রাজধানীর রাজকীয় রিক্সায় করে যে অভিজ্ঞতাগুলো নেয়া যায় তা অন্য কোনো বাহনে চড়ে কখনোই সম্ভব নয়, সুকৃতির মতে। যেমন, রিক্সায় খোলা আকাশটাকে খুব কাছ থেকে দেখা যায়। আকাশের মলিনতা বা তীব্রতাকে অনুভব করা যায়। রিক্সায় বৃষ্টিকে ছোঁয়া যায়, হাতে মুখে পিঠে ঘাড়ে। রিক্সায় কারো পাশে বসে কথা না বলে থাকা যায় না। গাড়িতে যেমন পাশের মানুষটাকে এড়িয়ে দিব্যি মুঠোফোনের পর্দায় ডুব দেয়া যায়, রিক্সায় সেটা সম্ভব নয়। তবে রিক্সার সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার হলো এতে করে শহরের কোলাহলদের ভীরে বসে নানান রকম চিন্তা করা যায়। এই চিন্তাগুলো অন্য সময় আসে না কেন যেন।
সুকৃতির মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে একটা নোটবই সাথে রাখতে। রিক্সায় বসে যে চিন্তাগুলো আসে সেখানে তা টুকে রাখবে। কিন্তু রিক্সার ঝাঁকির মধ্যে লেখা সম্ভব হয়ে উঠে না, ফোনে টাইপিংও না। অনেক কসরত করেও সুকৃতি রিক্সায় বসে লেখা বা টাইপ করর ব্যাপারটা আয়ত্ত করতে পারে নি। যদিও সে শুনেছে,এটা আয়ত্ত করা সম্ভব। ইবনে সিনা নাকি ঘোড়ার পিঠে চড়ে লেখার ব্যাপারটা আয়ত্ত করেছিলেন। অনেক দূরে কোথাও যাচ্ছেন, দিন দশেকের যাত্রা। তিনি দিব্যি ঘোড়ার পিঠে বসে যাত্রাপথে লেখালেখির কাজটা সেরে ফেলতেন। কীভাবে যে এটা করেছিলেন সে কায়দাটা কোথাও লিখে রেখে গেলে ভালো হতো। কারণ রিক্সায় সুকৃতির মাথায় যেসব অদ্ভুত অদ্ভুত চিন্তা আসে, রিক্সা থেকে নামলেই কেন যেন সব হাওয়া হয়ে যায়। ঠিক যেন ঘুম ভেঙে জেগে উঠার মতন। ঘুমের ভেতরে কি দেখেছিল, মনে পড়ে না আর।
ঠিক যেমন আজ রিক্সায় ওঠার পর থেকেই সুকৃতির মাথায় একটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, সে কোনোদিন কোনো রিক্সাচালকের সুন্দর নাম শোনে নি কেন? নামগুলো ঘুরে ফিরে একই রকমের হয় কেন? জব্বার কুদ্দুস রহিম আলম? কদাচিৎ শোনা যায় রাজা, বাদশাহ, রুস্তম। কিন্তু বেশিরভাগেরই নাম এক ধাঁচেরই হয়। কেন? অবশ্য এটাও ঠিক যে সুকৃতি আর কতজন রিকশাচালকের নাম জিজ্ঞেস করেছে? কতটুকুন আর কথা হয়- এই মামা যাবে, এই নাও ভাড়া। এই তো। এর বেশি তো হয় না। হয় না কেন? যে রিক্সাচালক কঠোর কায়িক পরিশ্রমে গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছে, তার সাথে কি এর বেশি কথা হতে পারে না? তার নাম কি জানতে উচিৎ না? উচিৎ। কিন্তু জানা হয় না। কেন হয় না? কারণ মানুষের খুব তাড়া? দৌড় দৌড় ছুট ছুট? নাম জিজ্ঞেস করার সময় হয় না? নাকি নাম জিজ্ঞেস করলে খুব বেশি সম্মান দেখানো হয়ে যাবে যেটা রিক্সাচালকদেরকে এই সমাজে আমরা দিতে চাই না সহজে?
