আমি ঘুরতে ভালোবাসা মানুষ। ঘুরে বেড়ানো মানে কৌতূহল টাইপের ঘুরাঘুরি। যা আগে দেখি নি, তা দেখতে পারলেই আনন্দিত। যা আগে ভাবি নি, তা ভাববার সুযোগ পেলেই খুশি। অথচ এই আমির ঘোরাঘুরি হয়েছে খুবই কম। কখনো সুযোগের অভাবে, কখনো যথার্থ ভ্রমণসঙ্গীর অভাবে। তো টুকিটাক যাই ঘোরাঘুরি হয়েছে, তা নিয়ে কিছু গল্প জমা আছে। ভাবছি এখানে কিছু লিখব।
গল্প ১
ঘোরাঘুরি ব্যাপারে আমার একটা ব্যক্তিগত থিওরি আছে। তা হলো, যখন কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়, সেখানে কিছু কাজ করে আসা উচিৎ। কাজটুকু সে জায়গার স্মৃতিটাকে খুব সুন্দর করে ধরে রাখে।
কাজ বলতে লেখা, বা আঁকা বা ছবি তোলা বা ভিডিও করা (নিজের না) বা ক্রিয়েটিভ কিছু একটা করা, বা বই পড়া, বা অচেনা কারো সাথে গল্প করা। মানে কিছু একটা করা। শুধু এলাম-দেখলাম-ঘুরলাম এর স্মৃতি তেমন মনে থাকে না, যতটা সেখানে করা কাজটা মনে থাকে।
ডেমো দেই। আমি ও আমার এক বান্ধবী একবার সাভারের হাইপড গোলাপগ্রামে গিয়েছিলাম। যারা গিয়েছেন তারা জানেন, না আছে গোলাপ না আছে গ্রাম। এর চেয়ে হতাশাব্যঞ্চক ঘোরার জায়গা দেশে আর কোথাও নেই। গোলাপের ক্ষেতে গোলাপ আছে ঠিক, কিন্তু গাছের পাতার জন্যে গোলাপ দেখা যায় না। গোলাপ তো আর সরিষা ফুল না!
তো আমি আর বান্ধবী হতাশ হয়ে আর কিছু না পেয়ে সেই ট্রিপে কিছু “এক্সাইট্মেন্ট” যোগ করতে গোলাপ গ্রামের এক বিয়ে বাড়িতে বিনা অনুমতিতে ঢুকে পড়লাম। বিয়ে বাড়ির পেছনে দেখি বিশাল পুকুর। সেই পুকুরের ধারে দুপুরটা কাটালাম, যতক্ষণ না সে বাড়ির মালির তাড়া খেলাম।
ঘটনা হলো আমি আমার বান্ধবীকে সেই খাঁ খাঁ দুপুরে বললাম, শোন, এই জায়গার ফিল নিতে হবে। আমি এখন কবিতা লিখব, তুইও কিছু একটা কর। বান্ধবী ফারমাসির ছাত্রী। তার পেশা ও নেশা ফারমাসি। তো সে তো আর ওখানে বসে ওষুধপত্র বানাতে পারে না। সে আমার দিকে অসহায় হয়ে চেয়ে রইল। আমি বললাম, চিন্তা নাই, আমি তোর জন্যে খাতা কলম এনেছি। যা মন চায় আঁক বা লেখ। আধঘন্টা আমরা কিছু লেখালেখি আঁকাআঁকি করব। কোনো কথা হবে না। আধঘন্টা পর দুজন দুজনের কাজ চেক করব।
তো শুরু হয়ে গেল। আমি শুরু করলাম কবিতা লেখা। চাইলাম প্রকৃতি নিয়ে লিখতে, পুকুর, সবুজ, আকাশ বাতাস ইত্যাদি, কলমে আসে শুধু প্রেমের কবিতা, অভিমানের কবিতা। আমার যে কার প্রতি এত অভিমান আমি নিজেও জানি না। মানুষ রাজপুত্র কল্পনা করে, আমি বোধয় রাজপুত্র কল্পনা করে তাদের সাথে অভিমানও করি। সে যাই হোক, লেখা থামানো যাবে না, লিখে গেলাম। ওদিকে বান্ধবীর মনে হলো তার ভেতরে জয়নুল আবেদিনের সত্ত্বা কিছুটা হলেও আছে। সে এই প্রকৃতিকে আঁকবে। আধঘন্টা শেষ হলো। ঝলমলে রোদেলা একটা হাসিখুশি দিনে আমার নোটভর্তি ছ্যাকা টাইপ কবিতা। আর বান্ধবীর কলমের তুলিতে প্রকৃতির এত বীভৎস রূপ! অট্টহাসিতে আমরা ফেটে পড়লাম এবং তখনই সে বাড়ির মালির কাছে ধরা খেলাম!
