মসলার যুদ্ধ।
বইটা শুরু করার আগে ধারণা ছিল যে এখানে পড়ব কীভাবে মসলার লোভে ঔপনিবেশিকরা এই অঞ্চল দখল করেছিল এবং আমাদের পূর্বপুরুষদের উপর জুলুম নির্যাতন করেছিল।
এই ইতিহাস আমি পেয়েছি ঠিকই। যে প্রথম পর্তুগীজরা কীভাবে আসে, এরপর ডাচরা, এরপর ব্রিটিশরা।
কিন্তু তার চেয়েও অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি যে আমাদের মাটির মানুষেরা কতটা সরল শান্তির মানুষ, কতটা ঐক্যবদ্ধ মানবিক অসাম্প্রদায়িক ইতিবাচক মানুষ …

কারণ মসলা নিয়ে বাণিজ্য কিন্তু সবারই ছিল। আরব, ভারত, চীন বহু বছর ধরে করে আসছিল। কখনো যুদ্ধ দাঙ্গার সেইভাবে প্রয়োজন হয় নি। এমন হয়েছে যে বণিকরা একেক দেশে যেয়ে সেখানেই থাকা শুরু করে দিতেন এবং সেখানের মানুষদের সাথে মিশে যেতেন। নানান ধরণের রূপের ধর্ম চিন্তা চেতনা দর্শন অনেক ক্ষেত্রে তাদের হাত ধরেই একেক দেশে পৌঁছেছে। এখানে জোরাজুরি করে নিজ ধর্মে বা বিশ্বাসে রূপান্তরিত করার কোনো ব্যাপার ছিল না।
তবে হ্যাঁ, যুদ্ধ যেটুকু হতো সেটা ছিল ক্ষমতার লড়াই। অর্থাৎ একেক প্রদেশের রাজা অন্য প্রদেশ দখল করে রাজ্য বাড়াতে চাইতেন। এটা সবখানেই সবসময় ছিল। কিন্তু সে লড়াই এতটা প্রকট ছিল না। মানুষ যথেষ্ট সুখী ছিল।
লড়াই প্রকট হলো যখন ঔপনিবেশিকরা একতরফা সব পেতে চাইল। দখলদারিত্ব করতে চাইল। যে সব আমার! আর বাকি সব গোলাম!
এর আগে কেউ দখলের লোভে এভাবে উন্মত্ত হয় নি।
পর্তুগীজরাও ব্যবসা করতো। কিন্তু সমস্যা শুরু হলো যখন তাদের লোভ দানবীয় রুপে প্রকাশ পেল। একচেটিয়া ব্যবসা করতে তারা জলের উপর এখন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে অন্যদের মনে ভীতি সঞ্চারের আয়োজন করল সাধারণ মানুষদেরকে জ্যান্ত পুড়িয়ে। এরপর আরও নানা নির্বিচারের বর্ণনা আছে, যেগুলো না করলে তাদের এইভাবে এত দ্রুত সব দখল করা সম্ভব হতো না। কারণ তারা মানব নয়, দানব হয়ে জয় করতে চেয়েছিল।
এবং আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করার মতো যে, ঘরের শত্রুর প্রশ্রয় ছাড়া বাইরের শত্রু আসলে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। সেই সময়ে গুজরাটের রাজা এবং আরও কয়েক প্রদেশের রাজারা বেঈমানি করার ফলেই ঔপনিবেশিকরা শেষ পর্যন্ত এইদিকে দখল করতে পেরেছিল।
আর এই সব হলো কেবল আমাদের মসলাকে কেন্দ্র করে। রোজ রোজ সে হলুদ মরিচ এলাচ লঙ্কা আমরা গণায় ধরি না, তাই নিয়ে এই কান্ড!

