ইভা হেসেকে লেখা সল লেওইটের চিঠি

১৯৬৫ সালে প্রখ্যাত আমেরিকান ভাস্কর ও চিত্রকর সল লেওইট তার বন্ধু ভাস্কর ইভা হেসেকে একটি চিঠি পাঠান। ইভা হেসে তখন তার নিজ শিল্পসত্তার সাথে সংগ্রাম করছিলেন। নতুন কিছু ভালো কিছু করবার আশায় দিনের পর দিন পার করছিলেন, কিন্তু তেমন কিছু করে উঠতে পারছিলেন না। এর ফলে এক সময় হতাশ হয়ে পড়েন। বন্ধুকে হতাশা থেকে উদ্ধার করতে সল লেওইট তাকে একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠিতে এত শক্তি, এত সত্য, এত ধার যে তা এখনো পৃথিবীজুড়ে মানুষের মনে অনুপ্রেরণা যোগায়। বিশেষ করে যারা শিল্প নিয়ে কাজ করেন, তারা এই চিঠির ঝনঝন আওয়াজে নড়েচড়ে বসেন। ভেতরের শিল্পসত্তাকে আগলে ধরে আবার সাহস করে ঝাঁপিয়ে পড়েন কাজে।

যা কিছু সুন্দর তা নিজের ভাষায় একটি সংস্করণ রেখে দিতে ইচ্ছে করে। তাই সেই চিঠিটির অনুবাদ করার চেষ্টা করেছি মাত্র – 

 

প্রিয় ইভা, 

প্রায় এক মাস হয়ে গেছে তুমি আমাকে চিঠি লিখেছিলে এবং সম্ভবত তুমি তোমার মানসিক সেই-অবস্থায় নেই (আমার সন্দেহ হয় যদিও)। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি তুমি-ই আছ এখনো, প্রতিমুহূর্তে তোমার চরম আক্রোশ। এটা করো না! পৃথিবীকে মাঝে মাঝে বলতে শেখো – যা খুশি হোক!! তোমার অধিকার আছে এটা বলার। কিন্তু – চিন্তা করে, দুশ্চিন্তা করে, ঘাড় ঘুরিয়ে বারবার পেছনে ফিরে, ভাবনায় তলিয়ে, সন্দেহ করে, ভয় পেয়ে, কষ্ট পেয়ে, সহজ পরিত্রাণের আশায় পথ চেয়ে, নাছোড়বান্দা হয়ে, কুস্তাকুস্তি করে, বিভ্রান্ত হয়ে, নিশপিশ করে, ঘষাঘষি করে, মিনমিন করে ফিনফিন করে, গজগজ করে খচখচ করে, হোঁচট খেয়ে, উষ্টা খেয়ে, ঘুরাঘুরি করে, হুড়াহুড়ি করে, ধরাধরি করে, গড়াগড়ি করে, চিৎকার করে হাহাকার করে, বকাবকি করে, ধমকাধমকি করে, কান্নাকাটি করে, বিলাপ করে,খোঁচাখুঁচি করে, গুঁতাগুঁতি করে, মাথার চুল ছিঁড়ে, নাকমুখ এক করে, চোখ উল্টে, আঙুল তাক করে, ভয়ে ভয়ে পা বাড়িয়ে, পালিয়ে পালিয়ে, অপেক্ষায় থেকে, নজর দিয়ে, কু-নজর দিয়ে, শোঁকাশুঁকি করে, খোঁজাখুঁজি করে, বোঝাবুঝি করে, পিষতে পিষতে পিষতে পিষতে নিজেকে নিঃশেষ করে ফেলো না! এটা বন্ধ করে শুধুমাত্র 

করো!!!

তোমার আগের চিঠিতে আমি জানতে পেরেছিলাম আগের কাজগুলো সম্পর্কে এবং তোমার কর্মক্ষমতা সম্পর্কে। তুমি যে কাজ করছ তা খুবই ভালো –  নিখুঁত ও সুচারুভাবে এঁকে যাচ্ছ বিরাট বিরাট মেশিনের মতন কিছু। শুনে বেশ দারুণ মনে হচ্ছে – আজগুবি কিছু মনে হচ্ছে। আরও করো! আরও আজগুবি, আরও উন্মত্ত, আরও মেশিন, আরও মানুষ, মানুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, যা যা আসে সবকিছু করো – তা যতই নিরর্থক লাগুক। চেষ্টা করো তোমার ভেতরের সত্তাটাকে সুড়সুড়ি দিয়ে বের করে আনতে, ভেতরের সে আজব খেলাটাকে বেড় করে আনতে। তোমার ভেতরে সেই গোপন সত্তার ভেতরেই তোমার আসল বসবাস। দেখতে সুন্দর লাগছে কিনা এটা নিয়ে ভেবো না, মনের মতন অসুন্দর উদ্ভট কিছু বানাও। নিজের মন দিয়ে বানাও, নিজের জগতটা দিয়ে বানাও। যদি ভয় পাও তবে এটাই বানাও – আঁকো তোমার ভয়কে, আশঙ্কাকে। আর বড় বড় ব্যাপারগুলো নিয়ে দুশ্চিন্তা করা বাদ দাও, যেমন – “জীবনের এমন একটি উদ্দেশ্যর উপর মন স্থির করা বা এমন একটি উপায় খুঁজে বের করা, যার মাধ্যমে পৌঁছানো যাবে অবিশ্বাস্য এক প্রান্তে বা কাল্পনিক এক দ্বারপ্রান্তে”। চেষ্টা করো সরল হতে, বোকা হতে, চিন্তাশূন্য হতে, শূন্য হতে – এটাকে অনুশীলনে পরিণত করো। তখনই তুমি পারবে শুধু মাত্র করে যেতে। শুধু

করো!!!

