লকডাউনের সাত সকালে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়েছি। এখন সকালগুলো হয় বেশ বোরিং। সবার মধ্যে কেমন একটা নিস্তেজ ভাব। ভ্যানগাড়িতে সব্জিওয়ালারা শাক-সবজি নিয়ে অলস বসে আছেন। রিকশা পাওয়া যায় না খুব একটা। বেশিরভাগ মানুষই হাঁটছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ মাস্ক পরে বাজার করতে বেরিয়েছেন। আরও আছেন অফিসগামী মানুষ, অফিসে ছুটছেন। সকালবেলার রাস্তাগুলো যে স্কুলের বাচ্চারাই মাতিয়ে রাখে, এটা আগে এভাবে চোখে পড়ে নি। তাদের স্কুলের সময় হয়, টিফিনের সময় হয়, আইস্ক্রিম ঝালমুড়ি এটা ওটা কিনতে হয়। স্টেশনারির দোকানে বারবার ভিড় হয়। এখন বাচ্চারা নেই, মাতিয়ে রাখারও কেও নেই। যে যার গন্তব্যে ছুটছেন।
আমিও রিকশায় বসে নিস্তেজভাবে চিরচেনা অলিগলিকে দেখছি।
এরই মাঝে একটা ৮/৯ বছরের বাচ্চা ছেলে চোখে পড়ল, গায়ে হালকা রঙের টি-শার্ট আর হাফপ্যান্ট পড়ে রাস্তার এক দিক দিয়ে হেঁটে আসছে। হাতে বাজারের ব্যাগ। হয়তো তার মা টুকিটাকি আনতে পাঠিয়েছিলান।
অপরদিক দিক থেকে আসছেন এক ভিক্ষুক মহিলা। বেশ বৃদ্ধ, কুঁজো হয়ে হাঁটছেন। গায়ে একটা জীর্ণ সবুজ শারি প্যাঁচানো। তাকে এই সাত সকালে কেউ ভিক্ষা দিচ্ছে না, বোঝা গেল। সকালবেলাটা ভিক্ষার প্রাইম টাইম না। তিনিও এত একটা চাইলেন না। গুনগুন করে গান গেয়ে গেয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছেন।
হঠাৎ ছোট ছেলেটা এগিয়ে এসে বাজার থেকে বেঁচে যাওয়া টাকাটা রাখল ভিক্ষুকের পাতে। ভিক্ষুক মহিলা গান থামিয়ে তাকালেন। একটা বাচ্চা যে নিজে থেকেই এসে তাকে টাকে দিবে, আসা করেন নি। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তিনি বাচ্চাটার মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন। সাথে বিড়বিড় করে বললেন – বেঁচে থাকো বাবা, বা এই টাইপ কিছু।
ছোট্ট ছেলেটা বেশ খুশি হয়ে গেল! তার চোখ দেখে বোঝা গেল বৃদ্ধ মহিলার দোয়াতে সে বিশ্বাস করছে। তাই মহিলার চোখের দিকে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতায় হাসছে। হেসে সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। বৃদ্ধ মহিলাকে সাধমতন তার মাথায় গায়ে হাত বুলাতে দিচ্ছে।
মহিলাও ক্রমাগত হাত বুলিয়েই যাচ্ছেন, থামার কোনো লক্ষণ নেই।
বাচ্চাটা মোটেই বিরক্ত হচ্ছে না। বা ধুলোময়লায় মাখা সে হাতের ছোঁয়ায় কিছুই মনে করছে না। তাড়াহুড়ো করে সেখান থেকে কেটেও পড়ছে না। সে দাঁত বের করে শুধু কৃতজ্ঞতায় হাসছে।
তার হাসিতে বোঝা যায়, সে আসলে করুণা করে ভিক্ষা দেয় নি। ভিক্ষা দেয়াটা যে ভিক্ষাবৃত্তিকে উৎসাহিত করা, সেটা হয়তো বাচ্চাটা বড় হলে পরে শিখে নিবে। কিন্তু তার দেয়ার মধ্যে কোন খাত নেই। দেয়াও যে কত সুন্দর হতে পারে।
বাচ্চাটা টাকা দেয়ার চেয়েও বেশি অভিভূত করল বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে তার মুখের হাসি। হাসির মধ্যে বিনয়, নম্রতা, কৃতজ্ঞতা।
খুব ইচ্ছে হচ্ছিল, তখনই যদি ঐ মুহূর্তের একটা ছবি তুলতে পারতাম। কিন্তু আমার ব্যাগ ততক্ষণে সুড়ঙ্গ! সেখান এই অল্প সময়ে মোবাইল উদ্ধার সম্ভব নয়।