তো সেই ট্রিপে আমরা অনেক কিছুই করলাম। পুরো গ্রাম ঘুরে বেরালাম, চা খেলাম। এরপর জাহাঙ্গীরনগর গিয়ে শীতের পাখি দেখলাম। আরও অনেক ঘোরাঘুরি করলাম। কিন্তু আমাদের সেই অদ্ভুত কর্মকান্ডের স্মৃতি যতটা আনন্দ দেয়, অন্য কিছুর স্মৃতি এতটা আনন্দ দেয় না।
তখন আমি খেয়াল করলাম, যে একটা জায়গায় গিয়ে ঘুরতে ঘুরতে ডিগবাজি খেয়ে ফেললেও যে আনন্দ পাওয়া যায়, সে আনন্দ মনের ঘরে স্থায়ী হয় না। কিন্তু সে জায়গায় গিয়ে কিছু কাজ করলে, কিছু একটা লিখলে, বা আঁকলে বা যেকোনো কিছু – সৃষ্টিশীল কিছু একটা করলে সেটার আনন্দ অন্যরকম হয়। দীর্ঘস্থায়ী হয়।
গল্প ২
এবার কিছু না করতে পারার আফসোসের গল্প। গিয়েছিলাম জ্যোতি বসুর বাড়ি দেখতে, একটা টিমের সাথে। হুট করেই যাওয়া। যাদের সাথে যাওয়া তারা একটু সিনিয়র পর্যায়ের। আমার পাগলামিগুলো তাদের সাথে খাটে না। সুতরাং বেশ নম্র ভদ্র সুশীল হয়ে এবার ঘুরলাম। (এই গল্পে আমার দ্বারা টর্চার হওয়া কোনো বান্ধবী নাই!)

জ্যোতি বসু এক জ্যোতিময় ব্যক্তিত্ব। সুন্দর মানুষ। বিশাল মানুষ। তাকে জানতে ইচ্ছা করে, তার ব্যাপারে পড়তে ইচ্ছা করে। কিন্তু তার শৈশব যে কেটেছে নারায়ণগঞ্জে তা তার বাড়ির সামনে দাঁড়ানোর আগ পর্যন্ত আমি জানতাম না। আমার মুর্খতা আমি অকপটে স্বীকার করে নিচ্ছি। সেই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েও এই মুর্খতা টের পেলাম, যে এই বাংলার এই মাটির এত বিশাল একটা মানুষ ছিলেন তিনি, অথচ তার সম্পর্কে আমার জ্ঞান কত সীমিত।

জ্যোতি বসুর বাড়ির সামনেই পেলাম তার সম্মানে নির্মিত একটি অফিস ও লাইব্রেরি। বেশ খুশি হয়ে গেলাম, যে মূর্খতা ঘুচানোর কিছু সুযোগ হয়তো পাব। ঠিক করলাম, এই লাইব্রেরিতে জ্যোতিবসুর যে কয়টা বই পাব নোট করে নিয়ে ঢাকায় পড়ব, এবং অদূর ভবিষ্যতে, আমার কোনো এক নিরুপায় বান্ধবীকে ধরে এনে সারাদিন এই লাইব্রেরিতে বসে জ্যোতিবসুর বই পড়ব। এই ভাবতে ভাবতে বেশ উৎফুল্ল মনে ঢুকলাম সে লাইব্রেরির ভেতরে।
বেশ সুন্দর ছিমছাম একটা লাইব্রেরি। প্রচুর আলো বাতাস, ঝকঝকে পরিষ্কার সবকিছু। লাইব্রেরীর দুই প্রান্তে তাকে তাকে সাজানো বই। মাঝে পড়ার জন্যে অনেকগুলো চেয়ার টেবিল। কোনো এক দুপুরে এক কাপ চা হাতে নিয়ে আরামসে এখানে বইয়ের সাথে সময় কাটানো দেয়া যায়। মন চাইল টিমের সবাইকে বলি, আমাকে এখানে রেখে আপনারা চলে যান, আমি আর ঘুরব না। সে কি আর বলা যায়! এত বই দেখে টিমের বাকিরাও খুব খুশি, যদিও তারা কেউই তেমন বই পড়েন না। তারা আমার জন্যে খুশি। আমাকে বললেন, আপনি সব পড়ে আমাদেরকে বলে দিয়েন! আমিও খুশি মনে মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললাম, আচ্ছা!!
তো আমি উড়ে গেলাম বইঘরের বইদের কাছে। কিন্তু হায়! সবগুলো বুকশেলফ চষে একটাও জ্যোতি বসুকে নিয়ে বই পেলাম না!! বেশিরভাগ শিল্প সাহিত্যের বই। ইতিহাস রাজনীতি নিয়ে তেমন বই নেই। খারাপ হয়ে গেল মনটা। জীবনানন্দের সমগ্র পেলাম, সেটাই নিয়ে কবিতা খুলে বসলাম (একটা বইঘরে ঢুকে একেবারেই কোনো বই না পড়ে তো আর থাকা যায় না)। তো এটা আমি করি। কোনো দোকানে কবিতার বই হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করে পাতা উল্টাই। চোখ খুলে প্রথম যে কবিতাটা দেখতে পাই সেটা আমার জন্যে বলে ধরে নেই। মনে হয় যেন প্রকৃতি আমাকে সেইদিন ঠিক সেই কথাগুলো বলেছে। শুনতে অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু এই অদ্ভুত কাজটা আমি করি, ও আশেপাশে কেউ থাকলে তাদেরকেও করাই। তখন সেই মানুষগুলোও কেমন হতভম্ব টাইপ খুশি হয়ে যায়। তারা বিশ্বাস করে ফেলে যে প্রকৃতি কোনো খেলা খেলছে তাদের সাথে। তাই এমন কবিতা পাঠাচ্ছে যা তাদের জীবনের সাথে হুবহু মিলে যায়।
তো সেদিন জ্যোতি বসুর পাঠাগারে কবিতার বইও বেশিক্ষণ পড়তে পারলাম না। তার বাড়ি এসেছি অথচ তাকে জানার সুযোগ পাচ্ছি না। তাহলে আর কোথায় পাব? কীভাবে পাব? যদিও সব দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে সরকারি খাত থেকে অর্থ ভালোই ঢালা হয়েছে। সেই অর্থ কার পকেটে গেছে? কী করছে সে অর্থ দিয়ে? জিনিসপত্র কিনেছে, খাবারদাবার খেয়েছে, আমোদ ফুর্তি করেছে? এরপর কী হয়েছে? এরপর একটা ফুর্তিরত গোবর হয়ে পৃথিবী থেকে থেকে বিদায় নেয়ার অপেক্ষা করছে।
আমরা যখন ঘুরতে যাই, সৌন্দর্যের খোঁজে যাই। পাহাড় দেখি সমুদ্র দেখি কতকিছু দেখি। কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর ও রহস্যময় কিন্তু মানুষ হয়। মানুষের জীবনের কাছে ইতিহাসের কাছে ঘুরতে যাওয়ার সেরকম ব্যবস্থা কেন হয় না? যেমন, জ্যোতি বসুর বাড়ি এলাম। তিনি তার জীবনে কতকিছু করেছেন। এই সবকিছু নিয়ে একটা বই ঘর, একটা গ্যালারি আর একটা ছোটখাটো জাদুঘর হতেই তো পারতো। পাশে একটা হোটেলের ব্যবস্থা থাকতো। যেন ২/৩ দিন থেকে কেউ সারাদিন এই মানুষটার বাড়ির পাশে বসে তার কাজগুলো পড়তে পারে অনুভব করতে পারে। একটা বিশাল মানুষের বিশালতাকে ধারণ করতে পারে। এই বিশালতাকে ধারণ করার প্রচলন একটা সমাজে থাকলে তবেই তো সে সমাজ সুন্দর সুন্দর মানুষ জন্ম দিতে পারবে। যে সমাজ শুধু রেস্টুরেন্টে সেলফির সুযোগ করে দেয় সেখানে সংকীর্ণ মানুষ বেশি হবে না তো কোথায় হবে?
