১৯৭৫সালের দিকের ঘটনা। একজন যুবক। বাড়ি নরসিংদী। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে চাকরি পেয়েছেন। চাকরির টাকায় মোটরসাইকেল কিনেছেন। তাকে আর পায় কে?
সবচেয়ে ট্রেন্ডি হেয়ারকাট – ঘাড় পর্যন্ত লম্বা চুল রেখে, বাইকের পেছনের বন্ধুদের বসিয়ে, চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে, ঠোঁটে সিগারেট ধরিয়ে সারা শহর টই টই করে উড়ে বেড়াচ্ছেন।
একদিন এক বন্ধুকে নিয়ে বাইকে কোথায় যাচ্ছেন, দেখলেন একটা ফার্নিচারের দোকান, নাম “বাবলী ফার্নিচার”। তিনি বন্ধুকে বললেন, এই নামটা তো বেশ স্টাইলিশ! আমার মেয়ে হলে আমি বাবলী নাম রাখব।
এর কিছুদিন পড়ে সে যুবক নরসিংদীতে তার মামার বাড়ি বেড়াতে যান। দূর থেকে দেখেন এক সুন্দর যুবতী, উঠানে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। এই সুন্দরীকে তো আগে কখনো দেখেন নি। এই মেয়েটি কে?
এই সময় তার বড় বোন শিরিন কাছে দিয়ে যাচ্ছিলেন।
বোনকে ডাকলেন, এই মেয়েটা কে রে?
বোন বললেন, এ তো মামার অমুক অমুকের মেয়ে
যুবক বললেন, হুম, শোন, আমি একটু নাটক করি, তুই তাল দিস।
বোন বিরক্ত, ভাইজান কি কও এইসব? এইখানে এখন কি করবা?
চুপ থাক! তুই তাল দে যা।
যুবক দ্রুত বন্ধুর কাছ থেকে একটা স্যুটকেস আর একটা ওভারকোট জোগাড় করে আবার আসলেন,
“শিরিন! এই শিরিন!!”
সেই সুন্দরী যুবতী দৌড়ে আসলো, “জি? কাকে চান?”
“এই মেয়ে!! কাকে চাই মানে?? চিনো না আমি কে??”
“জি না”
“এই মেয়ে?? আমি এইমাত্র লন্ডন থেকে আসলাম! আমার নাম শোনোনাই এর আগে? বাবার নাম কি তোমার?”
সুন্দরী মেয়ে কাঁদো কাঁদো। এমন সময় শিরিন আসে।
“শিরিন, বল তো আমি কে? আমাকে নাকি চিনে না!”
শিরিন বললেন, “হ্যাঁ উনি তো বিলাত থেকে আসছেন আজকে, আয়হায় তুমি চিনো না উনাকে?”
সুন্দরী মেয়ে এবার আসলেই কেঁদে দিবে, “মাফ করবেন, আমি তো চিনতে পারি নাই। স্লামালিকুম…”
এই নাটক চলল কিছুক্ষণ। সুন্দরী মেয়ে নাকানি চুবানি খেলেন। যুবকের দেখে বড় ভালো লাগল।
যুবক তার বাড়ি ফিরে বাবাকে বললেন, “আমি মামা বাড়ির অমুক মেয়ে বিয়া করব”
তার বাবা খুবই রাগ এবং বিরক্তি দেখালেন, কি বলে বদমাইশটা! কিন্তু ঠিকই খুশি মনে দ্রুত বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলেন।
এক সপ্তাহের মাথায় তাদের বিয়ে হয়ে গেল। যুবতী সেই “বিলাত ফেরত” যুবককে দেখে হতভম্ব হয়ে গেলেন। তার ছোটবোন অবশ্য নড়ে বসল, এই দুষ্টু ব্যাটাকে জীবনেও দুলাভাই ডাকবে না। দুলাভাই না ডাকার কারণে বাবার হাতে ধোলাই ও খেলেন।
তো কয়েক বছর পরে সেই যুবক যুবতী ঢাকায় পাড়ি জমালেন। ছোট্ট একটা ঘর ভাড়া করলেন। তাদের ঘরে ফুটফুটে কন্যা সন্তান এলো। সেই যুবক কন্যার নাম রাখলেন – বাবলী।
এবং সেই যুবকটি আমার বাবা। সেই সুন্দরী যুবতী আমার মা।
আর বাবলী আমার বড় বোনের নাম। তার পরের বছর জন্ম হলো আমার মেজো বোনের। এবং তারও অনেক অনেক পরে, ১২ বছর পরে, এলাম আমি।
✿✿✿
দু বছর হবে, অথচ মনে হচ্ছে এই তো মাত্র কয়েকদিন আগে, বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছি আমরা।