তোমার উপর আমার যথেষ্ট আস্থা আছে। যদিও তুমি নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছ কিন্তু তোমার কাজ আসলেই বেশ ভালো। তবে চেষ্টা করো কিছু দুর্বল কাজও করতে – সবচেয়ে দুর্বল খারাপটা যেটা তুমি করতে পারো এবং দেখো কী হয়। এভাবে আসলে তুমি রিল্যাক্স হয়ে কিছু কাজ করতে পারবে। আশেপাশে কী হয় না হয় তার তোয়াক্কা করো না। গোটা পৃথিবীর ভার কেউ তোমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয় নি, তোমার দায়িত্ব শুধু তোমার কাজটার উপর – তাই কাজটা করো!! আর এটা ভেবো না যে তোমার কাজগুলো আগেকার  চিন্তা চেতনা বা ধ্যান ধারণার মতনই হতে হবে। তোমার কাজে তুমি যা চাও তাই-ই করতে পারো। যদি তোমার কাছে কাজটা খুব বেশি কঠিন লাগে – তাহলে কাজটা থামাও। নিজের উপর জোর জবরদস্তি করো না। তবে আমার মতে, শিল্প তোমার সত্তার এমন একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ যে তোমার জন্যে সবচেয়ে সহজ হয় যদি তুমি শুধু

করো!!!

আমার কাছে মনে হয় যে তোমার এই দৃষ্টিভঙ্গিটা আমি বুঝতে পারি কারণ আমিও একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যাই। আমার মধ্যেও আগের করা সবগুলো কাজ পুনর্বিবেচনা করার যন্ত্রণাদায়ক এক তাড়না সৃষ্টি হয়, যেন সবকিছু একেবারে পালটে ফেলি – মনে হয় যা এতদিন করেছি সব তুচ্ছ, আরও ঢেলে সাজিয়ে আরও ভালো কিছু করা দরকার। হয়তো ভেতরের এই তাড়নাটাই আমাকে আরও কাজ করতে তাড়া যায়। তখন মনে হয় যে, যা এতদিন করেছি, তার চেয়েও ভালো আমি করতে পারি। হয়তো তোমার ভেতর যে যন্ত্রণাটা কাজ করছে তা তোমাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে প্রয়োজন। হয়তো এটাই তোমার মধ্যে আরও ভালো করার উদ্দীপনা যোগায়। তবে এটা কষ্টকর, আমি জানি। সবচেয়ে ভালো হয় যদি তুমি নিজের উপর আস্থা রেখে কাজটা শুধু করে যাও এবং এটা নিয়ে আর না ভাবো। “বিশ্ব” “শিল্প” এই শব্দগুলোকে তাদের মতন থাকতে দাও, এবং আমিত্বকে নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি বাদ দাও। এটা বুঝতে পারি যে তুমি (বা যে কেউ) কতই বা আর কাজ করতে পারো, বাকি সময়টুকুতে চিন্তা ভাবনা চলে আসতেই পারে।

কিন্তু যখন তুমি কাজ করবে বা কাজ করতে বসবে তখন তোমার মনটাকে শূন্য করে ফেলতে হবে এবং শুধু কাজটায় মনোনিবেশ করতে হবে। কাজটা শেষ হলে শেষ। কিছুক্ষণ পর লক্ষ করবে যে কিছু কাজ বাকিগুলোর চেয়ে ভালো এবং কাজগুলো একটা ধারার দিকে এগুচ্ছে। আমি নিশ্চিত তোমরা সেসব সবই জানো। তবে এটাও অবশ্যই মনে রেখো, কাজটায় যে সমর্থন যোগাতে হবে এমন কোনো কথা নেই – এমনকি তোমার নিজের সমর্থনেরও প্রয়োজন নেই।

তুমি জানো যে তোমার কাজ আমি খুব পছন্দ করি এবং এটা আমার বুঝতে কষ্ট হয় যে তুমি এটা নিয়ে এত দুশ্চিন্তায় ভোগো কেন। কাজের পরের অংশগুলো তুমি দেখতে পাও, আমি না। তোমার দক্ষতার উপর তোমাকে অবশ্যই আস্থা রাখতে হবে। আমার মনে হয় নিজের উপর আস্থা তোমার আছে। তাই চেষ্টা করো তোমার দ্বারা সম্ভব সবচেয়ে অদ্ভুত কাজগুলো করতে – নিজেকে বিস্মিত করতে। তোমার শক্তি আছে দক্ষতা আছে যে-কোনো কিছু করার।

[…]

তোমাদের দুজনের প্রতি অনেক ভালবাসা রইল

সল

চিঠিটি পাওয়ার এক বছরের মাথায় ইভা হেসে তার সবচেয়ে আলোচিত ও বিখ্যাত ভাস্কর্য “হ্যাং আপ” সৃষ্টি করেন। 

One comment

  1. এই চিঠিটি প্রখ্যাত ব্রিটিশ অভিনেতা বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ মঞ্চে দারুণ আবৃত্তি করে পড়ে শোনান। এখানে সেই আবৃত্তির লিংক –
    https://www.youtube.com/watch?v=VnSMIgsPj5M

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *