বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তির প্রক্রিয়া ও অসততার বীজ বপন

ডিসেম্বর, ২০২২

গতকাল আমার একজন পরিচিত ভাই আমার বোনকে ফোন দিলেন। তার মেয়ের স্কুলে ভর্তির জন্যে। রাজধানীর সুনামধন্য এক স্কুলে তার ছোট্ট ফুটফুটে মেয়ের নামটা লটারিতে আসে নি। তাই এখন যত টাকাই লাগুক, তিনি প্রভাবশালী লোক খুঁজছেন সেই স্কুলে ভর্তি করানোর জন্যে।
আমার বোন একটু সরল সোজা। সরাসরি বলে দিলেন, এটা ঠিক না। আমার সেই ভাই বেশ রাগ করলেন। তিনি আমাদের আত্মীয়। তার বয়স বেশি নয়, ৩৬/৩৭ হবে। নতুন সংসার। নতুন সবকিছু।


তাকে কখনো খুব অসৎ কেউ বলে কখনো মনে হয় নি। তিনি একটি মাল্টিন্যাশনালে বেশ মোটা বেতনের চাকরি করেন। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনরাত পরিশ্রম করেন। তারই পরিচিত, এবং আমাদেরও পরিচিত, আরেকজনের দু মেয়েকে সেই স্কুলে লবিং করে ঢুকানো হয়েছে। যারা এই কাজটা করেছেন তারাও তেমন “অসৎ” মানুষ হিসেবে পরিচিত নন। তারা স্বামী স্ত্রী দুজনেই ব্যাংকে চাকরি করে। এখন দুই মেয়েকে ভিন্ন ভিন্ন দুই স্কুলে দিলে যাতায়াত কঠিন হয়। তাই লবিং করে ছোটটাকেও বড়টার সাথে সে স্কুলে দিয়েছেন।

কিন্তু এই কাজটা অসৎ। নিঃসন্দেহে অসৎ। তাদের পাপ পুণ্যের হিসেব নিতে যাচ্ছি না, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী ক্ষতিটা তারা দেখতে পাচ্ছেন না।
তারা দেখতে পাচ্ছেন না যে তাদের ফুটফুটে সন্তানদের জীবনের অনেক বড় একটা ধাপ শুরু করছেন অসততা দিয়ে। মিথ্যা দিয়ে।

এই ফুটফুটে শিশুদের মনে ঠিকই গেঁথে যাবে সত্যটা। যে তাদের লবিং করে ভর্তি করানো হয়েছে। তাদের যেটা প্রাপ্য নয় সেটা তাদেরকে দেয়া হয়েছে। যাদের সেখানে থাকার অধিকার ছিল, তাদেরকে বাদ দিয়ে তাদের জায়গা করে দেয়া হয়েছে অন্যায়ভাবে।

এই কথাগুলো শিশুমন এখন বুঝবে না। তবে তাদের অবচেতন মন পুষে রাখবে।

যখন তারা বড় হবে, তাদের অবচেতন মন এইটুকু স্মৃতি তাদের মনে করিয়ে দিবে। যে সে যেখানে আছে, সেখানে থাকার যোগ্যতা বা অধিকার তার নেই। সে অন্যায়ভাবে আছে। এবং এই অন্যায়বোধটা তাকে পীড়া দেবে যন্ত্রণা দেবে। তখন সে স্মরণ করবে তার বাবা-মাকে। যে তার বাবা-মা তাকে শিখিয়েছিল যে অসদুপায় অবলম্বন করে অনেককিছুই জীবনে ঠিক করে ফেলা যায়। তাই তারা তাদের জীবনের কিছু হিসাব নিকেশ অসদুপায় অবলম্বন করে মিলাতে দ্বিধা বোধ করবে না।

তাদের নৈতিকতায় ফাটল ধরবে। সৎ সাহসটা মনে আর আসবে না।

হয়তো তারা অনেক কিছুই জীবনে পাবে, অনেক কিছুই পাবার ভান ধরে থাকবে। কিন্তু শিক্ষা জীবনের শুরুটা যে অসুদপায়ে ছিল – এই সত্যটা থেকে সে কোনোদিন মুক্ত হতে পারবে না।

আমরা যেন আমাদের কিছু সুবিধার জন্যে বা লোক দেখানোর জন্যে আমাদের ফুটফুটে শিশুদের জীবনে এরকম অভিশাপ যোগ না করি, যা তাকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হবে…।

নৈতকতা অনেক বড় একটা সম্পদ। জিপিএ ফাইভের চেয়েও আমরা সৎ ভালো মানুষকে সন্তান হিসেবে চাই, যে বাবা-মাকে মন থেকে অনুভব করবে। অনেক ধনী বা রূপবতী পার্টনারের চেয়েও আমরা সৎ ভালো মানুষ চাই, যে মানুষকে সম্মান করতে জানে, ভালোবাসার শক্তি যার ভেতরে আছে। অফিসে আমরা এমন লোকবল চাই যারা মন দিয়ে কাজ করেন, কাজে ফাঁকি দেন না। বন্ধু হিসেবে আমরা এমন মানুষ চাই না যে যার টাকার গরিমা বা গ্ল্যামার দেখে লোকে হাততালি দিবে। বরং বন্ধু হিসেবে আমরা তাকেই চাই যে দুটো কথা শুনবে, পাশে থাকবে।

খেয়াল করবেন, জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রেই আমরা আসলে সৎ ভালো মানুষ চাই। কারণ সততা না থাকলে একটা মানুষের যাই-ই থাকুক – যতই ক্ষমতা খ্যাতি অর্থ সম্পদ রূপ থাকুক – সে মানুষটা আপনার সাথে প্রতারণা করবে, আপনাকে ঠকাবে। আপনি কষ্ট পাবেন।

তো কেন আমরা আমাদের সন্তানদের নৈতিক শক্তিটাকে তার জীবনের প্রথম ধাপেই ভেঙেচুড়ে দিব?
আমরা কেউই আমাদের সন্তানদের কাছ থেকে কষ্ট পেতে চাই না। তাই কষ্ট পাবার উপায়টা যেন অবলম্বন না করি।

***অনেকেই আমার লেখা এখানে পড়ে থাকতে পারেন যাদেরকে ছোটবেলায় লবিং করে অন্যায়ভাবে স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছিল। তাদের বলব, দোষ তো আসলে আপনার নয়। আপনি পরিস্থিতির শিকার মাত্র। তবে এই ব্যাপারটাকে তেমন বড় কিছু মনে না হলেও, আমাদের অবচেতনে এই ব্যাপারগুলো গেঁথে যায় যা আমাদের অনেকভাবে প্রভাবিত করে, কিন্তু আমরা টের পাই না।
তো এই নেতিবাচক স্মৃতি থেকে নিজেকের মুক্ত করার একটি উপায় হচ্ছে মেডিটেশন। আপনি মেডিটেশন চর্চা করে আপনার মনের জগতকে নতুন করে সাজাতে পারেন।
আমি কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে মেডিটেশন চর্চা করি। আপনি যেখানেই চর্চা করুন না কেন, অনুরোধ করব, হুটহাট করে ইউটিউবে বা কোনো অ্যাপের মাধ্যমে মেডিটেশন না করে কোনো গুরু বা মেডিটেশন মাস্টারের কাছে দীক্ষিত হবেন। তাহলে সেটা বেশি কাজে দিবে, এবং ফলটা স্থায়ী হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *