১।
রুদ্রের কাছে মনে হয় ভালবাসা রৌদ্রের মতন, প্রখর হয়ে আসে। রুদ্র ভালবাসে, অথবা বাসতে চায় তার প্রেমিকাকে।
রুদ্রের প্রেমিকা থার্ড ইয়ারে পরে। ভালোবাসা পেয়ে গেছে ভেবে সে মনের সুখে ক্লাসে যায়, ক্লাস থেকে বের হয়, বের হয়ে রুদ্রকে এসএমএস দেয়। এরপর আর কোথায় কোথায় যে যায়, বন্ধুদের আড্ডায়, না ভলান্টারি কাজে না অহেতুক ঘুরাঘুরিতে।
একটু পর পর রুদ্রের চ্যাট বক্সে টুংটাং আসতেই থাকে। প্রেমিকা খেয়াল রাখে, রুদ্র যেন কখনো অনুভব না করে যে দিনের কোনো অংশ তার সময়গুলো রুদ্রকে ছাড়া কেটেছে। রুদ্রের এই ব্যাপারটা পছন্দ করে, এমনটাই হওয়া উচিৎ বলে মনে হয় তার।
অফিসের ফাঁকে রুদ্র প্রেমিকাকে নিয়ে গান লেখে, ছবি আঁকে, সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখে। আর দু’বছর। এরপর রুদ্র প্রেমিকাকে বিয়ে করে ঘরে তুলবে। সেই দিনটার জন্যে রুদ্রর মনে আষাঢ়ের মেঘের মতন ঘন তীব্র অপেক্ষা জমাট বেঁধে থাকে। রুদ্র অপেক্ষা করে, প্রেমিকার ছায়াতলে রোজ রোজ বিশ্রাম নিতে, সারাদিনের ক্লান্তি শেষে তার প্রেমিকার প্রেমে শীতল হতে। অপেক্ষা করে সুন্দর মুহুর্তদের জন্যে। এবং…এবং নিরাপত্তার জন্যে।
রুদ্রের মনে ভয় কাজ করে, সে ভয় এত গভীরে, রুদ্র কাউকে বলার সাহস পায় না, এমন কি নিজেকেও না। রুদ্রর মনে হয় একদিন তার প্রেমিকা কোনো এক কারণে তাকে ভালোবাসতে ভুলে যাবে। বা বেখেয়াল হয়ে যাবে। বা কিছু একটা হবে। কী হবে সে জানে না, সে ঠিক চিহ্নিত করতে পারে না। কিন্তু কিছু একটা হবে। এবং রুদ্র সেদিন অনেক কষ্ট পাবে। অনেক কষ্ট। সেই কষ্ট রুদ্র সহ্য করতে পারবে না।
ভালবাসার কষ্ট সহ্য করা যায় না। রুদ্র পারবে না।
রুদ্রর মনে হয়, কবে, কবে প্রেমিকা পড়াশোনার পাট চুকিয়ে তার ঘরে আসবে। রুদ্র নিশ্চিন্ত মনে ঘরে প্রেমিকাকে রেখে দিবে আজীবনের জন্যে। ওর এসব বন্ধু-বান্ধব ততদিনে আর টিকবে না। এখানে ওখানে ছুটোছুটিও থেমে যাবে। সংসার শুরু হলে একটা ম্যাচুরিটি তো মেয়েদের এমনিতেই এসে যায়, এসে যাওয়া উচিৎ।
রুদ্রর প্রেমিকা শুধু তাকে নিয়েই থাকবে। সেই-ই কি যথেষ্ট নয়? ভালোবাসা কি যথেষ্ট নয়? ভালোবাসার জন্যে মানুষ কি না পারে? তার প্রেমিকা তাকে ভালোবেসে সব পারবে। সব। রুদ্র তাকে অট্টালিকায় রাখবে, রানীর মতন করে। সে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনরাত খাটবে, কিন্তু তার ঘর থাকবে ঐশ্বর্যময়। কোনো অভাব তার প্রেমিকার হবে না কোনোদিনও। রুদ্র তাকে সব দিবে। তার প্রেমিকার কখনো কষ্ট করতে হবে না, চাকরি করতে হবে না, কোনো পেশার পেছনে ছুটতে হবে না। আত্মপরিচয় গড়ার প্রশ্ন যদি আসে, তবে রুদ্রের ভালোবাসার পরিচয়ই কি যথেষ্ট নয়? কটা মেয়ে আছে এই সমাজে যাকে তার স্বামী এতকিছু দিতে পারে? এত ভালোবাসা দিতে পারে? এত অঢেল সম্পত্তি দিয়ে ভরিয়ে রাখতে পারে? তার প্রেমিকা, বা স্ত্রীকে তো রাজকপালি ডাকবে সমাজের মানুষজন।
রুদ্র নিজের ভালোবাসতে পারার ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়।
এভাবে ভালোবাসার অজুহাত দিয়ে রুদ্র ধীরে ধীরে গোটাতে শুরু করে তার প্রেমিকার পৃথিবীকে। অমুক বন্ধু- ছেলে বন্ধু, অমুক সার্কেল, অমুক ইন্টার্নশিপ, অমুক সুযোগ, অমুক আরও কিছু একে একে নিষেধ করতে শুরু করে। প্রেমিকাকে বলে প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নেই কেন এই নিয়ে ঝগড়া শুরু হয়। এবং ঝগড়ার শেষে রুদ্রের জয় হয়, ভালোবাসার নামে।
রুদ্র জেনে অথবা না জেনে, একে এক আবদ্ধ করতে থাকে প্রেমিকাকে, তাকে তৈরি করে তার স্ত্রী হতে, ধাপে ধাপে। রুদ্রর প্রেমিকার সব আছে, শুধু একটু মেরুদণ্ডটা ভাঙা প্রয়োজন। মেরুদণ্ড ভাঙা মানুষ দাঁড়াতে পারে না নিজ পরিচয়ে। তারা কোথাও ছুটে যেতে পারে না, কোথাও নিজেকে গড়তে পারে না। তাদের শেকড় খুব দুর্বল হয়। তারা শুধু আঁকড়ে ধরে রাখতে জানে।
মেরুদণ্ড ভাঙা মানুষ কক্ষনো কোথাও যাবে না রুদ্রকে ছেড়ে। তারা কখনো রুদ্রকে কষ্ট দিতে পারবে না, কারণ রুদ্র মেরুদণ্ড ভাঙা মানুষদের চেয়ে অন্তত শক্তিশালী।
২।
মিসেস হাসিনা বেগম তার গোটা পরিবার নিয়ে এসেছেন ছোট ছেলের জন্যে পাত্রী দেখতে। পাত্রীপক্ষ তাকে এখুনি আসতে বলে নি, তিনি নিজ থেকেই জোর করে এসেছেন ঘটককে বলে কয়ে। পাত্রীপক্ষের কীসের এত দাপট তিনি বুঝতে পারেন না। পাত্র যে দেখতে আসবে এই তো বেশি, এখানে আবার দেরি করার কি আছে।
হাসিনা বেগমের চার ছেলে, মেয়ে নেই। চার চারটি ছেলে জন্ম দিতে পেরে তিনি গর্বিত বোধ করেন। চার ছেলের জননী হওয়ায় তিনি বরাবরই শ্বশুরবাড়িতে এবং তার সমাজে বিশেষ দাপট নিয়ে চলতে পেরেছেন। যেসব জননী তার মতো করে চারজন পুরুষ জন্ম দিতে পারে নি, বা যারা শুধু মেয়েই জন্ম দিয়েছে, তাদেরকে তিনি কিছুটা অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখেন।
মিসেস হাসিনা বেগমের ছেলে আছে, এবং যথেষ্ট ধন দৌলত আছে। পাত্রীদের তো উপচে পড়ার কথা তার কাছে। কিন্তু তেমনটা হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না তিনি বুঝতে পারছেন না ঠিক। এইসব পাত্রীদের ও তাদের পরিবারদের কীসের এত দেমাগ? তিনি বুঝে পান না। পাত্রীপক্ষ দেখতে গিয়ে তিনি প্রথম যে কাজটা করেন তা হলো পাত্রী ও তার পরিবারকে ছোট করা, তাদের মেরুদণ্ডটাকে ভাঙা, যেন সোজা হয়ে দাঁড়াতে না পারে। তার চার ছেলে, তিনি দাঁড়াবেন সোজা হয়ে। মেয়ের বাড়ি কেন সোজা হয়ে দাঁড়াবে?
তাই তিনি আগে থেকেই কিছু লিস্ট তৈরি করে রেখেছেন, যেমন –
“ভাই, আপনার মেয়েটার মাথায় চুল একটু কম, তাই না?”
“ভাবী, আপনাদের বাসাটা খুব ছোট। এত ছোট বাসায় আজকাল থাকা যায়?”
“ভাই, এসি লাগান নি কেন? যা গরম!”
“এই মেয়ে, তোমার বাড়িতে মেহমান এসেছি আমরা। আপ্যায়ন করো না কেন? এখন শিখবে নাতো কবে শিখবে? এই যুগের ছেলেমেয়েদের যে কি অবস্থা!”
“ভাবী, আমরা তো গেস্ট এসেছি তাই না। আপনার কার্পেটটা যে ময়লা হয়ে গেছে, একটু ধুয়ে টুয়ে রাখবেন না?
“ভাই, বর্ষায় এমন আমাদের দেয়ালও স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে যায়। তাই বলে এভাবেই রেখে দিবেন? আপনার মেয়েকে যে আমরা দেখতে আসলাম, মেয়েটা কোথায় থাকে সেটাও তো দেখার ব্যাপার আছে, তাই না?”
তিন ছেলের বিয়ে দিতে গিয়ে মিসেস হাসিনা বেগম পাত্রী দেখতে দেখতে এরকম আরও অনেক লম্বা লিস্ট বানিয়ে ফেলেছেন। ছোট ছেলের বেলায় তিনি সম্পূর্ণ প্রস্তুত। কিন্তু কেন যেন কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এটা সেটা খুঁত ধরে তিনি কাউকেই সেরকম বিব্রত করতে পারছেন না। পাত্রীদের পরিবারগুলো মাথা উঁচু করেই দাঁড়িয়ে আছে। তারা যে মেয়ে দিবে, তাদের মেরুদণ্ডটা যে একটু ভাঙতে হবে, একটু কুঁজো হতে হবে, এই ব্যাপারটা তারা ঠিক ধরতে পারছে না কেন? এখনই ধরতে না পারলে পরে কি হবে? পরে তো আরও কত গিফট দেয়ার ব্যাপার স্যাপার আছে, কত ফরম্যালিটিজ আছে, সেগুলোর চাপও তো নিতে হবে।
চার ছেলের জননী মিসেস হাসিনা বেগম বুঝতে পারেন না, পাত্রীরা সব লুটিয়ে পড়ছে না কেন তার কাছে। কেন তিনি কিছুতেই ছেলেটার বিয়ে দিতে পারছেন না।
চার ছেলেকে নিয়ে একে একে পাত্রী দেখতে থাকেন হাসিনা বেগম, আর লিস্ট বাড়াতে থাকেন। সুযোগের অপেক্ষায় থাকেন কোনো পাত্রী ও তার পরিবারের মেরুদণ্ড ভাঙার, ভেঙে সেখানে বিয়ে দেয়ার।
আসল ব্যাপার হলো, মেরুদণ্ড ভাঙা পরিবারগুলো কখনো মাথা সোজা করে দাঁড়াতে পারে না। তিনি আর বাঁচবেন কয়দিন। তার ছেলেদের নিরাপত্তা তো তারই দেখতে হবে। মেরুদণ্ড ভাঙা পরিবারগুলো কখনো তার ছেলেদের শোষণ করতে পারবে না। উল্টো তার ছেলেরা পারবে। অতঃপর ওপারে গিয়েও তিনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন।
৩।
১৮৫৮ সাল।
ঔপনিবেশিক যুগ।
– অস্ত্র দিয়ে বেশিদিন দমিয়ে রাখা যায় না
– অর্থ দিয়ে?
– না অর্থ দিয়েও নয়, বেশিদিন নয়।
– কেন?
– অর্থ আজকে প্রয়োগ করতে পারবে, কালকে নাও পারতে পারো
– তাহলে দুর্ভিক্ষ?
– সেটা হতে পারে। কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেটা বেশ কার্যকর। তবে সবসময়ের জন্যে না।
– তাহলে কী করতে হবে?
– তাহলে মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে হবে
– কীভাবে?
– গোঁড়া থেকে শুরু করতে হবে একেবারে। যেমন মুখের ভাষা…
– ভাষা কেড়ে নিব?
– না, রক্তারক্তি হবে। এতে এদের ভাষার জন্যে উল্টো আবেগ উথলে পড়বে। আরো জোর করে আঁকড়ে ধরবে।
– তাহলে?
– তাহলে ভাষাকে দমিয়ে দিব, যেন নিজের ভাষার চেয়ে ঔপনিবেশিক ভাষাকে এরা বেশি সম্মানজনক মনে করে
– আর?
– আর জ্ঞান। দেশি শিক্ষালাভের চেয়ে ঔপনিবেশিক শিক্ষালাভকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ করতে হবে।
– আর?
– আর পেশা। দেশি ব্যবসা/চাকরির চেয়ে ঔপনিবেশিক চাকরি ভালো – এই মূল্যবোধ।
– আর?
– আর সবকিছুর মূলে হীনম্মন্যতা। যা যা নিয়ে এরা গর্ব বোধ করে, এর সবকিছু হীনম্মন্যতার জালে ফেলে দাও। তখন নিজেরাই নিজেদের সব খোয়াবে।
– তাহলে তো এরা পরে নিজ দেশের চেয়ে উপনিবেশ স্থাপনকারী দেশগুলোতে থাকা-খাওয়াও বেশি মর্যাদার ভাববে, সব সেদিকে ছুটবে।
– অবশ্যই। এবং সেদিনই আসল দখলদারিত্ব ঘটবে। কারণ রাজ্য দখল মূল নয়, মূল দখল হচ্ছে মনে।
– এরপর?
– এরপর তুমি শুধু বেচে যাবে, তারা কিনে যাবে। ঔপনিবেশিক জ্ঞান, ঔপনিবেশিক পণ্য, ঔপনিবেশিক মূল্যবোধ। তারা আত্মপরিচয় ভুলে যাবে। ঔপনিবেশিক পরিচয় গড়তে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বে।
– এরপর?
– এরপর আজীবন তাদের শাসন করতে পারবে। যদি একবার শুধু মেরুদণ্ডটা ভাঙতে পারো।
– তাহলে কি আমরা নিরাপদে থাকব?
– হ্যাঁ। এরপর আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