অনেক আফসোস নিয়ে সেদিন জ্যোতি বসুর বাড়ি থেকে বিদায় নিলাম। তার শৈশবের দালানগুলো দেখলাম, গাছগুলো দেখলাম। কবিতার মতন। প্রকৃতি মানুষের স্মৃতিকে ধরে রাখতে পারে। মানুষও অনেক সময় তা পারে না।
✿
গল্পের সাথে প্রাসঙ্গিক নয়। সেদিন জীবনানন্দের যেই কবিতা পেয়েছিলাম তার ছবি –

গল্পঃ ৩ | ইলিশ বাড়ির গল্প
বাংলা যে কত রুপালি হতে পারে এর আগে আমার ধারণা ছিল না। মানে ইলিশের কথা বলছি।

সেদিন ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর পৌঁছালাম দুপুর ১২টায়। লঞ্চ থেকে নেমেই চলে গেলাম ইলিশের আড়তে। সত্যি বলতে, কোনোদিন কোনো শপিংমলে গিয়েও আমি এত আনন্দ পাই নি, যতটা সেদিন মাছের বাজারে গিয়ে পেলাম। যেন মাছ নয়, রুপার বাজারে ঢুকলাম। চারিদিকে সারি সারি রুপালি ইলিশ। ইলিশের খাঁচি, ইলিশের স্তূপ। হাতে ইলিশ, মাথায় ইলিশ, মাটিতে ইলিশ। ফলের মতন করে তাকে তাকে সাজানো ইলিশ। চারদিকে মৌ মৌ করছে ইলিশের সুবাস। কোনো পচা গন্ধ কিন্তু নেই, শুধু ইলিশের সুঘ্রাণ। আর যারা বিক্রি করছেন, প্রচণ্ড জোরে চেঁচামেচি করতে করতে গলা বসিয়ে ফেলেছেন। বসা গলাতেই চেঁচিয়ে যাচ্ছেন। রেগেমেগে চেঁচাচ্ছেন এমন নয় কিন্তু, সে চেঁচানোতে কোনো বিরক্তি নেই, বরং যেন আনন্দ উত্তেজনা। কোনো নাবিক গুপ্তধনের সন্ধানে গিয়ে খুব ঝড় ঝঞ্ঝাট পেড়িয়ে গুপ্তধন জয় করে আনলে যেরকম হবে, সেরকম। আড়তে একেক জন ইলিশ বাজারিকে দেখে মনে হলো গুপ্তধনের হাট খুলে বসেছেন। চোখে মুখে স্পষ্ট গর্বের ছাপ । সেই গর্বিত বাজারিদের সাথে দামের দরাদরি করতেও বুকের পাটা লাগে। মনে হবে যেন আপনি ইলিশ নয়, স্বর্ণ কিনছেন। দাম আর কত কমাতে পারবেন? চক্ষুলজ্জা বলেও তো একটা ব্যাপার থাকে। তবে পকেটের পয়সা খোয়া গেলেও একেকটা ইলিশ কিনে ক্রেতাদের গর্বও কোনও অংশে কম যায় না। যেন ইলিশ নয়, হাতি কিনে ফিরছেন বাজার থেকে। আমি ও আমার কজন বন্ধুও ছিলাম সে গর্বিত ক্রেতাদের দলে। ইলিশ কেনার সাথে সাথে মনে হলো যেন বিরাট কিছু জয় করে ফেললাম! একটা মস্ত ঝকঝকে রুপালি ইলিশ এখন আমাদের হাতে! ইলিশ তো নয় যেন শ্বেত হস্তি নিয়ে ফিরলাম!