ভাবতে ভাবতে সুকৃতির মাথায় আরেকটা চিন্তা এলো- কাউকে অসম্মান করার জন্যে তার নাম জিজ্ঞেস না করাই কি যথেষ্ট নয়? পরিচয়ের শুরুতেই প্রয়োজনীয় কথা সেরে ফেলা, আলাপ পরিচয় নেই। নাম জানবার প্রয়োজন নেই। হয়তো আমরা অধিনস্তদের মধ্যে তাদেরই নাম জানতে চাই যাদের বারবার ডাকবার প্রয়োজন হয়, যেমন বুয়ার নাম দারোয়ানের নাম।
সুকৃতির রিক্সা কড়া ব্রেক কষলে প্রায় ছিটকে পড়ে যেতে নেয় রিক্সা থেকে। ভাগ্যিস রিক্সার হুড ধরা ছিল, তাই বাঁচা। এক্টুর জন্যে রিক্সাটা এক বাইকে লেগেও লাগল না।
দোষটা রিক্সাচালকের। এত সরু গলিতে ওভারটেক করার মানে হয় না। সুকৃতি কিছুটা রাগান্বিত গলায় বলল, এটা কি ওভারটেকের জায়গা, মামা?
রিক্সাচালক দ্বিগুণ রাগান্বিত, হুন্ডাওয়ালাই তো মারছে! ব্যাডা খাডাইশ!
নিজের দোষটা না দেখে অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া। এর সাথে তর্ক করার মানে হয় না। বিরক্ত লাগল সুকৃতির।
চিন্তায় আবার ছেদ পড়ল। কি যেন ভাবছিল? নাহ, গরমটা আজ বেশি। সানস্ক্রিন দিয়ে বের হওয়া উচিৎ ছিল। হাত পা জ্বলে যাচ্ছে। কিন্তু সানস্ক্রিনের ক্যামিকেল বিষাক্ত। এর চেয়ে এলোভেরা ভালো। রাস্তায় চোখে পড়লে এলোভেরা কিনতে হবে… – ওহ হ্যাঁ, মনে পড়েছে, যা ভাবছিল- রিক্সাচালকদের নাম।
নাহ, রিক্সাচালকদের ব্যবহারটাই মেজাজ বিগড়ে দেয়। কার মন চাইবে এমন এটিচুড করলে সালাম দিয়ে নাম জিজ্ঞেস করতে? কারোরই চাইবে না।
কিন্তু…কিন্তু এই এটিচুড মানুষ কখন করে? সম্মান দেখালে কি করে? সমাজে একজন মানুষের অবস্থান যদি শক্তপোক্ত হয় তাহলে কি করে?
