শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে যাই। ছোটার পথে অনুভব করি শীতের আমেজ। শীতের আমেজ ভালো লাগে। কেমন মৃদু এক সুবাস যেন আছে বাংলার শীতের। হঠাৎ চোখে পড়ে রাতের আঁধার দূরে কেমন একটা আলো যেন জ্বলছে, সোনালী কমলা রঙের! আকাশটা যেন কমলা হয়ে গেছে! কোনো লাইট শো হয় নাকি? স্টেডিয়ামে কনসার্ট? আরও ভালো করে দেখার চেষ্টা করি।
পাশে থেকে ও বলে উঠে, আগুন নাকি? কড়াইলের আগুন?
একটা ধাক্কা খাই! ঐ সোনালী আলো তবে পুড়ে যাওয়া ঘর বাড়ির? কত শত বাড়ি পুড়ছে ওখানে? কত হাজার মানুষের?
এই শীতের রাতে কত মানুষ আজ ঘরহীন হলো? ওরা এখন কী করবে? কোথায় যাবে?
আচ্ছা, কিছুদিন আগেই তো সেই ভূমিকম্পটা হলো। আমরা খালিপায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলাম এক মুহূর্তে। ঐ এক মুহুর্তে কি ভাবি নি, সব শেষ? সেই প্রাণপ্রিয় ঘর সেই বিছানা – বই পত্র সখের জিনিসগুলো… সবকিছু শেষ? সেই মুহূর্তে কি ভাবি নি, কাল কী হবে, অফিস কী হবে, ঠাই কই হবে, কীভাবে হবে… কোন স্বপ্ন ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বাঁচার তাগিদে নতুন কোন উদ্দেশ্যকে লালন করব জীবনে?
কড়াইলের ঐ মানুষগুলো আগুনের কাছে দাঁড়িয়ে যা দেখছে, আমরা সবাই কিন্তু সেটা দেখেছি গেল শুক্রবারে সকাল ১০টা ৩৮মিনিটে! কোনো ভেদাভেদ ছিল না আমাদের মাঝে। সমাজের বিত্তবান বিত্তহীন সবাই একসাথে দেখেছি- জীবনটা মুহুর্তেই কেমন হয়ে যেতে পারে…।
আচ্ছা, যদি ধরে নেই, সেই আগুন খুব প্রভাবশালীর কিছু মানুষের উদ্যোগে…। যদি ধরে নেই, ওখানে এখন মাল্টিকমপ্লেক্স দালান হবে। হাজার কোটি টাকার ডিলিং হবে।
যদি ধরে নেয়ার পরে একটু ভাবি, ঐ কিছু প্রভাবশালী মানুষের কথা। ওদেরও তো ঘর আছে, ধরলাম প্রাসাদ আছে, তবুও তো ঘর। সেই ঘরে সখের কিছু বিষয় আছে। সযত্নে তুলে রাখা কিছু বিষয় আশয় আছে। সেদিনের ভূমিকম্প তো তাদের ঘরেও হয়েছিল। একবারও কি মনে হয় নি, এই বুঝি সব হারালো? হয়তো হয়েছে।
তবে কি এর সাথে এও মনে হয়েছে তাদের প্রিয় জিনিসগুলো সেই সব দিনে আনা দিনে খাওয়া মানুষের চেয়ে বেশি মূল্যবান? সেইসব মানুষের জানমালের কোনো মূল্য নেই, শুধু তাদেরটারই আছে? যে ওদের আছে বড়জোর ৫/১০ হাজার টাকার জিনিস আর তাদের আছে ৫০০ কোটি টাকার জিনিস, তাই ৫ হাজার টাকার জিনিস হারালে আর এমন কি? এটা কোনো লস নয়…? মাত্র পাঁচ হাজার টাকা!
হিসাবটা তো মূলত এখানেই। একজন মানুষের পাঁচ হাজার টাকার ঘর হৃদয়ের খুব কাছাকাছি থাকতে পারে। আরেকজন মানুষের শত কোটি ঘর তার হৃদয়ের ধারেকাছে যেতে পারে না। কারণ তার তো হৃদয়টা বন্ধ হয়ে গেছে। বেঁচে থেকেও সে তো মৃত একজন মানুষ। লাশের যেমন হার্টবিট থাকে না, তাদেরও হার্টবিট পাওয়া যাবে না। হাজার কোটি টাকার সম্পদ গড়তে পারবে, অনেক উঁচু চেয়ারে বসতে পারে, কিন্তু অনুভব করতে পারবে না। একটা লাশ অনেক উঁচু চেয়ারে বসে থাকলে কেমন থাকে? কোনো স্বাদ নেই অনুভূতি নেই কারণ হৃদয় নেই। হৃদয় তাদের হাসেও না কাঁদেও না।
একটু আগে বলছিলাম, ভূমিকম্পে কি তারা ঘর হারানোর অনুভূতি এক মুহূর্তেও জন্যেও টের পায় নি?
উত্তরটা হলো, পায় নি।
কড়াইলে একটা কাজ করার সুযোগ হয়েছিল, মমতাময় কড়াইল নিয়ে। জানি না সেই মানুষগুলো এখন কোথায় আছে, কেমন আছে…
https://mazduda.com/momotamoy-korail/
