উপরের ছবিটি মমতাময় কড়াইলের। এই কথাটা খুব মনে ধরে- ম-ম-তা-ম-য় কড়াইল। বাংলাদেশে এত এত প্রোজেক্ট থাকতে আমি এই ছোটোখাটো উদ্ভট জায়গাগুলোতে কেন বিচরণ করি তার একটা সহজ ব্যাখ্যা আছে – বেশিরভাগ সেবামূলক কাজে হয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ থাকে, বা কমার্শিয়াল ব্যাপার স্যাপার থাকে, নাহয় সেগুলো হয় বিদেশী ভাতায়, সেটার আবার স্বার্থ আলাদা। স্বার্থেরও তো প্রয়োজন আছে, তাদেরকে কিন্তু খারাপ বলছি না। শুধু বলছি যে তাদের সাথে ঠিক “নিঃস্বার্থ সেবা” ব্যাপারটা যায় না। তারা অনেক ভালো ভালো কাজ করেন নিঃসন্দেহে। দেশের অর্থনীতিতে দারুণ অবদান রেখে যাচ্ছেন। অবশ্যই তার প্রয়োজন আছে। কিন্তু কিছু কিছু কাজ যদি আসলেই মানুষের জন্যে করতে হয়, তবে পুরোটাই নিঃস্বার্থভাবে করতে হয়। এবং এই নিঃস্বার্থ স্বচ্ছ সরল জায়গাগুলো আমাকে টানে।
তো সে যাই হোক, হঠাৎ একদিন সকালে আমি কড়াইল বস্তিতে উপস্থিত। বস্তি শব্দটা শুনলে চোখে সামনে ভেসে ওঠে গাদাগাদি ঘরবাড়ি, নোংরা আবর্জনা, স্যাঁতস্যাঁতে দুর্গন্ধময় এলাকা। কিন্তু কড়াইল বস্তির ভেতরে ঢুকে আমার ভুল ভাঙল। মনে হলো যেন একটা ছোট্ট শহরের ভেতর ঢুকে গেলাম। ওরকম দালানকোঠা নেই, ইট সিমেন্ট নেই, বেশিরভাগই টিনের চালের কাঠামো, কিন্তু সবকিছু বেশ সাজানো গোছানো। প্রচুর দোকান মার্কেট খাওয়ার দোকান। ফ্রেশ শাক সব্জি। প্রচুর মানুষ আসছে যাচ্ছে খাচ্ছে। কোথাও তেমন দুর্গন্ধ বা আবর্জনার স্তূপ নেই।
তো সেই বস্তির একদম ভেতরে প্যালিয়াটিভ সোসাইটির ছোট্ট একটা অফিস আছে। সেই অফিসে বসেন একজন ডাক্তার, সপ্তাহে তিনদিন একজন ফিজথেরাপিস্ট এবং ৪/৫জন নার্স। তাদের মূল কাজ, বস্তিতে খুঁজে খুঁজে নিরাময় অযোগ্য রোগীদের সেবা করা। হয়তো কেউ ক্যান্সারে কাতরাচ্ছেন, বা লিভার সিরোসিসে, বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। তার পরিজনদের সামর্থ্য নেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার। আবার এমন মুমূর্ষ রোগীকে কীভাবে সেবা দিতে হয় তারা জানেন না। তারা দিনে আনে দিনে খায় মানুষ, কীভাবে সম্ভব মৃত্যুপথযাত্রী প্রিয়জনকে সেই শ্রমটুকু দেয়া যখন তাদের শ্রমের ঘামে জীবন চালাতে হয় রোজ রোজ?
তো এমন রোগীদের এই প্যালিয়াটিভ কেয়ারের নার্সরা গিয়ে সেবা দেন। তাদেরকে বাসায় গিয়ে গিয়ে গোসল করান, ওষুধ দেন এবং এই করতে গিয়ে দেখা যায় যে অনেকের ঘরে খাবার নেই, তখন খাবার কিনে দেন। প্যালিয়াটিভ সোসাইটি ও তার সহযোগীরা নিজ পকেট থেকেই অর্থ ঢালেন এবং পুরোটাই করেন নিঃস্বার্থভাবে। কারণ এই মানুষগুলো তো মৃত্যুর দিকে ধাবমান, তাদের কাছ থেকে কি কিছু পাওয়ার আশা থাকে?

