মাথা ব্যথাথাকে। মানুষদের নিয়ে? না অমানুষদের নিয়ে? 

খামখেয়ালে যেমন স্কুলের ওপর দিয়ে অকেজো বিমান উড়ে যায়, খামখেয়ালে আমাদের দৃষ্টিগুলোও,  মানুষ বাদ দিয়ে অমানুষদের দিকে যায়। 

এমন খামখেয়ালীদের পরবর্তী প্রজন্ম এই শিক্ষা পায়, যে আমরা ভীতু কাপুরুষ অমানুষ। খামখেয়ালে অনেক বড় ধরণের বিপর্যয় ঘটে যায় আমাদের মননে।  

⋆˚✿˖°⋆˚✿˖°⋆˚✿˖°

একটা লেখায় পড়েছিলাম – “আপন ইতিহাস ও মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতন না হলে কোনো জাতি কখনো বড় হতে পারে না। তার মধ্যে আত্মসম্মানবোধ তৈরি হয় না। জাতিগত হীনম্মন্যতা চেপে বসে তার অন্তরে।” 

One comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *