অসুস্থ বা মৃত মানুষদের দেখতে যাওয়ার ব্যাপারে আমি কার্পণ্য করি না। আমার কাছে কখনোই জীবনের অসুস্থতা বা সমাপ্তি আলাদা কিছু মনে হয় নি। মনে হয় এটাও জীবনের আরেক রূপ আরেক অধ্যায়। এটা হয়েছে আমার বাবা-মার কারণে। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, যে কেউ অসুস্থ হলে বা মারা গেলে বাবা-মা তাদের দেখতে যাওয়ার ব্যাপারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠতেন, হোক সেটা কাছের বা দূরের।
ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় ঈদের চাঁদরাতে বাবা আমাকে তার ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত ভাতিজিকে দেখতে নিয়ে গিয়েছিলেন। ক্লাস সিক্সে পড়া একটি মেয়ের কাছে চাঁদরাত অনেক কিছু। মেহেদী পড়বে না জামা গুছাবে না বান্ধবীদের সাথে আড্ডা দেবে। কিন্তু হুট করে যখন বাবা বলে উঠলেন, চলো, উনাকে গিয়ে দেখে আসি, আমি না করতে চাইলেও করতে পারলাম না। বকা খাওয়ার ভয়ে গেলাম। কিন্তু যাওয়ার পড়ে, ক্যান্সারে ছটফট করা সে নারীর পাশে বসে মনে হলো যেন জীবনের আরেক প্রান্তে চলে এলাম। ক্লাস সিক্সে পড়া সেদিন আমি খুব হলাম, এও জীবন? চাঁদরাতে যেখানে ঘরে ঘরে সবাই আনন্দ উৎসবে ব্যস্ত, সেখানে একটা ঘরে এরকম শোক ঘিরে থাকে?
আমার সেই আত্মীয় তখন ক্যান্সারের শেষ স্টেজে। হাসপাতাল ফিরিয়ে দিয়েছে। বয়সে তিনি ছিলেন আমার বাবার চেয়ে বড়। তবে তার কোনো সন্তান ছিল না। সকল সেবা শুশ্রূষা করছিলেন তার স্বামী। স্ত্রীকে প্রচণ্ড ভালবাসতেন তিনি। তো সেদিন সে মৃত্যুপথযাত্রীর খাটের এক কোণায় আমি বসেছিলাম। ভেবেছিলাম আমাকে খেয়াল করবেন না হয়তো। কিন্তু তিনি করলেন। হাত বাড়িয়ে আমার হাতটা ধরলেন। কাছে টেনে নিলেন। আমার গায়ে তার মমতাময় হাত বুলাতে লাগলেন। আমি তার চোখের দিকে সরাসরি তাকালাম। তার দৃষ্টিতে এত মায়া এত মমতা এত গভীরতা। সেখানে কোনো অভিযোগ কোনো ক্লান্তি কোনো কষ্টের ছাপ নেই। উল্টো, খুব শান্তিময় এক নীরবতা ছেয়ে আছে কেমন। তার সে গভীর নীরব দৃষ্টি আমাকে স্পর্শ করল। ক্লাস সিক্সে পড়া আমি কি দৃষ্টির নীরবতা বুঝি? বুঝি না। তবু বুঝে ফেললাম। আমি আর উঠতে চাইছিলাম না সেখান থেকে সেদিন। ঈদের কিছুদিন পরেই তিনি মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু প্রার্থনায় অনেক মানুষের নাম মনে করতে না পারলেও সেই মানুষটার নাম স্মরণ করতে কখনো ভুল হয় না।
কি অদ্ভুত না? হঠাৎ কিছু মুহূর্ত কেমন করে আমাদের স্পর্শ করে ফেলে?