যেমন কর্পোরেটের দালানগুলোতে অফিসগামী দুর্ব্যবহারকারী মানুষ কি নেই? আছে, কিন্তু তারা প্রকাশ্যে দুর্ব্যবহার করতে পারে না। ভদ্রলোকের মুখোশ পরে থাকে। কেন? কারণ সমাজে তাদের অবস্থান “ভদ্রলোক” এর কাতারে। বাসায় এসে ঠিকই স্ত্রী ছেলেমেয়ের সাথে দুর্ব্যবহার করে কিন্তু পথেঘাটে মানুষকে সে সম্মান দেখায়, কারণ সেও মানুষের কাছ থেকে সম্মানটুকু প্রত্যাশা করে। ইশ, সে মানুষগুলোর জীবনসঙ্গীর জীবনটা কি দুর্বিষহই না কাটে। সঙ্গীর কুৎসিত কদাকার মনটার সঙ্গে পার করে দিতে হয় গোটা জীবন…।
নাহ, গরমটা বেশিই লাগছে। রিক্সা না নিয়ে উবার নিলে কি ভালো হতো? কিন্তু উবারে যে চিন্তাগুলো এভাবে আসে না। সুকৃতি যাতায়াত তো শুধু শহরের পথে ধরে না, বরং চিন্তাদের অলিগলি ধরে। এইসব চিন্তায় প্রবেশের জন্যে রিক্সা প্রয়োজন। আচ্ছা মানুষ বহিরাজগতে কতটা বাঁচে আর নিজের ভেতরে, মানে চিন্তার ভেতরে কতটা বাঁচে? যেমন একজন মানুষ, যে খুব সুন্দর একটা বাড়িতে থাকে, সুন্দর সুন্দর জায়গায় ঘুরে বেড়ায়, তার আশেপাশের সবকিছু দেখতে খুব সুন্দর। অথচ মানুষটার ভেতরে চিন্তাগুলো কুৎসিত সংকীর্ণ। তাহলে সে মানুষটা কেমন কদাকার হয়ে উঠে? সব সুন্দরের মাঝে থেকেও তার জীবনটা কত দুর্বিষহ দুর্গন্ধময় হয়ে উঠে? চোখে দেখা যায় না, বাহির থেকে বোঝাও সম্ভব না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে নিজের নরকে জ্বলতে থাকে প্রতিনিয়ত। হয়তো নরকে থেকে সে বুঝতেও পারে না এটা নরক।
সুকৃতির রিক্সা মোড় ঘুরালো। মোড়ের কাছেই চোখে পড়ল রোজ রোজ দেখা সে সবুজ বাড়িটা। বাড়িটার রঙ খুবই বেমানান টাইপের সবুজ। গাছের পাতার সতেজ সবুজ না, কেমন ফিরোজা টাইপের সবুজ। কিন্তু বেমানান রঙে এই বাড়িটাকে রোজ দেখতে দেখতে চোখে মানিয়ে গেছে কেমন। মনে হয় যেন এই সবুজই তো হওয়ার কথা ছিল বাড়িটার। ঠিকই তো আছে। হয়তো মনের ভেতরও বেমানান জিনিসগুলোকে এভাবে মানিয়ে নেয় মানুষ। দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে না।
কী থেকে কী ভাবছে সুকৃতি। কোথায় যেন ছিল- হ্যাঁ, রিক্সাচালকদের নাম। আচ্ছা, তাদের সবার নাম এক টাইপের হয় কেন? রহিম করিম আলম কুদ্দুস? শুধু রিক্সাচালক না, বুয়াদের নামও একই ধাঁচের হয়, আলেয়া লতিফা পারভিন। কোনো বুয়ার নাম আরশী অন্তরা আনিশা শোনা যায় না। কোনো রিকশাচালকের নাম উৎকর্ষ উৎপল উচ্ছ্বাস হয় না। তাহলে শুধু নাম দিয়েই কি সমাজে শ্রেণী নির্ধারণ হয়ে যায়? উচ্চিবিত্তের নাম মধ্যবিত্তের নাম নিম্নবিত্তের নাম – সবার নাম আলাদা আলাদা? উচ্চবিত্তের কারো নাম আলেয়া হয় না। নিম্নবিত্তের কারো নাম উৎকর্ষ হয় না। কোথাও কোনো লিখিত নিয়ম নেই, কিন্তু অনুসরণ করছে সবাই।
আচ্ছা, একজন মানুষের নাম কখন রাখা হয়? তার জন্মের কিছুদিন পর। সে শিশু ধনী না গরিব এটা কিন্তু কারো মাথায় থাকে না তখন। বাবা মা কখনোই ভাবেন না যে তাদের শিশু বড় হয়ে বড় কিছু করতে পারবে না। কারণ একটি শিশুর অস্তিত্ব মানে বিশুদ্ধ সম্ভাবনা। সে বড় হয়ে অনেক কিছু করতে পারবে, তার দ্বারা যেকোনো কিছু করা সম্ভব- এই আনন্দ অনুভূতিই কাজ করে জন্মের পরপর। সদ্য জন্ম নেয়া শিশুটি যেমন পবিত্র মুক্ত স্বাধীন, তার বাবা মাও সে পবিত্র বলয়ে ঢুকে যান। মুক্ত স্বাধীন ভালোবাসার ছায়াতলে আশ্রয় নেন। তাহলে সেই সময়টাতে কেন সে বাবা-মারা তাদের সন্তানের নাম কুদ্দুস আলেয়া রাখবেন? এই নামগুলো খারাপ না, কিন্তু নামগুলো তো এক বিশিষ্ট শ্রেণীর বাইরে বের হতে পারছে না। হয়তো নামের সাথে সাথে পারছে না মানুষগুলো। এমন কি হতে পারে, নামের শেকলই তাদের নিয়তিকে বেঁধে রাখে?
