এটি শুধুমাত্র একটি গল্প। গল্প হচ্ছে মিথ্যা। এবং গল্প হচ্ছে মিথ্যার মধ্য দিয়ে বলা সত্য।
উম্মে হাবীবা সকাল সকাল ঘর থেকে বেরোয় সন্ধ্যায় কখন ফিরবে সে কথা মনে করতে করতে।
তার ঘর ছেড়ে বেরোতে ইচ্ছে করে না, বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু যখন সে ভাবে, এই তো আর কয়েক ঘন্টা, এরপরই তো ফিরবে। কাজ করে ঘরে এলে তার মা খুব খুশি হয়। সবার আগে তাকে ভাত বেড়ে খেতে দেয়। ঘরে ঢুকলেই তার তিন বছরের ছোট্ট ভাইটা এসে গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলবে, “বু! বু! প্যাসটিকের গাডি কিনে দিবি? লাল লাল!”
ছোট্ট ভাইটার আবদার শুনতেও এতো ভালো লাগে! উম্মে হাবীবা বারবার জিজ্ঞেস করে, “কোন গাড়িটা?
অমনি সে ছোট্ট তুলতুলে হাত দুটো মেলে চোখ রাঙিয়ে উত্তর দিবে, “লাল! লাল!”
এসব যখন ভাবে, উম্মে হাবীবার কাজে যেতে ইচ্ছে করে। কাজ করলেই হাতে টাকা আসে, ঘরে ভাত আসে, তার চোখে কিছু কিছু স্বপ্ন আসে।
উম্মে হাবীবার নিজেকে কখনোই তেমন গরিব মনে হয় নি। যদিও জন্ম থেকেই শুনে আসছে যে সে নিতান্তই গরিব। কারণ এক, সে বস্তিতে থাকে। দুই, সে ফাইভ পাশ করে নি। তিন, সে ফ্যাক্টরিতে খাটুনির কাজ করে।
কিন্তু ধনীদের সাথে কি তার খুব তফাৎ?
সে হয়তো টাকাটা একটু কম পায় । কিন্তু একটু কষ্ট করে জমালেই কিন্তু হয়ে যায়। উম্মে হাবীবা শুনেছে যে তার মা যে বাসায় কাজ করে, সে বাসার ম্যাম সাহেব এক একটা জামা পাঁচ হাজার টকা দিয়ে কেনেন। উম্মে হাবীবা মাস শেষে বেতন পায় পাঁচ হাজার টাকা। কিন্তু সে যদি প্রতি মাসে এক হাজার করে জমায়, তাহলে তার ম্যাম সাহেবের জামাটা কিনতে লাগবে পাঁচ মাস। পাঁচশো করে জমালে ১০মাস।
কিন্তু তারও প্রয়োজন নেই। তাদেরই বস্তির সুলতানা আপা যে-কোনো জামা দেখে একেবারে হুবহু সেটা বানিয়ে দিতে পারে ৫০০টাকার মধ্যে!
উম্মে হাবীবাদের বাসায় একটা স্মার্ট ফোন আছে, তার বড় ভাই সেটা কিনেছে। সেখানে সে মাঝে মাঝে ফেসবুক চালায়। সেও এমন একটা মোবাইল কিনতে চায়। সে দেখেছে, ধনীরা যে মোবাইল হাতে নিয়ে ঘুর ঘুর করে, তার ভাইও সেটাই গুলিস্থান থেকে কিনে এনেছে। এবং তার ভাইও ধনীদের মতন ফেসবুক টিকটক চালায়। সে ঐসব অনেক কিছু জানে।
সুতরাং উম্মে হাবীবার নিজেকে কখনই তেমন গরিব মনে হয় নি। সে প্রতিদিন সকালে উঠে অফিসে যায়, গোটা ফ্যাক্টরিটা তার অফিস, কত বড় অফিসে সে কাজ করে। অফিস থেকে ফেরার পথে সে বান্ধবীদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে ফেরে। রাতে এসে ভাত খায়। এরপর শান্তির ঘুম যায়। শুক্রবার সে মাঝে মাঝে সিনেমা দেখতে যায়। মাঝে মাঝে দল বেঁধে হাতিরঝিল চিড়িয়াখানায় যায়। এমন গোছানো জীবনকে উম্মে হাবীবার কখনো ধনীদের থেকে খুব বেশি আলাদা মনে হয় নি।
***
মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে সুরুজ মিয়া কে সিদ্ধান্তটা নিতে হয়।
৩০ সেকেন্ডে তার মস্তিষ্ক তাকে নতুন করে ভাবতে শেখায় না। ৩০ সেকেন্ডে তার হৃদয় তার বুকে টোকা দেয় না।
৩০ সেকেন্ডে তার দু হাত আর দু চোখ শুধু কথা বলে উঠে।
৩০ সেকেন্ডে সুরুজ মিয়া দেখতে পায়, যে এই ধোঁয়া নিভে যাবে, কিন্তু শ্রমিকগুলি সব হৈচৈ করে দুনিয়াটা মাথায় তুলবে। তাই কেঁচিগেট বন্ধ করে দিতে হবে। বড় সাহেব যে তার এই সুবুদ্ধি দেখে মোটা বখশিশ দেবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অনেক দিন পর এমন একটা সুযোগ পাওয়া গেল।
৩০ সেকেন্ডে সুরুজ মিয়ার চোখে বড় সাহেবের চেহারাটা ভেসে উঠে, সাথে কটা কচকচে নোট ভেসে উঠে।
৩০ সেকেন্ডে সুরুজ মিয়ার হাত তার চোখের কথা শুনে। সাথে সাথে তার দু হাত বাইরে থেকে কেঁচিগেটগুলো সব তালাবদ্ধ করে।
৩০ সেকেন্ডে সুরুজ মিয়ার বুক উত্তাল হয়ে উঠে আসন্ন নতুন টাকার গন্ধে!
**
জামিল যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরোলো, তার বাবা তাকে এলাকার বড় সাহেবের কাছে জোর করে ধরে নিয়ে এলো। বড় সাহেব নাকি তাদের কীরকম এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় হন।
জামিলের বাবা যথেষ্ট কাঁচুমাচু হয়ে অনুনয় বিনয় করে জামিলের জন্যে একটা চাকরি চাইল। জামিল তার বাবার পেছনে মাথা নত করে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
বড় সাহেব দু আঙুলের ইশারায় তাকে চাকরিটা দিয়ে দিলেন। এরপর থেকে জামিলের বাবা-মা বছরের পর বছর ধরে সেই যে বড় সাহেবের মহত্মের প্রশংসা করে আসছেন, সেটা কবর পর্যন্ত চলতে থাকবে।
চাকরি পাবার পর জামিল প্রথমে কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেলেও খুব দ্রুতই সব সহজ হয়ে এলো, বিশেষ করে যখন সবাই জানতে পারল যে জামিল বড় সাহেবের দূর সম্পর্কের আত্মীয়।
জামিল মাথা নত করে চাকরি পেয়েছিল, এবার মাথা উঁচু করে চাকরিতে তার নাম সুনাম আধিপত্য পেলো। কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে যে বিরাট ঘাটতি তার ছিল, সেটা পূরণ করার পুরো নিয়ে নিল কেয়ার টেকার সুরুজ মিয়া।
সুরুজ মিয়া এই ফ্যাক্টরিতে কাজ করে আসছেন ১৮ বছর যাবত। প্রথমে দারোয়ান হিসেবে চাকরি করলেও বর্তমানে উপরের লেভেলের কাজ থেকে একেবারে মাটির নিচের লেভেল – সব কিছু তার নখ দর্পনে। তার এই দক্ষতার জন্যে বড় সাহেব তার উপর বিশেষ ভরসা করেন, যা কোনো সেকেন্ড বা থার্ড ক্লাস কর্মচারির উপরও তিনি করেন না।
জামিলও ভরসা করতে শেখে সুরুজ মিয়ার উপরে।
যেদিন ফ্যাক্টরিতে হঠাৎ কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উঠতে শুরু করে নিচতলা থেকে, জামিল প্রথমেই সুরুজ মিয়ার খোঁজ করে।
“সুরুজ মিয়া, আগুন লাগল নাকি?”
“না স্যার, একটু ধোঁয়া বার হইছে, ইঞ্জিনে জ্যাম লাগছে মনে হয়”
“না না অনেক ধোঁয়া তো, তুমি সাইরেন চাপো”
“কি কন স্যার? সাইরেন চাপলে ব্যাগতে বার হই যাইব। আইজকা আর কামে আইব না। বড় সাহেব মেলা রাগ করব”
“তাই নাকি? স্যার কি নিষেধ করেছেন?”
“স্যার বলে দিছেন ১০ মিনিটের লাইগাও যেন কাম অফ না যায়। ফ্যাক্টুরির কোটি টাকার লোকসান হয় কাম বন্ধ অইলে। অহন ধোঁয়ার লাইগা হগলরে বাড়িত ফাঠায় দিলে কি হইব কন?”
“তাই নাকি। তাহলে তুমি ওদিকটা দেখো। ধোঁয়া নিভাইতে বল, আর বল কেউ যেন বাইর না হয়”
“আমি দেখতাসি স্যার, আপনে বাইরে গিয়া খাড়ান। আপনাগো জন্যে ধোঁয়া ভালো জিনিস না। শ্যাষে অসুখ করব”
সুরুজ মিয়ার দায়িত্ব জ্ঞানে জামিল বরাবরেই মতোই মুগ্ধ হয়। সে বাইরে বেরিয়ে আসে। ইতিমধ্যেই কিছুটা ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেছে। জামিল জোরে জোরে ধ্মক দিতে দিতে বের হয় , “অ্যাই! অ্যাই! এই এত ছোটার কি আছে? কাজে যাও! এক্ষুনি! ফাঁকিবাজ যত্তসব!”
****
সুরুজ মিয়া জামিলের শিশুতোষ আচরণ দেখে অবাক হন না। দুনিয়ার সম্পর্কে যে এই ছেলের বিন্দুমাত্র কোন জ্ঞান নেই তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শ্রমিকদের বললেই হবে, কাম ছাইড়া বাইর হও? হেহ!
সুরুজ মিয়ার মতে, শ্রমিকরা কাজে ফাঁকি দেয়ার পথ খুঁজবেই। ধোঁয়াকে স্রেফ উছিলা বানিয়ে যার যার বাড়িতে চলে যাবে। আর কারখানায় একটু ধোঁয়া দেখলেই সাংবাদিকদের মাথা গরম হয়ে যায়। সব ভিড় করে রিপোর্ট করা শুরু করবে।
সুতরাং যেভাবে কাজটা করতে হবে তা হচ্ছে আগে বাইরের গেটগুলো সব বন্ধ করে দেয়া। বের হতে না পারলে হৈচৈ করার সুযোগও পাবে না। যেভাবেই হোক, ফ্যাক্টরি ১০ মিনিটের জন্যেও বন্ধ রাখা যাবে না। এবং এই পুরো জিনিসটা যে সুরুজ মিয়া নিজ হাতে সামাল দিয়েছে তা বুঝতে বড় সাহেবের বাকি থাকবে না।
সুরুজ মিয়া খুশি মনে হাত চুলকাতে থাকে। হাত চুলকালে নাকি বেশি বেশি টাকা আসে।
**
উম্মে হাবীবা কিছুক্ষণ ধরেই কেমন পোড়া পোড়া গন্ধ পায়। কাউকে কিছু বলে নি। কিন্তু কখন যে গন্ধটা এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। জানালা দিয়ে ধোঁয়া ধোঁয়া দেখা যায়। কয়েকজন এদিকে ওদিকে ছুটোছুটি করছে। বাকিরা দেখছে। কেউই ঠিক বুঝতে পারছে না। কিন্তু মেশিন তো চলছে, সব তো ঠিকই দেখা যাচ্ছে।
এর মধ্যে কেউ একজন বলে ইঞ্জিনের আগুন, কেউ বলে জেনারেটরের আগুন। কেউ কেউ শোনে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেয়া হয়েছে, এখুনি আসছে।
ফ্যাক্টরিতে এরকম মাসে দু চারবার হয়ই। তাই সবাই তেমন মাথা ঘামায় না।
কিন্তু হঠাৎ – যেন চোখের পলকে কীভাবে একটা ভয় বাতাসের চেয়েও দ্রুত সবার সচেতন মনে একসাথে ছড়িয়ে পড়ে – কেউ কাউকে বলবার আগেই – যে এই আগুন সেই আগুন নয়।
মুহুর্তেই রুমে ছুটোছুটি শুরু হয়। ফ্লোরের প্রায় ৮০জন সিঁড়ির কাছে ছুটে যায়। উম্মে হাবীবাও যায়। তার মধ্যে ভয় চিন্তা কোনোকিছুই কাজ করে না। সে শুধু জানে এখন ছুটতে হবে!
কিন্তু কেচিগেট বন্ধ! ফ্লোর থেকে বের হবার উপায় নেই। কি অদ্ভুত! কেউ কি জোর করে তাদেরকে খুন করতে চাইছে নাকি? এ কেমন নাটক? ৮০ জনের তো শত্রু থাকতে পারে না! কী হচ্ছে? কেন হচ্ছে?
উম্মে হাবীবার মন মস্তিষ্কে চিন্তার উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তাদের ফ্লোরে ধোঁয়া এখনো সেভাবে আসা শুরু হয় নি। তবে ধোঁয়া বাড়ছে। সবাই চিৎকার চেঁচামেচি করে কাঁদছে হাঁ হুতাশ করছে, কিন্তু উম্মে হাবীবা যেন বধির হয় যায়। সে কিছু শুনতে পায় না।
মৃত্যুর চিন্তা উম্মে হাবীবার প্রথমে মনে আসে না।
কিন্তু তার মনে হয় যে নতুন একটা জামা বানাতে দেয়া হয়েছিল সুলতানা আপার কাছে। সুলতানা আপা দর্জির কাজ করে। খুব সুন্দর জামা বানায়। উম্মে হাবীবার খুব শখ ছিল একটা পাতার মতো সবুজ জামা পড়ার। দুমাসের টাকা জমিয়ে সে কাপড়টা কিনেছে। আজকে ফেরার সময় জামাটা আনার কথা ছিল…
উম্মে হাবীবার মনে পড়ে সে ৫ মাস পর একটা মোবাইল কিনত। যে মোবাইলে নিজের ছবি নিজে তোলা যায়…
এবং কীভাবে যেন উম্মে হাবীবা হঠাৎ লক্ষ্য করে যে আসলে সে ধনীদের মতন ফোন জামাকাপড় কিনলেও সে কোনোদিন ধনী হতে পারবে না।
সে শ্রমিক। সে শ্রমিক দেখেই তাকে আগুনের মুখে আটকে রাখা হয়েছে। কোনো ধনীকে আগুনের মুখে এভাবে আটকে রাখা হয় না কখনো।
এই প্রথমবার উম্মে হাবীবার নিজেকে খুব গরিব ব মনে হয়। মনে হয় তার কোনো পরিচয় নেই, কোনো অস্তিত্ব নেই, কোনো জীবন নেই, কোনো পৃথিবী নেই। এই পৃথিবীটা আসলে তার মতন গরীবদের জন্যে না।
সে পুড়ে গেলে কারো কোনো যায় আসে না। তার শখগুলো সব বাকি রয়ে গেলে কারো যায় আসে না। সে আজ ঘরে ফিরতে না পারলে তার মা-বাবা ছোট ভাইটার মুখে ভাত না উঠালেও কারো কিছুই যায় আসে না।
এমন সময় উম্মে হাবীবার বুকটা ছ্যাৎ করে উঠে! আমার ছোট ভাইটা! আমার আদরের মনাটা! আমাগো! আব্বাগোওওও বলে উম্মে হাবীবা বুক ফেটে আর্তনাদ করে উঠে!
উম্মে হাবীবা যেন অন্ধ বধির হয়ে যায়। তার সমগ্র অস্তিত্বকে পোড়াতে থাকে প্রিয়জনদের রেখে চলে যাবার বেদনা। অন্যায়ের বেদনা। অবিচারের বেদনা। পুড়ে ছাই হয়ে মিলিয়ে যাবার বেদনা।
উম্মে হাবীবা তার ভাইকে বারবার ডাকে! আমার ছোট মনা! আমার ছোট মনা! তোরে গাড়ি দিমু আয়! আমার বুকে আয় আমার মনাডা!
হঠাৎ সহকর্মী জেসমিন উম্মে হাবীবার হাতে সজোরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে চিৎকার করে, “হাবীবারে তোর নামডা ল্যাখ! ঐখানে ল্যাখ ঐখানে! শামসু ভাইয়ে আমগো নাম ঢিল মারব বাইরে! হেরা আমাগো লাশ খুঁজতে আইব! দাফন দিবো! জলদি নামডা ল্যাখ!”
উম্মে হাবীবা চিৎকার থামিয়ে জেসমিনের দিকে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ। এরপর হঠাৎ সে যেন কি বুঝতে পারে। সে ছুটে যায় ভিড় ঠেলে।
উম্মে হাবীবা সর্বশক্তি দিয়ে নামটা কাগজে লেখে, ২৭ নাম্বার সিরিয়ালে। সে মন প্রাণ দিয়ে লেখে। নামটা লেখার সময় উম্মে হাবীবার মনে হয় এই নামটা সাক্ষী, সে ছাই না, সে মানুষ। রক্ত মাংসে গড়া মানুষ – যার স্বজন আছে, ঘর আছে, স্বপ্ন আছে , ভালোবাসা আছে।
সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছে কিন্তু তার নামটা রেখে যাচ্ছে। এই পৃথিবী সাক্ষী এই আগুন সাক্ষী এই মৃত্যু সাক্ষী – উম্মে হাবীবা এখানে ছিল, এই পৃথিবীতে ছিল। ছাই হয় নয়, মানুষ হয়ে। জ্বলজ্যান্ত মানুষ হয়ে।
উম্মে হাবীবার নাম লেখা শেষ হতে হতে ধোঁয়া অনেকটা ফ্লোরের ভেতরে প্রবেশ করে। শামসু ভাই দ্রুত কাগজটা ছিনিয়ে আরেকজনের নাম লিখতে থাকেন, এরপর স্যান্ডেলের সাথে কাগজটা বেঁধে সজোরে বাইরে ঢিল মারেন।
এর ভেতর ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় সব। উম্মে হাবীবা জেসমিনকে জড়িয়ে ধরে। সাথে যোগ দেয় নাসিমা। যোগ দেয় পারভিন। যোগ দেয় রহিমা। যোগ দেয় আসমা।
যোগ দেয় বাকিরা।
.
পরদিন…
উম্মে হাবীবার লাশ খুঁজে পাওয়া যায় না। তার পরিবার পথে বসে আহাজারি করে। সে আহাজারি টিভি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার পর্দায় সম্প্রচার করা হয়। সেখানে দেখা যায় ৩/৪ বছরের একটা ফুটফুটে শিশু আহাজারিরত মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছে, বু! বু! গাড়ি! গাড়ি!
ওদিকে সুরুজ মিয়া তার গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। বড় সাহেবের সাথে এর মধ্যে মোবাইলে কথা হয়েছে। বড় সাহেব তাকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হলে কাজে ফিরতে। তাদের ফোনালাপের কিছু অংশঃ
“মরল তো মরল, আমারে বিপদে ঠেললো! এরাই আগুন লাগায়া মরে, দোষ যত মালিকের!”
“একদম ঠিক কইছেন ছ্যার! হেরাই আগুন লাগায় আপনেরে ফাসাইছে!”
জামিল তার বাবার সাথে গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। বড় সাহেবই তাদেরকে আদেশ করেছেন সব ঠান্ডা না হওয়া পর্যন্ত গা ঢাকা দিতে। নাহলে কখন কে কোন বেফাঁস কথা বলে তাকে বিপদে ফেলে তার তো কোনো ঠিক নেই।
বড় সাহেব প্রেস নিয়ে প্রচুর ব্যস্ত। তার এসিসট্যান্ট ও উকিল তার চেয়েও বেশি ব্যস্ত।
ওদিকে তার ছেলে মনটানা থেকে ফোন দেয়,
“Dad, you sound worried. What happened?”
“A fire broke down in my factory today, it was an accident”
“Oh no! I’m so sorry dad! Will you be alright?”
“On no problem. The insurance has it covered.”
“OH THANK GOD!! Stay safe, Dad!”
বড় সাহেব বড় ছেলের সাথে কথা বলে স্বস্তি পান। তার স্ত্রী যে ছোটবেলা থেকেই তাকে বিদেশীদের স্কুলে পাঠিয়েছেন, এজন্যে তাকে মনে মনে আন্তরিক ধন্যবাদ দেন। তার বাকি দুই ছেলে আর মেয়েটাকে স্কুলের গন্ডি পার হবার আগেই আমেরিকা পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। প্রয়োজন হলে তার স্ত্রীকেও পাঠিয়ে দেবেন তাদের সাথে।
তার চোখ মুখে বিরক্তির ভাব অনেকটা কমে আসে। তিনি আবার অফিসে ফিরে যান।








[আরও শত শত আছে। কত দিব?]