আমার বাবা-মা আগেকার দিনের মানুষ। প্যারেন্টিং নিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ তাদের হয় নি। কিন্তু তারপরও কি এক মায়ার চাদরে আগলে রাখলেন তিন সন্তানকে।
আমার বাবা ভর্তি হয়েছিলেন মাত্র এক দিনের জন্যে, হার্টের কিছু টেস্ট করাতে। কিন্তু আমরা তিনজনই হাসপাতালে হাজির, সাথে দুই ভাগ্নে। পরিবারের কেউ হাসপাতালে থাকবে আর আমরা সবাই থাকব না, এটা চিন্তার বাইরে।
হাসপাতালে বেশি মানুষ ঢোকার নিয়ম নেই, তাই অর্ধেক সদস্য ক্যাফেটেরিয়ায় বসে থাকল। পালা করে করে হসপিটালের বেডে সময় দিলাম।
আমার ফোনে যেদিন বাবার অসুস্থতার খবর এলো, বাবা চলে যাওয়ার দিন, ভেবেছিলাম আইসিউতে বোধয় রাখা হবে। পরনে যেই জামাটা আছে এটা সুতির, পরে থাকা যাবে, অসুবিধা হবে না। সারাটা রাত হাসপাতালে কাটিয়ে দিব। বোনদেরও একই প্রস্তুতি। বাবাকে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আর মনে মনে সবাই হিসেব করছি বাসায় সব তালা দিয়ে হাসপাতালে থাকতে হবে, ঘরে বাবুদেরকে একসাথে রেখে আসতে হবে, খাওয়ার ব্যবস্থা করে আসতে হবে ইত্যাদি।
সে রাতে হাসপাতালে থাকা আর হলো না। ফিরে এলাম একেবারে।
মাঝে মাঝে ভাবি, আমাদের মধ্যে যে স্নেহ যে দরদ আমার বাবা-মা জাগ্রত করতে পেরেছেন, এটা পুরোটুকুই তাদের কৃতিত্ব। আমার সন্তান হলে আমার পরিবার হলে আমি কি এতটা পারব? এতটা কি ফিল করাতে পারব? আশেপাশে যত দেখি, আমার ভয় বেড়ে যায়। মমতার এত অভাব, কোন যুগে প্রবেশ করছি আমরা?
বাবা সেদিন হাসপাতালে। আমি সকালে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে গেলাম। যাওয়ার সময় মনে হলো, মা-বোন বসে আছে, তাদের জন্যে একটু বাড়তি খাবার নিয়ে যাই। হাসপাতালে (ইউনাইটেডের) স্ন্যাক্স একেবারেই বাজে এবং খুব কম আইটেম। মা ফোনে বললেন টক ঝালা খেতে ইচ্ছে হচ্ছে। আমি পথেই পেয়ারা আমড়া মিক্স ভর্তা পেয়ে গেলাম, সাথে আরও কিছু বিস্কিট চিপস কফি নিয়ে নিলাম।
বাবার কেবিনে ঢুকতেই দেখি সেই এক্সাইটেড! এক্সাইটেড কেন? কারণ হাসপাতাল থেকে মজার বিস্কিট দিয়েছে! এবং আসার সময় তিনি বেছে বেছে তার প্রিয় বিস্কিটগুলো এনেছেন, এখন বাধ্য করছেন খেতে হবে! তার এক্সাইট্মেন্ট দেখে না খেয়ে উপায় নেই। আমি শুকনো মুখে তার ডায়বেটিসের বিস্কিট গিলতে লাগলাম। যত গিলি ততই খুশি হন তিনি।
তাকে দেখে মনে হলো হাসপাতালে না, পিকনিক স্পটে বসে আছেন। আমরা সবাই আশেপাশে মজা করে খাচ্ছি, টিভি চলছে এবং সেই খুশি! বিকেলে বাবুরা (আমার দুই ভাগ্নে, সাহাফ ও সুহাইল) আসবে, তাদের জন্যেও ডায়বেটিসের অতি মজা বিস্কিট আলাদা করে রেখে দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে আমার বাবা ঠিক করে ফেলেছেন কোন নার্সটা ভালো, তাকে কত বেশি বখশিশ দিবেন, কোন ক্লিনারটা ভদ্র, তাকে কত বখশিশ ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের সাথে এর মধ্যে গল্পও হয়ে গেছে, মা তোমার বাড়ি কই? বাবা তুমি কবে ঢাকা আসছ? এর আগে কোথায় ছিলা? কই পড়াশোনা করছ?
