নওমি তার ঘরে বসে প্রার্থনা করে – তার বাবা মা যেন আরেকটু সুখ পায়, আরেকটু হাসি ছড়িয়ে যায় তাদের মনে।
নওমি দেখে, তার বাবা-মা খুব ক্লান্ত ও অসুখী। তারা না খেয়ে নেই, তবু অভাববোধের কোনো শেষ নেই। কেমন এক অদৃশ্য হাহাকার বাসা বেঁধে আছে তাদের বাসাটাতে।
নওমির খুব ঘুম পায়। নওমির মনে হয়, সব বুঝি তার দোষ।
হয়তো সে কিছু তার বাবা-মাকে দিতে পারে নি। আসলেও তো তার অনেক কিছু দেয়ার ছিল। বৃত্তি পাওয়া হলো না, ক্লাসে প্রথম দশজনের মধ্যে থাকতে পারল না, আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়েও তেমন কিছু করে দেখাতে পারলো না । এমন কি ভালো একটা স্কুলেও চান্স পেলো না। ঘরেও প্রায় সারাদিন ঘুমায়। বাবা-মা তাকে বকে বকে ওঠায়।
নওমি খুব ভালো করে জানে, কিছুই সে দিতে পারে নি তার বাবা-মাকে।
নওমির মনে হয়, নওমির অনেক দোষ।
তাদের ক্লাসের ফার্স্ট হওয়া মেয়েটার বাবা-মা নিশ্চয়ই অনেক সুখী। ওর রেজাল্ট কার্ডটা নিশ্চয়ই আলোকিত করে রেখেছে ওদের ঘরটাকে।
মনে হয়, যে ছেলেটা আর্টের প্রতিযোগিতায় প্রথম হলো, ওর ঘরে এত ক্লান্তি এত অবসাদ নেই। ও নিশ্চয়ই সারাদিন ঘুমায় না। বরং বসে বসে সুন্দর ছবি আঁকে। ওর বাবা-মা খুব খুশি হয়ে যায় ছবিগুলো দেখে। ওরা সবাই একসাথে হাসিখুশি থাকে সব সময়।
ওরা প্রত্যেকে কত খুশি কত আনন্দ এনে দিতে পেরেছে ওদের ঘরে। অথচ নওমি? নওমি কিছুই পারল না আজ পর্যন্ত।
নওমির সখ হয় বড়ো, একদিন বাবা-মাকে হাসিখুশি দেখতে। তারা হাসবে আর হাসবে, সুন্দর সুন্দর কথা বলবে। সকালে উঠেই ঝগড়া-ঝাটি করবে না। মা সারাদিন ক্যাচক্যাচ করবে না। বাবা ধুরুম ধারুম দরজা লাগাবে না। দু দিন পরপর সব টাকা কোথায় গেল বলে হাঁ হুতাশ করবে না। মা নানিবাড়ি যেয়ে কান্নাকাটি করবে না। বাবা মাঝে মাঝে রাতে ফেরা বন্ধ করবে না। প্রতি রাতে যখন বাবা-মার ঘরের দরজাটা বন্ধ হবে, দরজার ওপাশ থেকে চেঁচামেচি আর ভাঙচুরের শব্দ আসবে না।
নওমির খুব সখ হয়, একেবারে জেদ চেপে যায়। ইচ্ছে হয় পড়াশোনা করে সব উড়িয়ে দিতে। রাত দিন শুধু পড়বে আর পড়বে, পড়তে পড়তে ফার্স্ট হয়ে যাবে। এরপর তার মা-বাবার সব দুঃখগুলো ঘুচে যাবে। দুঃখের সব কারণগুলো ঘুচে যাবে চিরতরে। যে কারণগুলো নওমি তার ছোট্ট জগতে বুঝে উঠতে পারে না ঠিক।
যেমন, তার বাবা-মা আসলে নিজেদের নিয়েই বড্ড অসুখী, নওমিকে নিয়ে নয়।
সুখ যেমন আকাশ থেকে নেমে আসে না। সুখের প্রক্রিয়ায় ঢোকা প্রয়োজন। কিন্তু নওমির বাবা-মার কাছে বরং দুঃখকে কষ্টকে অনেক বেশি সহজ ও পরিচিত মনে হয়।
নওমি বুঝতে পারে না যে মানুষের সহজ প্রবণতা সহজের পেছনে ছোটা। নিজ নিজে গন্ডিতে আবদ্ধ থাকা।
কারণগুলো আরও যেমন, নওমির বাবা তার স্ত্রীকে ভালবাসতে শিখেন নি। তিনি আকর্ষণ জানেন, মোহ জানেন, কাম জানেন, ক্রোধ জানেন। কিন্তু নারী কী ভালোবাসা কী আশ্রয় কী – তিনি জানেন না।
যেমন, নওমির মা তার স্বামীর কাছ থেকে আসলে কি চান কখনো বুঝে উঠতে পারেন নি। তাদের অর্থ সম্পদ স্ট্যাটাস সবই আছে। সব থেকেও যেন কিছুই নেই। এই অভাববোধ কোত্থেকে আসে? তিনি উত্তর খুঁজে পান নি কখনো। হয়তো প্রশ্নটাও নিজেকে করেন নি সেভাবে।
তার কি আগে নিজেকে চেনা উচিৎ ছিল? নিজেকেও তিনি চিনতে পারেন না যেন।
কারণ যেমন, নওমির বাবা-মা একটা গহীন অরণ্যের ঘুটঘুটে আঁধারে হারিয়ে গেছেন। সেখানে প্রতিনিয়ত তারা লড়াই করছেন নানান বেশের দানবদের সাথে, ভেতরে ও বাইরে। তারা সারভাইভাল মোডে আছেন। এর বাইরে বাঁচা যায় কীভাবে, সে প্রশ্নটাও যে করা যায়, তারা বুঝতে পারেন নি কখনো। নওমির মতন খোলা চোখে পৃথিবীটাকে দেখতে তারা ভুলে গেছেন, স্কুলের গণ্ডি পেরনোর পরে।
ছোট্ট নওমি এতকিছু বোঝে না। সে শুধু বোঝে, বড্ড অসুখী তার বাবা-মা। এবং তার কারণ তার রেজাল্ট কার্ড।
নওমির দুঃখ হয়, কষ্ট হয়। নিজেকে নিয়ে অভিমান হয়। যে কিছুই দিতে পারে নি সে তার বাবা-মাকে। এই দুঃখ কষ্ট হাহাকারদের নওমি অভ্যন্তরীণ করে ফেলে। এবং নওমি ঘুমিয়ে পড়ে। কখনো কখনো ইচ্ছে করে – এই ঘুম যেন শেষ ঘুম হয়…
প্রতিনিয়ত দেখি, পূর্ণবয়স্করা তাদের মনের অসুখের চাপটা কেন যেন সন্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে দেন। তাদের নিজের সুখী হতে পারার অক্ষমতাকে অস্বীকার করে সন্তানকে দোষারোপ করেন। এবং সন্তানদের ভেতরে ব্যর্থতার অনুভূতি খুব সূক্ষ্মভাবে কিন্তু প্রবলভাবে ঢুকে পড়ে।
বাচ্চারা তো ছোট মানুষ। তারা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না যে এটা হচ্ছে তাদের বাবা-মাদের সাময়িক রিএকশন, তাদের কোনো দোষ নেই। তারা বিশ্বাস করে ফেলে, যে তাদেরই সব দোষ। এবং এই বিশ্বাসটা মনের অনেক গহীনে চেপে তারা বড় হয়। বড় হয়ে একই ভুলদের পুনরাবৃত্তি করে, যখন তারা বাবা-মা হয়।
আসলে ভালো থাকার প্রক্রিয়া শেখাটা এত জরুরি, শুধু নিজের জন্যে নয়। নিজের সন্তানের জন্যে, পরিবারের জন্যে। এমনি এমনি ভালো থাকা তো যায় না। এমনি এমনি খারাপ থাকা যায়। খারাপ থাকা খুব সহজ, কোনো এফর্ট দিতে হয় না। ভালো থাকতে এফর্ট দিতে হয়, শিখতে হয়, প্রয়োগ করতে হয়।
আমরা যারা বাবা-মা হয়েছি বা হবো, আমরা যেন ভালো থাকা আগে শিখি। শেখার চেষ্টাটুকু করি। নিজেকে ভালো রাখতে শেখাটা স্বার্থপরতা নয়। বরং দায়িত্ব – নিজের প্রতি, আপনজনদের প্রতি।
আমরা ভালো থাকতে না পারলে আমাদের আপনজনদেরকে কখনোই ভালো রাখতে পারব না।