মমতাময় কড়াইলের একজন নার্স হচ্ছেন মাজেদা আপা। দারুণ তার ব্যক্তিত্ব। এত নিষ্ঠার সাথে এত মমতা নিয়ে তার কাজগুলো করেন…। তো তার সাথে একজন ক্যান্সার রোগীর ঘরে আমার যাওয়া হলো সেদিন। একজন মহিলা, বয়স ৪৫+ হবে। তার ব্রেস্ট ক্যান্সার ছড়িয়ে লিভার পর্যন্ত পৌঁছেছে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় রাতদিন কাতরাচ্ছেন। মরফিন খেয়ে দিন পার করছেন। দুঃখের ব্যাপার হলো, এই যন্ত্রণাগুলো কিন্তু সময়ের সাথে সাথে ধীর গতিতে প্রকান্ড হতে থাকে। হুট করে এসে হুট করে যায় না। ভয়াবহ অসুখে পড়া মানুষদেরকে বোঝার উপায় থাকে না যে তাদের অবস্থা কি ভয়াবহ। প্রথম দেখাতে স্বাভাবিক মনে হয়। সময়ের সাথে সাথে তাদের অস্বাভাবিক কষ্টগুলো চোখে পড়ে।
আমি সে মহিলার ঘরে গিয়েছিলাম অল্প কিছু সময়ের জন্যে। গিয়ে দেখি আমরা আসবো খবর পেয়ে আগে থেকেই রেডি হয়ে বসে আছেন। তিনি, তার স্বামী ও ফুটফুটে মেয়েটি নতুন জামাকাপড় পড়ে বিছানায় বসা। তাদের ঘর বলতে একটা ছোট্ট রুম, সে রুমে বিছানা ছাড়া আর কিছু রাখার জায়গা নেই। মাটি থেকে সিলিংপর্যন্ত আঁটসাঁট করে বেঁধে রাখা ব্যাগ, পোটলা ইত্যাদি। সেগুলোতে তার সংসারের এতদিনের জমানো জিনিস। হয়তো শীতের কাপর, হয়তো গ্রামের বাড়ি থেকে আনা চাল-আটার বস্তা। তাদের রুমে খাট তো নয়, চকি বলা চলে, চকির ওপরে ছোট্ট একটা সিলিং ফ্যান ঘুরছে। তার নিচে তিনজন মানুষের সংসার। মহিলা জানেন যে তিনি মারা যাবেন, জানেন তার স্বামী ও ৪/৫ বছরের মেয়েটিও। তারা কি মৃত্যুর জন্যে প্রহর গুনছেন? তা কিন্তু নয়। প্রহর যেন গুনছেন বেঁচে থাকার জন্যে। যে হয়তো তিনি এই ভয়ানক অসুখ নিয়েই আরও কিছুদিন বাঁচবেন, কিছু দিনগুলো অনেক দিন পর্যন্ত গড়াবে।
আমি মহিলার চোখের দিকে চেয়ে থাকলাম। চোখগুলো জীবন্ত। তার কষ্টের কথা বর্ণনা করছেন কষ্ট নয়, জীবন নিয়ে। মরতে কত কষ্ট এরকম নয়, বরং বেঁচে থাকা কত কষ্টের। সাথে তার স্বামীও যোগ করছেন একটু পর পর। চোখের সামনে স্ত্রীর যে যন্ত্রণাগুলো তিনি প্রতিনিয়ত দেখছেন, তার বিশদ বর্ণনা দিচ্ছেন। তারা এর আগে ক্যান্সার দেখেন নি। ক্যান্সার কেমন হয় জানতেন না। যতই দিন যাচ্ছে, ক্যান্সারের ভয়াবহতা আবিষ্কার করছেন তারা নতুনভাবে। এ যেন দুঃস্বপ্নের ভেতর আটকে যাওয়ার মতন।
সেই ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে সে নারীর চোখের দিকে চেয়ে থেকে আমার মনে হলো তার মনের কষ্টগুলো অনেক বেশি। তিনি তার হাত নাড়াতে পারেন না, একা বাথরুমে যেতে পারেন না না। তার মেয়েটার চুলগুলো বড় হয়েছে। নিজ হাতে একটু আঁচড়ে দিতে পারেন না। রান্না করে তার ভালোবাসার মানুষগুলো খাওয়াতে পারেন না – এই কষ্টগুলো তার মনে ঢের বেশি। অসুস্থ ব্যাক্তিকে দেখলে নাকি বলতে হয়, আপনি শীঘ্রই সুস্থ হয়ে যাবেন। কিন্তু মৃত্যুশয্যায় রোগীদের কী বলতে হয়, কী বলা যায়…এর উত্তরগুলো আমি ঠিক জানি না। আমি কিছু বলার পাই না। জীবনটা বারবার খুব অদ্ভুত ঠেকে আমার কাছে। মৃত্যুশয্যায় মানুষদেরকে দেখে মনে হয়, আমি যে সুস্থ থেকেও ভালোভাবে বাঁচছি না, জীবনকে পুরো জীবন দিয়ে অনুভব করছি না, এ বড়ো অপরাধ। বড়ো অপরাধ…।
✿
মমতাময় কড়াইল নিরাময় অযোগ্য রোগীদের সেবা দেয়ার পাশাপাশি অটিজম ও ডিজএবিলিটিতে আক্রান্ত শিশুদেরকেও সেবা দিয়ে থাকেন প্রতি শনিবার। আমি এক শনিবার সকালেই গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখলাম বাচ্চারা খেলা করছে, নার্সরা খাওয়াচ্ছে দাওয়াচ্ছে। ফিজিওথেয়াপিস্ট যিনি ছিলেন তিনি দেখালেন একটি ৪/৫ বছরের শিশুকে যার একটা পা প্রায় অকেজো হতে নিয়েছিল। কিন্তু থেরাপি দিয়ে এবং কিছু এক্সারসাইজ করে এখন সে বাচ্চাটি প্রায় সুস্থ। পুরোপুরি হাঁটতে পারছে।
এই ব্যাপারগুলো বেশি আহত করে আমাকে। মানে ছোট্ট কিছু পদক্ষেপ নিলেই কিন্তু একজন রোগীর ও তার পরিবারের জীবনটা পাল্টে যায়। যারা এক্সট্রিম কেসে ভুগছেন, তাদের কথা বলছি না। এমন অনেক রোগী আছেন যারা সঠিক নিরাময় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে খুব অল্প খরচেই কিছুদিনের মধ্যে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু “সঠিক নিরাময় প্রক্রিয়া” – এর খোঁজ তাদের নাগালের বাইরে রয়ে যায়। বেশিরভাগ প্রচলিত সেবাকেন্দ্রগুলোতে যেয়ে তাদের শুধু পকেটের পয়সা যায়, এবং তাদের পকেটের পয়সার মূল্য অনেক, অনেক সময় তাদের মৌলিক চাহিদার চেয়েও…।
✿
সেখানের ডাক্তারের সাথে কথা বলে আমার বেশ ভালো লাগল। তরুণী ডাক্তার, বয়স ২৮/২৯ হবে। তিনি করোনার সময় যোগ দিয়েছেন। তার এখন সময় ক্যারিয়ার গড়ার, নানান হাসপাতালে কাজ করার, এপ্লাই করার। কিন্তু তিনি সাধারণ মানুষের সেবাতে ব্রত হয়ে আছেন। এখানেই ফুল টাইম কাজ করছেন। এই মানুষগুলোর প্রয়োজনকে অনুভব করে তিনি তাদের ছেড়ে যেতে পারছেন না। কড়াইল বস্তিতে একজন ফুলটাইম ডাক্তার বা নার্স পাওয়া কিন্তু খুব কঠিন। এই মানুষগুলোকে সাধারণভাবে দেখে আসলে বোঝার কোনো উপায় নেই যে কত অসাধারণ মানুষ তারা…।
[মমতাময় কড়াইল খুব ছোট্ট একটা প্রোজেক্ট। বাংলাদেশ প্যালিয়াটিভ সোসাইটির প্রোজেক্ট। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্যালিয়াটিভ সোসাইটির সহযোগী হিসেবে কাজ করছে নানাভাবে, এবং সেই সূত্র ধরেই আমার এখানে যাওয়ার সুযোগ হলো।]
প্যালিয়াটিভ কেয়ার সোসাইটির সাথে যোগাযোগ – লিঙ্ক
প্যালিয়াটিভ জীবন (১) – লিঙ্ক

Palliative care should be compulsory everywhere.