অচেনা মানুষকে এতসব প্রশ্ন করলে আমি কাঁচুমাচু করতে থাকি। আমার বাবা ততটাই উৎসাহে বলেন, দেখছ? ওর বাড়ি কোনখানে?
আমি অসহায় হয়ে মাথা নাড়ি, তাদের দিকে তাকিয়ে একটা দুর্বল হাসি দেই।
এরপর আমার বাবা গল্প জুড়ে নেন। তারা আমার বাবার ভিক্টিম হয়ে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। প্রথমে তাদের মুখে আনন্দের আভা থাকলেও সেটা দ্রুতই মিলিয়ে যায়। বুড়ো মানুষকে কীভাবে থামিয়ে কেটে পড়া যায় এই নিয়ে কঠিনভাবে চিন্তা করতে থাকেন। লাভ হয় না। যতক্ষণ না আমার মা এসে ঝাড়ি দেন, অনেক হইসে! এবার থামো! মানুষের আর কাজ কাম নাই?
আমার বাবা খুবই ত্যাক্ত বিরক্ত হন। কিন্তু কিছু বলেন না, কারণ মার যুক্তিটা ঠিক আছে। তবু বিরক্ত হন। চেহারায় স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ নিয়ে গোমড়া মুখে বসে থাকেন। বেশ কিউট লাগে। আমরা বোনরা একসাথে থাকলে বাবার এই কিউট চেহারা দেখে চোখাচোখি করে হাসি।
ওদিকে আমার মাও বাবার বিরক্ত চেহারা দেখে আরও দ্বিগুণ বিরক্তি নিয়ে থাকেন। সেটাও কিউট।
আমার মার চেহারায় সেই বিরক্তির কিউটনেসটা সারাজীবনের জন্যে মিলিয়ে গেছে। তিনি আর “কিউটভাবে” কারো উপর বিরক্ত হন না। বিরক্তি যদি এসেও যায় সেটা হবে সত্যিকারের বিরক্তি, সে বিরক্তিতে তিক্ততা থাকবে। বাবার উপর তার মাঝে সাঝে যে বিরক্তিটুকু ছিল, সেটাতে যে কতটা মমতা মেশানো ছিল, কত মমতা মিশিয়ে যে রাগ করা যায়, ঝাড়ি দেওয়া যায়…এটা বোধয় জীবনে একজনকেই যায়।
রাগ ঝাড়ি অবশ্যই ভালো না, তবে কিছু কিছু রাগে, অভিমানে, অভিযোগে অনেক মমতা মেশানো থাকে, ভালবাসা মেশানো থাকে…।
.
✿✿✿
একজন মানুষ নাকি আমাদের পৃথিবীতে ততক্ষণ জীবিত থাকে যতক্ষণ তাকে মনের রাখা হয়। কাউকে ভুলে যাওয়া মানেই আমাদের জগতে তাদের মৃত্যু।
আর যখন কেউ মৃত্যুর ওপারে চলে যাওয়ার পরও সবসময় মনে হয় সে জীবিত আছে, এত বাস্তব এত জীবিত যে জোর করে মনে রাখার প্রশ্নও আসে না, তখন?
