ঘাত-প্রতিঘাতে না পড়লে সহনশীল হওয়া যায় না,
অভিজ্ঞতা ছাড়া প্রাজ্ঞ হওয়া যায় না।
—আবু সাঈদ খুদরী (রা); বোখারী, তিরমিজী
আল্লাহ যখন কাউকে অনুগ্রহ-সম্পদ দিতে চান,
তখন তাকে পার্থিব বিপদ-আপদ প্রতিকূলতার মুখোমুখি ঠেলে দেন।
—আবু হুরায়রা (রা); বোখারী
আপনি জীবনে কতবার বিপদ আপদ দুঃখ কষ্ট বা বড়সড় সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন?
নিশ্চয়ই বেশ কয়েকবার।
সেই সময়গুলোতে একটু ফিরে যান। মনে করার চেষ্টা করুন। কী হয়েছিল, কেন হয়েছিল – এবং সে সময়টাতে আপনি কী করেছিলেন?
কোন কাজটা করেছিলেন যেটা হয়তো সে সমস্যায় না পড়লে আপনার করা হতো না? বা কোন ভাবনাটা ভেবেছিলেন? কোন অনুভূতি আপনাকে তখন নাড়া দিয়েছিল, যেটা সে সমস্যা না আসলে এমনি এমনি হয়তো কখনোই অনুভব করা হতো না…?
৫ মিনিট ভাবুন।
আমিও ৫ মিনিট ভাবলাম। এবং বিস্মিত হলাম। এই কারণে যে জীবনে যত ঝুট ঝামেলা অসুবিধা দুঃখ কষ্ট বিপদ আপদ ইত্যাদি এসেছে, এর প্রতিটা আমার জীবনটাকে গড়েছে। আর কিছুই – কোনো দর্শন বই ডিগ্রী কোনোকিছু আমাকে এভাবে গড়তে পারে নি যতটা দুঃখ কষ্ট পেরেছে।
মানে যদি এমন হতো, জন্মের পরপরই আমি মহাসুখী। কোথাও কোনো চাহিদা নাই কোনোকিছু নাই। চাওয়ার আগেই সব পেয়ে যাচ্ছি। কোনোকিছু নিয়ে টেনশন নাই। কোথাও যেতে হবে না কিছু করতে হবে না। সবখানে সব ঠিকঠাক যাচ্ছে – তাহলে আমার মতন মূর্খ অলস ও আহাম্মক পৃথিবীতে দ্বিতীয়টা খুঁজে পাওয়া কঠিন হতো। আমি দেখা শিখতে পারতাম না, শোনা শিখতে পারতাম না, বলা শিখতে পারতাম না। চাওয়া শিখতে পারতাম না। কোনোকিছুর পাওয়ার স্বাদ আমি পেতাম না। মেরুদণ্ডহীন একটা প্রাণীর মতন শুয়ে পড়ে থাকতাম, দাঁড়াতে শিখতাম না।
দুঃখ কষ্ট মানুষ হতে শেখায়?
আপনার নিজের কথাই ভাবুন। যদি ছোটবেলায় ক খ শেখার চ্যালেঞ্জটা না আসতো, আপনি কি পড়া শিখতে পারতেন? বই পড়তে পারতেন? মানুষের কাছ থেকে দুঃখ কষ্ট না পেলে আপনি কি ভালো মানুষ বোঝা শিখতেন? বা ক্ষমা করার মতন মহানুভবতা কি আপনার মাঝে জন্ম নিত?
যদি কখনো কোনোকিছু না হারাতেন তাহলে সে জিনিসের মূল্য কি আপনি দিতে পারতেন? পারতেন না।
সুখ আসলে আমাদেরকে খুব কম শেখায়। কারণ সুখের সময় গা ভাসাতে ভালো লাগে, আমরা ভেসে যাই। আর আরাম আয়েশ কেমন যেন ভোঁতা করে ফেলে অন্তরকে। যেখানে চাওয়ার কিছু নেই সেখানে পাওয়ারও কিছু থাকে না।
কিন্তু সবচেয়ে অপছন্দীয় এই ব্যাপারটা – দুঃখ কষ্ট – এটা হাড়ে হাড়ে এমনভাবে ধরে যে না শিখে কোনো উপায় নেই। তাই জীবনের দুঃখ কষ্টগুলো ঝাঁঝরা করে ফেললেও এর প্রতি আসলে কৃতজ্ঞতা অনেক। কারণ দুঃখ কষ্ট না থাকলে হয়তো অন্ধ বধির পঙ্গু হয়ে জীবনটা কাটাতাম। বাঁচার মতন বাঁচার সুযোগটা পেতাম না।
এবং সৎগুণ, মহানুভবতা মনের ভেতরে লালন করতে কিছু দুঃখ কষ্টের প্রয়োজন। নাহলে সে শক্তিটা জন্মায় না। একটু খেয়াল করে দেখবেন, যে খুব কৃপণ বা স্বার্থপর, সে কৃপণতা বা স্বার্থপরতা করে মূলত এইজন্যে যে তার যেন কষ্ট করতে না হয়। নিজেকে কষ্ট থেকে বাঁচাতে সে অনেক কিছু করে, প্রয়োজনে অন্যের ক্ষতিও করে। যেমন, একজন কৃপণ দান করে না, যেন দানের টাকাটা তার কাছে জমা থাকে। ঐ টাকা আয়ের কষ্ট যেন তাকে করতে না হয়। একজন দুর্ব্যবহার করে যেন সে দুর্ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তার সুবিধাটা জোর করে আদায় করে নিতে পারে। কারণ সৎপথে আদায় করতে চাইলে তো কষ্ট করতে হবে। তো নিজেকে কষ্ট থেকে বাঁচাতে একজন মানুষ যখন অন্য উপায় খুঁজে, সে উপায়গুলো সৎ থাকে না। সেখানে স্বার্থপরতা থাকে। এবং সে সৎ উপায়ে কষ্ট করতে গেলে তার মধ্যে যে আলো যে শক্তি ডেভেলপ করতো, সেটা তখন আর করে না।