সে ইলিশ তাজা রেঁধে খাওয়াবে এমন কাছেই একটা ছোটখাটো ভাতের হোটেলে ঢুকে পড়লাম। বিশাল সাইজ ইলিশ দেখে প্রথমেই বাবুর্চি বললেন, তারা আর কাস্টমারের ইলিশ রেঁধে খাওয়ান না, তাদের হোটেলেই ইলিশ রান্না করা আছে। শুনে ঘাবড়ে গেলাম, এত বড় ইলিশ নিয়ে এখন কোথায় যাব? পুরো ট্রিপ এই কাঁচা ইলিশ বয়ে বেড়াতে হবে? একটু অনুরোধ করতেই বাবুর্চি রাজি হয়ে গেলেন। বললেন তারা এমন আর করেন না, শুধু আমরা অনুরোধ করেছি বলেই নিয়ম ভঙ্গ করে হলেও করবেন। পরে আমরা টের পেলাম যে তারা সব কাস্টোমারকে একই কথা বলেন এবং সবার ইলিশই রেঁধে খাওয়ান। এই কৌশল অবলম্বন করে লাভ হয় দুটো। এক, কাস্টমাররা বেশি দামাদামী করেন না, এবং দুই, কাস্টমারদেরকে স্পেশাল ফিল করান, যেন এমন কাস্টমারই তারা মনে মনে খুঁজছিলেন।

ভাতের হোটেলটা অবস্থিত মেঘনার পাড়ে। ছোটখাটো ভাঙাচোরা টাইপের হোটেল। খুব পুরনো জীর্ণ এক দালানের ভেতর করা। হোটেলের ভেতরের পরিবেশ দেখে বোঝা যায় যে তারা লাভ করেন প্রচুর। খদ্দের আসতেই থাকে। কিন্তু তারা দালান মেরামতে সময় নষ্ট করতে চান না। সে হোটেলের ভেতরে এক কোণায় একটা ছোট জানালা আছে, জানালার ওপারে মেঘনা নদী। সে জানালার পাশে একটা খাবার টেবিল পাতা। আমরা সে টেবিলে গিয়ে বসলাম। নদীর সরাসরি বাতাস লাগতে থাকল আমাদের গায়ে। সে অন্যরকম শান্তি। নদীর বাতাসে নদী মেশানো থাকে, সে বাতাস সরাসরি মনের ভেতর ঢুকে যায়।
একটু পড়েই গরম গরম ভাজা ইলিশ চলে এলো। সাথে ইলিশের মাথা ও লেজের ভর্তা। বিশাল সাইজের ফ্রেশ ইলিশ, তাও এইমাত্রই রান্না করা। অমৃত স্বাদ। নদীর ধারে বসে খেতে খেতে মনে হতে লাগল নদীকে মন ভরে একটা ধন্যবাদ দেই। নদী মানুষের মন অনুভব করতে পারে বলে আমার ধারণা। হয়তো সে হোটেলে যত মানুষ খেতে আসে, সবারই মনের কৃতজ্ঞতা সে রোজ অনুভব করে, আর পরম যত্নের সাথে লালন করতে থাকে তার রুপার ভাণ্ডারকে। সে ভাণ্ডার থেকে প্রতিনিয়ত মানুষকে বিলিয়ে দিতে তার কোনো অসুবিধা হয় না। উদারহস্তে সে বিলাতে থাকে, এবং আরও ঐশ্বর্যময় হতে থাকে।
সরাসরি নদীর ওপর বসে ইলিশ খাওয়া এ নিয়ে আমার দ্বিতীয়বার। দুবারই মনে হলো স্বর্গে বসে স্বর্গের খাওয়া খেলাম। এবং দুবারই ভাঙাচোরা ভাতের হোটেলে, নদীর মানুষের হাতের স্পর্শে। এই স্বাদ এই অনুভূতি কখনোই ফাইভ স্টারে সম্ভব না। এই ব্যাপারটা নিয়ে আমি খুব কৃতজ্ঞ অনুভব করি, যে বছরের পর বছর ধরে এই ভাতের হোটেলগুলো এত লাভজনক ব্যবসা করে আসছেন, কিন্তু তারা ফাইভ স্টারে পরিণত হওয়ার চিন্তা করেন না। তারা অকৃত্রিমভাবে তাদের মতই থেকে যান। তাই তাদের স্বাদও এত অকৃত্রিম থাকে। বাহির থেকে কেউ এসে হুট করে ইনভেস্ট না করলে সাধারণত এইসব জায়গায় বড় হোটেল রেস্তোরাঁ সেভাবে হয় না, এবং হলেও সেসব তেমন চলে না। নদীর কাছে হুটহাট গিয়ে যে এই অকৃত্রিম স্বাদ আমরা নিতে পারি, এটা অবশ্যই সৌভাগ্যের ব্যাপার।