সত্যেন সেন ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি বিপ্লবী, সাহিত্যিক এবং শ্রমিক-সংগঠক। এই বইটা তিনি কারাগারে বসে লিখেছিলেন।
এই বই পড়ার মধ্য দিয়ে দুটো জিনিস হবে – এক, বাংলার মাটির মূল্য বোঝা – অর্থাৎ আমাদের মসলা যে সোনা হীরা বা আরব তেলের খনির চেয়ে কোনো অংশে কম না, সেই উপলব্ধি।
এবং দুই, আজকে যেমন আমেরিকা ও তার সহযোগীরা সাধারণ মানুষের উপর জুলুম করেছে করছে তেলের লোভে, তা যে আমাদের উপরও হয়ে গেছে শত বছর আগে, আমাদের মসলার লোভে – সেই সত্য চোখের সামনে দৃশ্যমান হবে।
অনেক সময় মনের সামনে দৃশ্যমান হলেই হয় না, চোখের সামনেও দৃশ্যমান হতে হয়। তো এই বই দুইটাই করবে। এরকম আরও কেউ লিখেছে কিনা জানা নেই, তবে লেখা থাকলে আমাদের পড়া উচিৎ।
কারণ কয়েকশ বছরের জুলুমের ইতিহাস এবং বর্তমানের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য এখনো সৃষ্টি হয় নি।
আবারো বলছি, সত্য যেমন এক, মানুষও তেমন এক। কোনো গোত্র/অঞ্চল ধরে কাউকে ছোট করার কোনো চেষ্টা আমার নেই। তবে শেকড়কে জানাটা অপরিহার্য।
কারণ আমি আপনি হয়তো ভুলে যাব, অন্যেরটা দেখে বাহবা করব। কিন্তু অন্যেরা কিন্তু ভোলে না। তারা ঠিকই আপনার ভালোকে ধাপাচাপা দেয়ার চেষ্টায় ব্রত হয়ে থাকবে। আপনার সংস্কৃতি আপনার শেকড়কে উপড়ে ফেলতে চাইবে।
কেন?
কারণ তাতেই তাদের মুনাফা। তাতেই তাদের ব্যবসাটা আরও ভালো হবে। আরও একচেটিয়া ব্যবসা করার সুযোগ পাবে।
কারণ হিসেবটা কখনো কেউ এরকমভাবে করে – আপনি যত ছোট হবেন, তারা তত বড় হবে!
ঔপনিবেশিকতার চাল এখনো চলছে।
আরও কিছু কথা…
জ্ঞান এক। সত্য এক।
আমি আমার কথার মধ্যে বারবার “ঔপনিবেশিক” শব্দ উচ্চারণ করে যেন পশ্চিমাদের সাথে একটা ভেদাভেদ তৈরি করে ফেলি। এর ব্যাপারে আমি সচেতন। কারণ সবাই তো মানুষ। জাতি ধর্ম বর্ণ গোত্রের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই।
তবে কেন “ঔপনিবেশিক” বলে পশ্চিমের কিছু মানুষকে বা চিন্তা-চেতনাকে আলাদা করা?
কারণটা খুব সহজ। আমি আমার মাটিতে থেকে এখনো ঔপনিবেশিকতার তীব্র গন্ধ পাই।
আমি দেখি যে অনেক জ্ঞানী ব্যক্তিরাও “ঔপনিবেশিক” চেতনাকে যতটা আপন করে নেন, নিজের শেকড়কে ততটা করেন না। নিজের শেকড় সম্বন্ধে জ্ঞান সব ভাসাভাসা।
কিন্তু “ঔপনিবেশিক” চিন্তাধারা স্পষ্ট। এত স্পষ্ট যে কিছু ব্যাপার যে “ঔপনিবেশিক”, সেটাই প্রায় আলাদা করা যায় না।
আমরা আমাদের আগের জেনারেশনের মানুষদের দোষ দেই। বাবা মারা বোঝেন না, আত্মীয় স্বজন বোঝেন না। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, আমরা যারা তরুণ প্রজন্ম এবং আগামী তরুণ প্রজন্ম, আমরা কিন্তু আরও বেশি বুঝি না।
আমরা কার্ল মার্কস, বারট্রান্ড রাসেলের যতটা নাম শুনি, আমাদের মাটির হাজার বছরের দার্শনিকদের নাম কিন্তু ততটা শুনি না।
আর বাংলার মাটিতে দর্শন মানে তত্ত্ব নয়। দর্শন মানে তত্ত্বের জলজ্যান্ত প্রয়োগ, এবং সাধনা। সে দর্শনের কতটুকু আমরা জানি বা জানতে চাই?
এর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ আমি নিজে। স্কুলে পড়তে আমি নীলক্ষেত চষে বেড়িয়ে খুব অল্পমূল্যে বার্ট্রান্ড রাসেল, ক্যামস, মার্কস জোগাড় করেছি। তখনই আমার হাতে পৌঁছে গেছে “ঔপনিবেশিক” জগতের উৎকৃষ্ট মানুষদের মহত্ত্ব। সেই কিশোরী মেয়ে আমি এই “ঔপনিবেশিক” মেসেজটা পেয়ে গেছি – যে সব জ্ঞান ঐ পশ্চিম থেকে লাভ করতে হবে। ওরা বেশি জানে, আমরা জানি না। ওরাই বোধয় আলোকিত!
কিন্তু বড় হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোঠা পার হবার সময় যখন শেকড়কে খুঁজতে লাগলাম (এই ক্ষেত্রে আমাকে পুরোটাই কিন্তু পরিচয় করিয়ে দিয়েছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন। সেখানে ধ্যান চর্চা করতে গিয়ে আমি শেকড়ের মানুষদের সত্যি সত্যি চিনতে শুরু করেছি। কোয়ান্টামের কেন্দ্রগুলির দেয়ালে দেয়ালে দেখেছি বাংলার ঋষি ও মহামানবদের ছবি ও পরিচিতি, তাদের সব প্রোগ্রামে আলোচনায় শুধু পেয়েছি বাংলার মহান মানুষদের নাম। এই ব্যাপারে কিছু লিঙ্ক লেখার নিচে দিয়ে দিচ্ছি।), নীলক্ষেতে দোকানে দোকানে চষে বেড়াতে লাগলাম রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, হজরত শাহজালাল, বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী, বেগম রোকেয়া, ড. জিসি দেব এবং আরও অনেক অনেক অনেকের খোঁজে – তখন আর তেমন বই পাই না।
মানে আমার শেকড়ের বই আমার কাছে সহজলভ্য না!
খুঁজে খুঁজে প্রকাশনীতে ফোন দেয়া লাগে। তাও আবার প্রকাশ বন্ধ থাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কারণ এই বই পড়ার লোক নাই।
এটা কি ঔপনিবেশিকদের চরম সাফল্য নয়?
আমরা কেন ভাবি না যে আমি যতই বড় হই না কেন, যত আন্তর্জাতিক পুরষ্কার যত নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়ে যত সম্মান কুড়াই না কেন – আমি যদি আমার শেকড়কে না জানি, আমার শেকড়কে যথাযথ মর্যাদা না দেই, তাহলে আমি খুব ছোট হয়ে থাকব আমার মনের ভেতরে। খুব ক্ষুদ্র একটা মানুষ হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেব?
কোনো পুরষ্কার ডিগ্রী তো মানুষকে বড় করতে পারে না।
মানুষকে বড় করতে পারে শুধু তার জীবন। যে সে কীভাবে বাঁচল…
লিঙ্ক –
জি সি দেব : ২৫ মার্চের কাল রাতে যে মহান মানুষটিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল
স্বামী বিবেকানন্দ : তার জীবন ও শিক্ষা
বেগম রোকেয়া : নিজের স্বপ্নকে নিজে দেখে যেতে না পারলেও পরবর্তী প্রজন্ম যা বাস্তবায়িত করেছে
এম এন রায় : মানবতাবাদী শোষিতের পক্ষের একজন নিঃস্বার্থ সৈনিক