এমন কি হতে পারে, একটা ছোট্ট ছেলে, যাকে সবাই কুদ্দুস বলে ডাকে, সে নিজেকে রিক্সাচালকের বাইরে অন্য কিছু ভাবতে পারে না কারণ কুদ্দুস নামের কোনো ইঞ্জিনিয়ার সে কখনো দেখে নি? হয়তো ছেলেটা পড়াশোনায় ভালো ছিল, হয়তো বৃত্তিও পেয়েছিল, হয়তো হাল ধরে থাকলে ভার্সিটিতে চান্স পেয়ে যেত। হয়তো ছেলেটার মেশিন খুব ভালো লাগে, তাই ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন সে দেখতে পারতো। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার এর কথা ভাবলেই তার মন তাকে বলে, কুদ্দুস নামের কোনো ইঞ্জিনিয়ার নেই, হতে পারে না। হয়তো ছেলেটা বুঝতেও পারে না যে এই চিন্তাটাই তাকে আটকে রাখে, যে কুদ্দুস নামের কোনো ইঞ্জিনিয়ার হয় না। তাই ছেলেটা এইচএসসি পর্যন্ত পড়ার উদ্যম পায় না। ভার্সিটিতে ভর্তির সুযোগ কখনো পায় না। ছেলেটার কোনোদিন ইঞ্জিনিয়ার হওয়া হয় না। হয়তো ছেলেটা কোনোদিন জানতেও পারে না যে তার মেধার কমতি কখনোই ছিল না। বরং সে হয়তো ক্লাসের আর দশটা ছেলেমেয়ের চেয়ে বেশি মেধাবী ছিল। কিন্তু সে পারে না। কারণ তার নাম তার পরিচয়কে ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছে এই সমাজে। সে চেনে কুদ্দুস নামের রিক্সাচালককে দারোয়ানকে হকারকে। তার নামও যেহেতু কুদ্দুস, তাই একই পেশার সাথে সে সংযুক্ত করে ফেলে নিজেকে, নিজের জীবনকে, নিজের স্বপ্নগুলোকে…।
রিকশা থামল। সুকৃতি ব্যাগ থেকে ভাড়া বের করে। ভাঙতি আরও ২০টাকা প্রয়োজন। রিক্সামামার কাছেও নেই। এমন খাঁ খাঁ রোদে কোত্থেকে খুঁজে পাবে ভাঙতি। সুকৃতি বলল, থাক মামা, রেখে দেন। রিক্সামামা খুশি হয়।
রিক্সা থেকে নামতে নামতে সুকৃতি কেন যেন জিজ্ঞেস করে, মামা, আপনার নামটা কি? রিক্সাচালক লজ্জা বোধ করেন। নাম বলতে এত লজ্জার কি আছে। তাকে কি কেউ কখনো নাম জিজ্ঞেস করে না?
মাথা নিচু করে রিক্সাচালক টাকা গোনার ভান করতে করতে উত্তর দেন, কুদ্দুস মিয়া।