যেমন, বাবা যে চলে গেছেন এই কথাটাই আমি ভুলে যাই একেবারে। আমি ঘুমের ভেতরেও ভুলে যাই, স্বপ্নের ভেতরেও ভুলে যাই। প্রায় রোজই স্বপ্নে দেখি বাবাকে। খুব স্বাভাবিক কথা হয়, তিনি এখন ঘরে থাকলেই যেমন হতো। এবং আমি এই ব্যাপারটাকে এভাবেই রেখে দিয়েছি। যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন যদি এভাবে চলে, তবে খুব ভালো। যেদিন এভাবে চলা থেমে যাবে, সেদিন খুব ভয় পাবো, বাবাকে হারিয়ে ফেলার ভয়? আমি জানি না। আমার এখনই ভয় হয়। আমি আর বাঁচব কতদিন? আন্দাজে যদি বলি, ১০ বছর? ২০ বছর? ৫০ বছর? এতগুলো বছরের সাথে সাথে বাবার স্মৃতি মুছে যাবে নাতো? সেই ভয় হয় আমার।
যারা বাবা-মা হারিয়েছেন তাদের সাথে কথা বলার সময় কিছু প্রশ্ন জাগে আমার মনে। আমি এই প্রশ্নগুলো তুলতে পারি না। কারণ প্রশ্নগুলো এত নির্মম বাস্তবতার দিকে তাক করে, তাদের জিজ্ঞেস করলে তারা আঘাত পাবেনই, সেই আঘাতগুলো দিতে পারি না। যেমন, আপনার কি ভয় হয় মাঝে মাঝে এটা ভেবে যে ওপারে গেলেও যদি দেখা না হয় আর? যদি আর কোনোদিনই দেখা না হয়? বা, ওপারে গিয়ে যদি আমরা একে অপরকে ভুলে যাই? যদি আপনার মা/বাবা আপনাকে চিনতে না পারেন?
এত কঠিন প্রশ্ন কীভাবে করব মানুষকে?
বাবাকে হারানোর পরপরই আমি এটা ভেবে ভয় পেতাম, যে যদি একদিন ঘুম থেকে উঠে ভুলে যাই আব্বু আর নেই, এবং আব্বু বলে ডাক দেই, এবং সাড়া না মিলে, এবং সেদিন যদি নতুন করে আব্বুর মৃত্যুর সম্মুখীন হতে হয় আমার, আবার, আমি কীভাবে সেদিন বাঁচব? এরকম কতগুলো সকাল আসবে আমার জীবনে?
আজ প্রায় ৭ মাস হতে চলল। আজকে আমার কাছে এই ভয়ের উত্তরটা আছে। আমি ইদানীং প্রায়ই ঘুম থেকে উঠে ভাবি বাবা বেঁচে আছেন। পাশের রুমেই হাঁটাহাঁটি করছেন। আমার রুমে এসে বারান্দার দরজা খুলে দিচ্ছেন। ডাইনিং টেবিলে বসে পেপার পড়ছেন আর চা খাচ্ছেন।
এবং ঘুমের ঘোরে, চোখ না খোলা অবস্থাতেই, আমি এও স্মরণ করতে পারি, যে বাবা আর নেই। এবং আমি চোখ খুললে আমার এই আধ-স্বপ্নটা মিলিয়ে যাবে। তাই আমি চোখ খুলি না, ইচ্ছে করে। ঘুম থেকে উঠেও আধো ঘুমে থাকি। অনুভব করতে থাকি, বাবা হাঁটছেন, ডাক দিচ্ছেন, পেপার পড়ছেন, বিস্কিট খাচ্ছেন, ইনসুলিন নিচ্ছেন, দরজা জানালা খুলছেন, গ্যারেজে গিয়ে হাঁটাহাঁটি করছেন।
ঘোরের মধ্যে এই স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখার শক্তি কীভাবে যেন আমার চলে এসেছে। ঘুম থেকে উঠে আমি আর ভয় পাই না, যে বাবা নেই। ঘুম থেকে উঠে আমি আরেক ঘুমে পাড়ি জমাই, যেখানে বাবা আছেন।