দুঃখ কাউকে কাউকে ভাঙেও
দুঃখ কষ্টের আরেকটা দিক হচ্ছে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক। দুঃখ সবাইকে গড়ে না। কাউকে কাউকে ভাঙেও। যদি দুঃখটা ইগো বা অহমের অংশ হয়ে যায়। কীভাবে? যখন কেউ দুঃখ নিয়ে অহংকার করে, যে আমার এত দুঃখ, যেন পৃথিবীতে আর কারো দুঃখ নাই। তার দুঃখের জন্যে সে নিজেকে আলাদা বিশেষ কিছু মনে করতে শুরু করে। নিজেকে সাধারণ মানুষের সাথে মেশাতে চায় না, যে কত মানুষের আরও কত দুঃখ আছে এই পৃথিবীতে, আমিও নাহয় পেলাম কিছু। এরকম ভাবতে পারে না। সে শুধু নিজের দুঃখকেই বড় মনে করে, আর বাকিদেরকে তুচ্ছজ্ঞান করে। তার ভেতরে তখন সমমর্মিতা মমত্ববোধ উল্টো হ্রাস পেতে থাকে। যত বেশি দুঃখ সে পায়, তত নিজেকে মহৎ-এর কাতারে ফেলে দেয়। অনেক সময় নিজেও বুঝতে পারে না যে সে এটা করছে, কারণ নিজেকে স্বচ্ছ চোখে দেখার পর্যালোচনা করার সামর্থ্য তার নেই, এবং সেটা তার ভেতরে ডেভেলপ করার সুযোগও নেই।
আবার দুর্বল দিকও আছে। কেউ কেউ দুঃখ পেলে নিজেকে দুঃখের রাজা বা রানী ঘোষণা করে নিজেকে বঞ্চিত অবহেলিত জর্জরিত ভাবতে এক প্রকার সুখ অনুভব করেন। সারাজীবন শুধু দুঃখের গান। তখন দুঃখ তাদের পছন্দ করে ফেলে। দুঃখ তাদের পিছু ছাড়ে না এবং তারাও দুঃখের পিছু ছাড়ে না।
তো দুঃখ কষ্ট সবাইকে সেভাবে গড়তে পারে না, তবে বেশিরভাগ মানুষকেই পারে। আমাদের দুঃখগুলোই আমাদেরকে গড়ছে প্রতিনিয়ত। হয়তো দুঃখগুলো আমাদের পছন্দ নয়, খুব এড়িয়ে যেতে চাই, কিন্তু এর প্রতি কৃতজ্ঞ না হয়ে তো উপায় নাই। একটু ভাবুন, আপনার জীবনে ঐ দুঃখগুলো না আসলে আপনি মানসিক স্তরে আজ কোন মানুষটা থাকতেন? কতটা ইম্যাচ্যুর থাকতেন? এবং এই যে এতদূর আজ এসেছেন, দুঃখ কষ্টগুলো না থাকলে কি পারতেন? এভাবে ভাবতে পারতেন? এভাবে অনুভব করতে পারতেন? পারতেন না।
দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়টাকে খোলা রাখুন…
বলতে পারেন, আপনার দুঃখ অনেক অনেক বড়। হয়তো আমার বোঝার সাধ্য নেই, আসলেও অনেক বড়। খুব গভীর একটা ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে আপনার মনে। খুব কষ্ট নিয়ে সেগুলোর ভার বয়ে বেড়াচ্ছেন আপনি। হয়তো এই ক্ষতগুলো না থাকলে জীবনটা আরও সুন্দর হতে পারতো। হয়তো পারতো। কিন্তু যা হওয়ার তা তো হয়ে গেছে। অতীতকে তো আর উল্টানো যাবে না। শুধু সামনের পথটুকু হাঁটা যাবে। তাই এভাবে দেখুন, আপনার বড় দুঃখটা আপনার জীবনটাকে অনেক বড় করতে পারে, আপনার অন্তরের চোখটাকে খুলে দিতে পারে, এবং এমনভাবে পারে যেটা ছোট ছোট দুঃখ পারবে না। যারা আপনার মতন দুঃখ কোনোদিন পায় নি, তারা কখনো আপনার মতন জীবনকে এতটা বড় করার সুযোগও পাবে না।
তো ক্ষত তো হলো, রক্ত তো ঝরছে, কিন্তু এর পেছনে কী আছে তা আসল প্রশ্ন। স্রষ্টা নিশ্চয়ই আপনাকে এমন কিছু দিতে চান, এমন অনুগ্রহ সম্পদ দিতে চান, যার জন্যে এই বিশেষ দুঃখ কষ্টের পরিস্থিতিতে আপনাকে ফেলেছেন। কারণ নেয়ারও তো শক্তি থাকতে হয়। প্রতিকূলতা ছাড়া তো এ শক্তি ডেভেলপ করতে পারে না।
তাই যে সমস্যা বিপদ দুঃখ কষ্টেই থাকুন না কেন, আপনার দুঃখ ভারাক্রান্ত অন্তরটাকে খোলা রাখুন। জানালাটা খোলা রাখুন। আলো প্রবেশের পথটা খোলা রাখুন। কারণ দুঃখ থেকে অর্জিত সে আলো যে আপনাকে জীবনের কোন নতুন দিগন্তে পৌঁছে দেবে, আপনি জানেন না…।