এখন আমি বড় হয়েছি। ভার্সিটি পাশ করে চাকরি করছি। বাবাকে হারানোর শূন্যতা বয়ে বেড়াচ্ছি। জীবনকে আবিষ্কার করছি নানানভাবে নানা দিক দিয়ে। এর মধ্যে হঠাৎ আমাদের পাশের বাসায় নতুন ভাড়াটিয়া এলো। তাদের পরিবারের একটি মেয়ে ক্যান্সারে আক্রান্ত। মেয়েটা বাবা হারিয়েছেন প্রায় দু বছর আগে। এর পরপরই ক্যান্সার ধরা পড়ে। শেষ স্টেজে। মেয়েটি আমার বয়সী।
প্রতিবেশী সেই মেয়েটিকে দেখতে যাওয়ার সাহস আমার হলো না। আমি কীভাবে তার সামনে যাই? প্রভুর দয়ায় আমি সুস্থ আছি, হাঁটাচলা করছি। জীবনে হোঁচট খাচ্ছি, ধাক্কা খাচ্ছি, আবার উঠে দাঁড়াচ্ছি। দৌড়াচ্ছি। আমার ভেতর কত স্বপ্ন আশা আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু আমারই সমবয়সী একটি মেয়ের চোখে কেবল সমাপ্তি। সবকিছুর সমাপ্তি।
আমার মা তাকে দেখতে যায় বোনরা তাকে দেখতে যায়, কিন্তু আমি যেতে পারি না। মেয়েটার সামনে যেয়ে দাঁড়াতে পারি না। দূর থেকে প্রার্থনা করি। মনে হয়, ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ানোটা খুব স্বার্থপরের মতন দেখাবে। রোজ সকালে অফিসের যাবার সময় আমি তার দরজার সামনে দিয়ে যাই আর ভাবি, একটু বাইরে বের হতে ওর প্রাণটা কেমন ছটফট করে। সন্ধ্যায় ফিরে ওর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আমার বাসার কলিংবেল চাপতে থাকি আর প্রশ্ন করি, আজ সারাটা দিন ওর কেমন গেল? একই বিছানায়? বছরের পর বছর ধরে আবদ্ধ ঘরে একটা বিছানাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে রাখতে আর কত…?
প্রায়ই মেয়েটার চিৎকার শোনা যায় রাতে। পরিবারের সদস্যদের ওপর, বিশেষ করে তার বোনদের ওপর প্রচণ্ড জোরে চিল্লাচ্ছে। এত জোরে চিল্লানোর শব্দ হতো যে আমাদের বাসার সব দরজা জানালা বন্ধ করেও তা থামানো যায় না। একদিন রাত ১২টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত আমি ঘুমাতে পারি নি, তার চেঁচামেচির শব্দ। আশেপাশের দালানগুলোর মানুষ সে রাতে কীভাবে ঘুমিয়েছেন আমি জানি না। কিন্তু কেউ নালিশ করে না এই শোনার পর যে মেয়েটি ক্যান্সারের রোগী।
আমি মেয়েটির চেঁচামেচির ভেতরে খুব ভয় আর কষ্ট শুনতে পাই। মনে হয় মেয়েটা মৃত্যুকে খুব ভয় পাচ্ছে। মৃত্যুকে স্বীকার করতে চাইছে না। তার বোন আছে অনেকগুলো, ৭/৮জন। সবাই কাছাকাছি বয়সের। তারা সবাই সুস্থ স্বাভাবিক প্রাণোচ্ছল। যে স্বপ্নগুলোকে সেই মেয়েটি হারিয়ে ফেলেছে, তার বোনদের চোখে ভরপুর সে স্বপ্নগুলো কি তাকে আঘাত করে প্রতিনিয়ত? তার মধ্যে পরিবারের সব টাকা খরচ হয়ে গেছে তার চিকিৎসার পেছনে। সেই অপরাধবোধ অসহায়ত্ববোধ তো আছেই।
মেয়েটির রাগ ক্ষোভ আক্রোশের ভেতর আমি প্রচণ্ড কান্না শুনতে পাই। হয়তো সবাই পায়। তাই কেউ কিছু বলে না। আওয়াজে রাতে ঘুমাতে না পারলেও অভিযোগ করে না।
কিছুদিন আগে, এই জুন মাসে, মেয়েটির অবস্থা তীব্র খারাপ হতে শুরু করলে আমি এই প্রথম তার রুমে যাওয়ার সাহস করলাম। ভেবেছিলাম তার হয়তো চোখ দুটো বন্ধ থাকবে, সেন্স কাজ করবে না। আমি যে তার বয়সী কেউ বোঝার সুযোগ পাবে না। কে জানে, যদি যে ভাবে আমি তাকে করুণা করছি? মৃত্যুশয্যায় বলে আহ উহ করছি কিন্তু মনে ঠিকই শান্তি পাচ্ছি যে আমি কতটা বেঁচে আছি? আমার উপস্থিতি যদি তাকে এই কষ্টগুলো দেয় উল্টো? সে সুযোগ আমি তাকে দিতে চাই নি।
কিন্তু তা হলো না। মেয়েটির রুমে আমি গেলাম। গিয়ে দেখি সজাগ, বসে আছে। এক হাত ফুলে পচন ধরে আছে। বিছানা ভর্তি রক্ত। ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে রক্ত পড়ছে। রক্ত শুকিয়ে জামায় চাদরে লেগে আছে। তার মা বোনও রক্তাক্ত। এর মধ্যেই তাকে খাইয়ে দিচ্ছেন তারা।
তো আমি সেই রুমে গিয়ে হাজির হলাম। মেয়েটি আমার চোখের দিকে তাকালো। আমিও তাকালাম। সেই মুহূর্তে আমি অনুভব করলাম, মায়া দয়া নয়, কিছু সম্মান অন্তত আমি তাকে দিতে পারি। সম্মান প্রকাশ করতে পারি। আমি তাই করলাম। আমার সাথে আরও যারা রুমে ছিল তাদের বললাম, উনি তো খাচ্ছেন, উনাকে প্রাইভেসি দেয়া দরকার। আমরা বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করি বরং। আমাকে একজন বললেন, দেখো দেখো উনার হাতের ঐ পচনটার কি অবস্থা! আমার ভালো লাগল না। চিড়িয়াখানার জন্তু নাকি যে কোথায় কী হয়েছে খুঁটিয়ে দেখতে হবে? আমি দেখলাম না। আমি ক্ষতগুলোর দিকে তাকালাম না। দেখে আহ উহ করলাম না। আপনি সুস্থ হবেন, তা বলতেও পারলাম না। মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, জীবনের চেয়ে মৃত্যু অনেক সহজ, এটাও বলা সম্ভব না। আমি কিছুই বলতে পারলাম না। উনার এখন খাওয়া প্রয়োজন, এই বলে আমি সোজা হেঁটে চলে এলাম।
১৮/০৬/২০২৩
মেয়েটি মারা গেছে।
একদিন অফিস থেকে ফিরে তার বাসার সামনে দাঁড়াতেই আর প্রশ্ন জাগে নি, যে আজ তার দিনটা কেমন কাটল। তার মা আর বোনদের কান্না দেখেই বুঝেছি, সব শেষ।
প্রিয়জনকে হারানোর সমবেদনা কীভাবে জানাতে হয়, আমি জানি না। তবে মানুষের পাশে হাতটা ধরে থাকলে, মাথায় বা পিঠে একটু হাত রাখলে, মমতার স্পর্শটুকু দিলে, নীরবে, কষ্টের মাঝেও মানুষ সেটা খুব অনুভব করতে পারে। আমার বাবা যখন চলে যায়, তখন অনুভব করেছিলাম, এটুকুই অনেক কিছু। এর বেশি কিছু আমি করতে যাই না, করতে পারি না। তার ক্রন্দররত বোনদের পাশে শুধু বসে ছিলাম। তখন তার বোনটা কাঁদতে কাঁদতে বলল, আপু, ও হাসপাতালে বলেছিল আপনাদের কথা। বলছিল যে সেদিন আপুরা এসেছিল, কথা বলতে পারি নি। এবার বাসায় ফিরে আমি তাদের সাথে কথা বলব।
আমার চোখে পানি চলে এলো। একটা মানুষের শেষ ইচ্ছাদের মাঝে একটি ইচ্ছা ছিল যে সে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলে আমাদের সাথে কথা বলবে। সত্যি বলতে, আমারও খুব ইচ্ছে হতো ওর সাথে কথা বলতে। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে যে মানুষ থাকে, তার কথাগুলোর ভেতরে প্রাণের স্পর্শ অন্যরকম থাকে। তার সাথে কিছু মুহূর্ত কাটাতে পারলে জীবনকে আরেকটু অন্যভাবে দেখার বোঝার সুযোগ পেতাম। হয়তো ওর কাছেও জীবনের অন্য কিছু নিতে পারতাম, যেখানে করুণা বা মায়া দয়া নয়, কিছু বন্ধুত্ব থাকতো। সেটা আসলে সম্ভব ছিল না। আসলেই ছিল না।
ও আজ ওপারে আছে। অনেক ভালো আছে বলে আমার বিশ্বাস। ও ভালো থাকুক। যারা এই লেখাটা পড়ছেন, তাদের প্রার্থনায় থাকুক।

জীবন কঠিন