ইলিশ সেদিন খেয়েছিলাম আমরা একবারই। দুপুরের খাবারে। অনেকেই আড়ত থেকে ইলিশ কিনে ঢাকায় নিয়ে যান। কিন্তু সরাসরি এভাবে ইলিশ খেয়ে আর ইচ্ছা হলো না বাসায় নিয়ে ফেরার। কারণ ইলিশের বাড়িতে বসে খাওয়ার আনন্দ স্বাদ ঘ্রাণ, তা অন্য কোথাও এভাবে পাওয়া সম্ভব হয়।
আমরা ফিরে এলাম, এবং ফেরার সময় খুব দৃঢ় সংকল্প করলাম যে খুব শীঘ্রই আবার ফিরে আসব এই স্বাদ নিতে। লঞ্চে তিন ঘণ্টারও কম সময় লাগে। ছুটির দিনে তো আসাই যায়। কিন্তু শহরে ফিরে আর সে হয় না। জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, জীবন নিয়ে ছুটতে থাকি। হয়তো জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে বলার অপেক্ষা করি, যেরকমটা হয় বলে শুনেছি, যে জীবনের ছোট ছোট সখগুলো পূরণ হলেই পারতো, একটু সময় সুযোগ করলেই হতো। জীবন থেকে প্রচুর আনন্দ আহরণের সুযোগ ছিল সময় ছিল। কিন্তু কীসের ভয়ে কীসের দৌড়ে কীসের আলস্য যে এভাবে চেপে ধরে আমাদের। অনেককিছুই জীবনে হয় বা হয় না, কিন্তু মাঝখান দিয়ে গোটা জীবনটা চলে যায়।
✿

ইলিশের বাড়িতেই ১২৫ বছরের পুরনো এক আইসক্রিমের দোকান খুঁজে বের করলাম। দোকানের নাম “ওয়ান মিনিট আইসক্রিম”। অনেকে বলেন, মাত্র ১ মিনিটে এই আইসক্রিম তৈরি হয় বলে এমন নামকরণ হয়েছে। ভারত থেকে বিশেষ মেশিন আনা হয়েছে, এক মিনিটে আইসক্রিম তৈরি করার জন্যে। তবে ওখানে গিয়ে শুনলাম এই আইসক্রিম আগে হাতে বানানো হতো। মেশিন আনলেও রেসিপিতে কোনো পরিবর্তন হয় নি। খেয়েও তাই মনে হল। দোকানে শুধু আইসক্রিম পাওয়া যায় এবং শুধুমাত্র ভ্যানিলা ফ্লেভারের। প্রতি কাপ মাত্র ৫০ টাকা। ছোটবেলায় আমার মায়ের হাতে বানানো আইসক্রিমে যে স্বাদ পেতাম, সেই একই স্বাদ পেলাম। একেবারে খাঁটি গরুর দুধ দিয়ে বানানো, আলাদা কোনো কেমিক্যাল ফ্লেভার নেই। বেশ লাগলো।
দোকানটা ভর দুপুরেও ভিড়ে ঠাসা ছিল। অনেককে দেখলাম দূর দুরান্ত থেকে এসেছেন এই আইসক্রিম খেতে। সেদিন খুব বেশি সময় ছিল না আমাদের হাতে। তাই এক কাপ খেয়েই লঞ্চ ধরতে ছুটতে হলো। ইচ্ছে আছে, এরপর একদিন সময় হাতে নিয়ে চাঁদপুর গেলে আরও বেশি আইসক্রিম খেতে হবে, বিশেষ করে আমার দুই পিচ্চি ভাগ্নেকে নিয়ে। আমি যে তাদেরকে ফেলে এই বিখ্যাত দোকানের আইসক্রিম খেয়েছি তা ঢাকায় ফিরে বলার সাহস হলো না।
গল্প ৪ || বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রম

“স্বাধীনতা পেতে গিয়ে মানুষকে একটা দায় গ্রহণ করতে
হয়েছে—তা হল আপন কর্মের ফল ভোগের অধিকার। মানুষ তার স্বাধীন
ইচ্ছা, বিচার বুদ্ধি, ধৈর্য ও শ্রম দিয়ে যে যে কর্ম করবে তার কর্মের শুভ ও
অশুভ ফল তাকেই বহন করতে হবে।
এই ধরায় মানুষ প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে নিজের ভাগ্য নিজেই তৈরি
করছে, নিজেই ভাঙছে। এ ব্যাপারে সে স্বাধীন।” – বাবা লোকনাথ
বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারীর ব্যাপারে প্রথম আগ্রহী হয়েছিলাম একটা পোস্টার দেখে। একজন বৃদ্ধ মানুষ, কিন্তু ছবিতে দেখে কেন যেন বৃদ্ধ মনে হয় না। কেমন যেন এক শক্তি এক আভা তার চোখেমুখে। ব্যাপারটা প্রথমে মাথায় নেই নি, ভেবেছিলাম আমারই মনের ভুল। কিন্তু পরে জানতে পারলাম যে তিনি এমন একজন সাধক যিনি ১৬০ বছর দিব্যি সুস্থ ও কর্মক্ষমভাবে বেঁচেছিলেন। এটা লোকেমুখে কথা না, ইতিহাসের লিখিত দলিলেও আছে। তার জীবন যে কতটা রোমাঞ্চকর, আমার এখনো অনেক জানা বাকি। তিনি তিব্বতে সাধনা করেছেন, মক্কাতে সাধনা করেছেন। আরব ইউরোপ অ্যাটলান্টিক উপকূল হেঁটে পাড়ি দিয়ে এসে বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জে তার আশ্রম গড়েছেন। তার সুদীর্ঘ আয়ু নিয়ে আমি ততটা অবাক হই নি, যতটা হয়েছি এই ভেবে যে কোনোদিন পাঠ্য বইয়ে তার নাম দেখি নি। এত বড় মাপের একজন মানুষ, অথচ তার বাণী দর্শন পড়তে হলে খুঁজে খুঁজে সব যোগাড় করতে হবে। এর চেয়ে জার্মান দার্শনিকদের বই খুঁজে পাওয়া অনেক সহজ। কি অদ্ভুত সম্পর্ক আমাদের নিজদের শেকড়ের সাথে।

বাবা লোকনাথের বই আমি ইন্টারনেটে যতটা পেয়েছি তাই পড়েছি। তৃপ্ত হচ্ছিলাম না। এরপর সুযোগ হলো তার আশ্রমে যাওয়ার। একজন শ্রদ্ধেয়া ব্যক্তিকে বলতে শুনলাম, বাবা লোকনাথের যে পোর্ট্রেট আঁকা হয়েছিল, সেটাতে তার চোখ দুটো দারুণভাবে শিল্পী ধরতে পেরেছিলেন। ছবির সে চোখের দিকে তাকালে যেন আসলেই বাবা লোকনাথের চোখ দেখা যায়, মনে হয় তিনি যেন চোখের ভেতর দিয়ে একেবারে অন্তরে ঢুকে যাচ্ছেন, এত জীবন্ত সে চোখ। তখনই ইচ্ছে হলো, আমি সে পোর্ট্রেটের কাছে যাব, এই অসাধারণ মানুষটার চোখের দিকে চেয়ে থাকবো। দেখব আমি অন্তরে সেভাবে অনুভব করতে পারি কিনা।
এই কাজটা আমি আসলেই করেছি। মন্দিরে গিয়ে তার পোর্ট্রেটের মধ্যে তার চোখ দুটোকে খুঁজেছি। কি যে জীবন্ত সে চোখ! দেখেও দেখা শেষ হয় না। সেখানে পূজা হচ্ছিল। মন্দিরের পুরোহিত আমার হাতে জবা ফুল দিতে চাইলেন। সে ফুল গ্রহণ করলে ঠকানো হতো, তাই নিলাম না। পুরোহিত যেন বুঝতে পারলেন না, এতক্ষণ ধরে বাবা লোকনাথের দিকে তাকিয়ে থাকার পরও কেন ফুল গ্রহণ করে যোগ দিলাম না। আমার সরে যেতে হলো।
আশ্রমটা ঘুরে ফিরে দেখলাম, বেশ লাগল। বেশ কিছু ভালো বই পেলাম, পিতলের ঘন্টা পেলাম। কিন্তু বাবা লোকনাথের চোখ দেখার তৃষ্ণা যেন আমার মিটল না। সে চোখ দুটো অনুভব করার জন্যে আমি আবার যাব সে মন্দিরে, সে পোর্ট্রেটের সামনে। ক্যামেরা আসলে মানুষের চোখ সেভাবে ধরতে পারে না। কিন্তু মানুষ যখন মানুষের চোখ আঁকে, হাতের স্পর্শে সে চোখ দুটো ধরে ফেলে।
