বন্য প্রাণীদের অভয়ারণ্যে [মান্দাই, সিঙ্গাপুর]

সিঙ্গাপুরে আছি, দুপুরের খাবার খাব। এবারের ট্রিপে আমরা একেবারে গুগল দেখে দেখে রেস্টুরান্ট বের করেছি- আমরা বলতে শারিদ করেছে আর কি। আমি তো ভাবের জগতের মানুষ- আকাশ দেখি, গাছ দেখি, পাখি দেখি, কিন্তু গুগুল দেখি না। আমার স্বামী হলো বাস্তব জগতের মানুষ। সে বেচারা কোমরে দড়ি বেঁধে আমাকে পাতালের সাথে সংযুক্ত রাখে। 

আমি কেমন ভাবের জগতে থাকি – একটা কুইক ডেমো দেই। এবারের ট্রিপের শুরুতেই জালান আলোরে (কুয়ালালামপুরে স্ট্রিট ফুডে জন্যে বিখ্যাত) শারিদকে বললাম, শোনো, যে দেশের অঞ্চলের মানুষ যে খাবার খায়, আমরা সেটাই খাবো! এটাই আসল ভ্রমণ! 
এই বলে বেশ এডভেঞ্চার মুড নিয়ে সী-ফুড নুডলস জাতীয় কিছু একটা চায়নিজ দোকানে অর্ডার দিলাম। নুডলসটা দুই চামচ মুখে দেয়ার পর বুঝলাম, এটা আর যাই হোক, আটা ময়দার নুডলস না। একটা লাল রঙের গুটি গুটি ডিমের মতন কি দেখলাম। আমি ডিটারমাইনড! আসল ভ্রমণ করতে হবে। মুখে পুড়ে দিলাম। কাঁচা মাছের মতন আঁশটে গন্ধ পেলাম। এরপরও জোর করে আরও কয়টা পুরলাম। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, সেটা আসলে এক ধরণের লাল পোকা! ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিলবিলে পা দেখা যাচ্ছে। আর নুডলসটা আসলেই আটা ময়দার না, বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীদের সাদা সাদা পেটি। ওদিকে শারিদ এক চামচ নুডলস খায় তো ২ ঢোক কোক। বেচারা তখনও আসল রহস্য বুঝতে পারে নাই। আমি ভাবলাম, কিছুক্ষণ পর বলি, পোকা একা আমি খাব কেন? ওর-ও কিছু “আসল ভ্রমণ” দরকার। [পরেও বলি নাই, যদি বমি করে দেয়। শুধু বললাম, থাক, আর খেও না…।] 

এক ঝলক বলিউড 
তো এই হলো আমার অবস্থা, এবং আমার স্বামীর করুণ-অবস্থা। এই অবস্থায় খুঁজে খুঁজে ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি রেস্টুরেন্ট বের করার চেষ্টা করছি। মিনি পাঞ্জাব নামের এক রেস্টুরেন্টের বেশ ভালো রিভিউ পেলাম এবং সিঙ্গাপুরের কাঠফাটা গরমে দুপুরের খাবার খেতে চলে গেলাম।
ভেতরে ঢুকে অবশ্য মনে হলো কোনো বারে এলাম কিনা। পরে দেখলাম ওরা বার + রেস্টুরেন্ট। আর ওদের খাবার আসলেই খুব সুস্বাদু। বিশেষ করে গোবি মাসালা ও বাটার চিকেন। পাশের টেবিলে আমাদেরই বয়সী পাঞ্চাবী তিন বন্ধু। ২ জন ছেলে ও একজন মেয়ে, একদম বলিউডি ভাইবে তারা আছে। একজন ড্রিংক করছে তো করছেই, হুশ নেই। তার নাকি জন্মদিন। শারিদকে দেখে চিৎকার করছে। হেই দোস্ত! আমাকে দেখে ডাক দেয়, ভাবী!!! আবার হাত জোর করে ক্ষমা চায়! 
বাকি দুজন তাকে প্রাণপণে সামাল দেয়, আর ১০০বার আমাদের স্যরি বলে। আমরা মোটেই মাইন্ড করলাম না। বেশ আগ্রহ নিয়ে বলিউড দেখতে লাগলাম। 
ঐ দুই বন্ধু বোধয় বুঝল, তারা আমাদের সাথে গল্প জুড়ে দিল। কোথা থেকে এসেছি কী করছি এইসব। জানালো তারা সিঙ্গাপুরিয়ান, পূর্ব পুরুষ পাঞ্চাবের। বেশ আন্তরিক ছিল, ভালো লাগল। ঐদিকে তাদের মাতাল বন্ধু শারিদকে ডাকে আর আমার কাছে হাত জোর করে ক্ষমা চায়। সে আমাকে তার কোন বদরাগী ভাবীর সাথে মেলাচ্ছে কে জানে। 
তো গল্প প্রসঙ্গে তারা জিজ্ঞেস করল, সিঙ্গাপুরে কোথায় ঘোরাঘুরি করছি। আমরা বললাম, গতকাল তোমাদের চিড়িয়াখানায় বেশ সময় কাটালাম। সাথে সাথে তারা হাহাকার করে উঠল, কি!!! চিড়িয়াখানা!! ঐটা দেখার জিনিস??? ক্যান যাবা ওখানে! পশুপাখি সব ঘুমায় থাকে, একটু খেলেও না! আমি সিংহ দেখতে গেসিলাম, খেলে নাই! 
আমরা বুঝতে পারলাম না, সিংহ আমাদের সাথে কী খেলবে, তবু মাথা নাড়লাম। 
“সিংহ তো নড়েও না! খোঁচা দিলেও নড়ে না, খালি ঝিমায়!!” 
আমরা মাথা নাড়তে নাড়তে ভাবতে লাগলাম, সিংহকে কে খোঁচা দেয় ঘুম থেকে ওঠাতে…। 
“তোমরা যখন গেলা সিংহ ঘুমাচ্ছিল? নাকি ঝিমাচ্ছিল??” 
আমরা মনেই করতে পারলাম না সিংহ কী করছিল। তিন বন্ধু শুধু আফসোস করতে লাগল আমাদের জন্যে। কত সময় আর শক্তি অপচয় করে আসলাম, সঠিক গাইড আমরা পাই নাই! এর পরের বার গেলে যেন অবশ্যই তাদের সাথে যোগাযোগ করি, ওরা আমাদের আসল জায়গায় নিয়ে যাবে!  
আসল জায়গা মানে পার্টি প্লেস, কিন্তু আমরা তো পার্টি মানুষ না। তবু হু হু করলাম, তাদের আগ্রহ আন্তরিকতা ভালো লাগল। 
তবে এটা ভেবে মজা পেলাম যে সবখানেই মানুষ বোধয় একই রকম হয়। যত দোষ সব নিজের দেশের! এর মধ্যে সে তিন বন্ধুর মধ্যে একজন ব্যাংকার। শারিদ জিজ্ঞেস করল, সিঙ্গাপুরের ইকোনমি তো অনেক শক্তিশালী! নিশ্চয়ই অনেক ইন্টারেস্টিং কাজ করছেন!
সে বিস্মিত হয়ে উত্তর দিল, কিহ?? এইখানের ইকোনমি? কই নাতো। তেমন কিসুই না! ভীষণ বোরিং!! 
আমরা কি বলব বুঝে পেলাম না। 

মান্দাই বন্যপ্রাণীদের অভ্যয়ারণ্য
তো সিঙ্গাপুরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তাদের চিড়িয়াখানা। কারণ এটা শুধু চিড়িয়াখানা নয়, এটা বন্যপ্রাণীদের অভ্যয়ারণ্য (Wildlife Reserve)। এখানে টিকিটের দাম অনেক, তবে টিকিটের পুরো টাকাটাই তারা ব্যয় করে প্রাণীদের সংরক্ষণ ও যত্নায়নে। এখানে রাখা প্রাণীদের ১৬%-ই পৃথিবীজুড়ে প্রায় বিলুপ্ত। আর প্রাণীদের এমনভাবে রাখা হয়েছে যেন তারা তাদের প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেমের ভেতরেই রয়েছে।
এখানে প্রাণীদের জন্যে কোনো খাঁচা নেই। উল্টো দর্শনার্থীদের প্রাণী দেখতে হলে খাঁচার ভেতর ঢুকে ঢুকে মুক্ত পশুপাখিদের দেখতে হয়। 
আর পুরো জায়গাটা এমনভাবে সাজানো যেন আস্ত জঙ্গল। এতদূর হেঁটে হেঁটে গিয়ে দেখতে হয় সব, এর মধ্যে আবার বাগিকারও চলছে সর্বক্ষণ। কিন্তু ভালো করে দেখতে হলে বাগিকারে বসে লাভ নেই, হেঁটেই দেখতে হবে।
প্রত্যেকটা প্রাণী তার নিজস্ব ইকোসিস্টেমে মুক্ত মনে কেমনভাবে বিচরণ করে তা দেখা যায়। যেমন এক চিতাবাঘকে দেখলাম সে খুব চিন্তিত মনে পায়চারি করে চলছেই তো চলছে। যেন রাত নামলেই শিকারে বের হতে হবে। হায়েনাদের দেখলাম দলবদ্ধভাবে কি যেন শুধু আলোচনা করছে, যেন কারও বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। একটা স্লথ দেখলাম নিশিন্তে ইচ্ছেমতন ঢিলামো করে গাছদের মগডালে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর জিরাফরা তো এখানে স্টার! তাদের আলাদা নাম আছে, বই আছে, তাদের স্টিকার ব্যাগ ইত্যাদি পাওয়া যায়। বেশ কিছু প্রাণীদেরই তাদের নাম অনুসারে স্টিকার ব্যাগ ডায়রি ইত্যাদি পাওয়া যায়। এগুলোর মাধ্যমে যেন চিড়িয়াখানার প্রাণীদের একেকজনের পরিচয়টা খুব স্পষ্ট হয়ে উঠে। তাদেরকে সেলিব্রিটি হিসেবে আপ্যায়ন করা হয় আর কি। কি দারুণ ব্যাপার! ছোট ছোট বাচ্চারা দেখলাম দিব্যি এদের নাম মুখস্থ করে ডেকে ডেকে খুঁজছে। পশু পাখিদের সাথে কি মধুর সম্পর্ক হয়ে যাচ্ছে!
আর প্রতিটা প্রাণী দেখার জায়গায় তাদের সম্পর্কে এত সুন্দর করে সহজ ভাষায় এত ইন্টারেস্টিং করে বর্ণনা দেয়া, ছোটবেলা হলে আমি নির্ঘাত সব মুখস্ত করে আসতাম এবং দেশে এসে পরিবারের কাছে ঘোষণা দিতাম যে প্রাণীবিজ্ঞানী (জ্যুলজিস্ট) হতে চলছি!
আসলে ছোটবেলায় আমি দিনের পর দিন এনিমেল প্ল্যানেট চ্যানেল দেখে জ্যুলজিস্ট হবার স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু প্রাণীদের সাথে এরকম গভীর সম্পর্ক হওয়ার সুযোগ তখন হয় নি, তাই এই স্বপ্নকে বেশিদিন লালন করতে পারি নি। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন পারে, এই দোয়া। 

সুন্দরীর দেখা!
তো সিঙ্গাপুরের বন্যপ্রাণীদের অভয়ারণ্য ঘুরে দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখে পড়ল বেশ সুন্দর করে প্রদর্শন করা বিশেষ একটি গাছ। গাছটা বেশ বড়সর হয়, তবে এর শেকড় বাকড় পানির ভেতরে। কর্তৃপক্ষ একেবারে এক্যুরিয়াম করে আস্ত গাছটাকে সংরক্ষণ করছে। আর পাশে এই গাছ যে কত বিস্ময়কর তা নিয়ে নানা তথ্য। সেই গাছটা হলো আমাদের সুন্দরবনের সুন্দরী গাছ!
সত্যি বলতে, দুঃখ লাগল। আমাদের সুন্দরীকে আমরা কীভাবে রাখি, আর কত শত মাইল দূরে ওরা কিনা কত যত্ন কত আয়োজন করে প্রদর্শন করে। সাথে কত তথ্য বিশ্লেষণ জুড়ে দেয় যেন সাধারণ মানুষ শিখতে পারে। আর আমরা ঘরের কাছে রেখেও শিখতে পাই না।
আচ্ছা, আমরা আমাদের প্রকৃতিকে এত অবহেলা করি কেন? টাকার অভাবে? মানসিকতার অভাবে? আমার মনে হয়, দুটোই না। টাকা আছে। কদর করার মতন মানসিকতা কিছু মানুষের হলে যথেষ্ট। উত্তরটা বোধয়, সিস্টেমের অভাবে…। 

সিঙ্গাপুরের সেই অভয়ারণ্য থেকে ফিরতে ফিরতে প্রায় বিকেল হয়ে গেল। এরপরও পুরোটা দেখে শেষ করতে পারলাম না। ওদিকে ঘোরাঘুরি করে আমি ও শারিদ ক্লান্ত তৃষ্ণার্ত। সেখান থেকে বেরুবার পথে একটা ফুড হলের মতন আছে। কিছু খাব বলে বসেছি, এমন সময় দেখি একটা ময়ুর দিব্যি ফুড হলের ভেতরে কাস্টমারের মতন ঘুরে বেড়াচ্ছে। টেবিলে ফেলে দেয়া খাবার খুঁজছে। চারপাশে এত মানুষ, কিন্তু তার মধ্যে কোনো ভাবান্তর নেই। আমি এবং আরও অনেকে কাছে গিয়ে ছবি তুলতে শুরু করলাম। আমাদের পাত্তাই দিল না। যেন পাপারাজ্জিরা পেছনে লেগে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। বেশ অনেকক্ষণ সে নিজের মন মতন ঘুরে বেড়াতে লাগল। ময়ূরের এই নিরাপত্তাবোধ দেখে ভালো লাগল। কতটা নিশ্চিন্ত হলে সে এত বড় পাখা নিয়েও এত মানুষের কাছাকাছি ঘুরে বেড়াতে পারে এত স্বাচ্ছন্দ্যে! 

আমরা ফিরে এলাম মূল শহরে।
মূল শহরের গল্পগুলো আরেকদিন হবে। 

কিছু ছবি –

টিকেটের দাম বেশি হওয়ার মূল কারণ
আমাদের চেয়ে দেখছে, মাঝে কোনো বাধা নেই
পেলিকানদের কাছাকাছি পাখি আমাদের দেশের বক।
আমি যখন দূর থেকে বক দেখি, মন হয় যেন ঐশ্বরিক কিছু! একেবারে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। শুভ্র ডানা, চিকন চিকন পা, দূরে আকাশ আর জলের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। লাজুক প্রজাতির পাখি! কাছ থেকে দেখার উপায় নেই। অপরদিকে পেলিকানরা হলো মহা বিরক্ত – তাদের দূরে দূরে রাখা হয় বলে। তারা চায় মানুষদের কাছে আসতে এবং গোটা মানুষ সবগুলাকে একে একে গিলে ফেলতে। সেটা করতে পারছে না বলে এক ধরণের আফসোস দেখা যায় তাদের চোখে মুখে।
তো এই পেলিকানদের মাঝে কাজ করে ঐশ্বরিক ক্ষুধা!
দর্শনার্থীদের আগমন দেখে তারা যতটা খুশি হয়, তাদের চলে যাওয়া দেখে ততটাই বিরক্ত হয়। রয়ে যায় শুধু আফসোস, কত জ্যান্ত খাবার হেঁটে হেঁটে চলে যায়, তারা গলধঃকরণ করতে পারে না। আহা রে…
ফুডকোর্টে খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে সেই ময়ূর
খাবার এখনো আসে নি বলে মহা বিরক্ত…
কথাটা একটু ভাবা যেতে পারে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *