দেখা না দেখা

“চল, আজকে আমরা পৃথিবীটাকে দেখতে বের হবো”, নীলিমা খুব সহজ ভঙ্গিতে  বলে, যেন পৃথিবী দেখার উদ্দেশ্যে শুক্রবার বিকেল ৪টায় ঢাকার রাস্তায় বের হওয়াটা বেশ স্বাভাবিক ব্যাপার।

 “পৃথিবী? মানে?”, একটু চমকে গেলেও দ্রুত সামলে নেয় সুনীল। নীলিমার সাথে থেকে চমকানোটা একটা দৈনন্দিন ব্যাপার। 

“মানে তুমি আমি রিক্সায় করে ঘুরব। ২ ঘণ্টা। ভাড়া ২৫০ টাকা। মধুবাগ থেকে রিকশা নিব, খিলগাঁও হয়ে বেইলি রোড হয়ে গুলিস্তানের দিকে যাব। অবশ্য মন চাইলে অন্য দিকেও যাওয়া যায়, রামপুরার দিকে যাওয়া যায়…”  

“তো এভাবে পৃথিবী দেখবে?” 

“উঁহু, দেখব না, দেখাব” 

“দেখাবে কেন?” 

“কারণ পৃথিবীকে না দেখলে নিজেকে দেখতে পাবে না তুমি। আর নিজেকে দেখতে না পেলে আমাকে দেখতে পাবে না”, দার্শনিক সুরে বলল নীলিমা। 

“তোমাকে কে বলেছে আমি তোমাকে দেখতে পাই না?”, আদর ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে সুনীল। নীলিমা অভিমান করলে মান ভাঙাতে ভালো লাগে। কিন্তু দেখা হওয়ার শুরুতেই সাধারণত সে অভিমান নিয়ে আসে না। 

“আমাকে না, তুমি তোমাকেও দেখতে পাওনা সুনীল। তুমি অনেক ব্যস্ত একটা মানুষ।”
 
“এখন বুঝি রাগ ঝাড়বে? সময় দেই না বলে?”  

“উঁহু, আগে চল তো”  

আজ শুক্রবার। নীলিমা প্রতি শুক্রবারে শাড়ি পড়ে বের হয়। আজ হয়নি। বেশ সিরিয়াস মুডে আছে মনে হচ্ছে। নীলিমার এই অদ্ভুত মুড পরিবর্তনে সুনীল অবাক হয়না একটুও। নীলিমার অনেক রহস্য সুনীলের জানা নেই। নীলিমার ভাবনার জগতটা বড় অদ্ভুত। সে কি একটা যেন খুঁজে বেড়ায়, রাত দিন পরিশ্রম করে। প্রায়ই বলে যে পৃথিবীর আশি ভাগ ধনীরা নাকি সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত কারণ তাদের মত এত সংকুচিত মন নিয়ে বেঁচে থাকা কষ্টকর। কি অদ্ভুত কথা! নীলিমা কেন এত ভাবে? এত ভেবে কী হবে? সুনীলের মনে প্রশ্ন জাগলেও নীলিমার মনের রহস্যগুলো সমাধান করতে যায় না। রহস্যগুলো থাকলে ভালো লাগে। ৯টা ৬টার একঘেয়ে জীবনে নীলিমার রহস্যেরা একটু ঘিরে থাকলে ভালো লাগে,  জীবনটাকে একটু হলেও অন্যরকম লাগে।

রিকশায় বসেই নীলিমা আদেশ করে, “আমার চোখের দিকে তাকাও তো”  

একটু রোমান্টিক মুডে ঝুঁকে আসে সুনীল, “এই যে তাকালাম” 

“বলতো আজকের আকাশের রঙ কি? উঁহু চোখ সরাবে না…” 

“কি আর হবে, আকাশী?” 

নীলিমা খিল খিল করে হাসে।

সুনীল উপরে তাকায়। আকাশের রঙ দেখবার প্রয়োজন ছিল না, তবুও তাকায়। আচ্ছা, আকাশটা খুব হালকা একটা নীল, খুবই হালকা। মনে হয় পাতলা মেঘের আবরণ দেয়া, সাদার সাথে আকাশের নীল মিশে গেছে কিছুটা। আচ্ছা আকাশের না সুন্দর একটা নীল ছিল, কেমন গাঢ় নীল? সে নীলটা কোথায়, প্রতিদিন সে রঙটা দেখা যায় না?

“এখন বিকেল ৪টা বাজে অথচ এখন পর্যন্ত আজকের আকাশটাকে তুমি দেখো নি!”, নীলিমার কন্ঠে অভিযোগের সুর।

“হ্যাঁ, আমি আকাশ ওভাবে দেখি না নীলিমা”, আকাশ দেখতে দেখতে বলে সুনীল।

“এখন তো দেখছ, খারাপ লাগছে?”

“হাহা, না, ভালো লাগছে। এটা হচ্ছে শুক্রবারের লাক্সারি”, সুনীল আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে নীলিমার দিকে চেয়ে উত্তর দেয়।

“লাক্সারি হতে যাবে কেন, এটা তো ফ্রি!”

“আমার জীবনটাতো আকাশকে ঘিরে নয় নীলিমা। আকাশের বিশালতাকে তো আমরা পকেটে পুরতে পারি না”

“জীবিকাই কি সব?”

“না, তবে জীবিকা অনেক কিছু”

“কিন্তু অনেক কিছুই কি শেষ পর্যন্ত সব হয়ে যায় না?”

“হ্যাঁ যায়, এজন্যে তো তোমার সাথে রিকশায় ঘুরছি, যাতে সব না হয়ে যায়!”

“সুনীল আমি না একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি, এজন্যে আজকে তোমাকে নিয়ে রিকশায় এভাবে ঘুরছি”

“কি ব্যাপার?”

“আমরা আমাদের ঠিক দেখতে পাই না সুনীল… আমরা যা ভাবি, এর বাইরে ভাবতে পারি না, আমরা শুধু আমি নিয়ে ভাবি …” , নীলিমার স্বর কেমন ঘোলাটে হয়ে আসে। তার মানে আসলেই তাকে ব্যাপারটা নাড়া দিয়েছে ।

“সবাই তো সারভাইভেল চায় নীলিমা…”

“সেটা তো পশু পাখিও চায়। আমরা তো মানুষ, তাই না?”

“হ্যাঁ কিন্তু মানুষকে তার জীবিকা যোগাড় করতে হয়, পশু পাখিদের হয় না”

“পশু পাখি দিন রাত খোঁজে। আমরাও খুঁজি। আমাদের খোঁজাটা শুধু ভিন্ন। কিন্তু দেখ, এর বাইরে একটা অদৃশ্য শেকল আছে…”

“কেমন?”

“একটু পর বলছি”

নীলিমার এই ব্যাপারটা সুনীলের ভালো লাগে না। কথার অর্ধেক এসে কথা আর নেই। এখন জোরাজোরি করলেও লাভ নেই। যা হবে দুজনের কথা কাটাকাটি হবে। এক পর্যায়ে নীলিমা রেগেমেগে রিকশা থেকে নেমে যাবে, এবং সুনীলের মন উসখুস করে। 

“সুনীল, একটা খেলা খেলবে?”

মুড নিয়ে, “হু”

“আহহা, বল না, খেলবে কি না?”, সুনীলের হাত ধরে নীলিমা টান দেয়

সুনীল একটু নরম হয়, “কি খেলা, বলো।”

“আমরা দুজন একই সাথে একটা কিছুর দিকে তাকাবো, এরপর আমাদের মধ্যে যে চিন্তাটা আসে তা দুজন দুজনকে জোরে জোরে বলব!”

“এটা আবার কেমন খেলা?”

“উফফ আসো আগে শুরু করি”

নীলিমার কন্ঠে অস্থিরতা। তার মানে আরও আগে থেকেই নীলিমার মাথায় এটা ঘুরছিল। সুনীল রিকশামামার দিকে তাকায়। লোকটা হাসছে নাকি বোঝা যাচ্ছে না। না জানি ভাবছে কোন পাগলের পাল্লায় পড়লাম। বাসায় গিয়ে হয়ত বলবে,“ওগো বুঝলা, আইজকা দুই ছেরাছেরি উডছিল রিক্সায়। কি যে কয় না কয়। পোলাডায় আধ পাগল, মাইয়াডা পুড়াডাই পাগল। গরীব পাগলের ভাত নাই, আর বড়লোক হইয়া পাগল হইলে বুঝলা, কোনো কূল কিনারা নাই হেগো! আজগুবি দুনিয়া!”

“সুনীল ঐ ছাদটা দেখো, ঐ যে পানির ট্যাঙ্কসহ ছাদটা, হালকা নীল রঙের বিল্ডিঙটার..”

সুনীল অসহায় বোধ করে, “হুম”

“কি ভাবছ এখন বলো ?”

নীলিমা নাছোড়বান্দা মানুষ। একবার যেটা মাথায় ধরে সেটা করেই ছাড়বে। অতঃপর সুনীল যোগ দেয়,
“উমম… ছাদটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা লাগছে, বেশ উঁচুতে। ওখানে বসে চা খেতে ভালো লাগবে”

নীলিমা অংশ নেয়, “আমি ভাবছি যে তোমাকে নিয়ে ঐ ছাদের উপরে গল্প করতে পারতাম রোজ রোজ, তারা দেখতে দেখতে”


সুনীল ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। নীলিমার হাতে চায়ের কাপ, পাশে সুনীল দাঁড়িয়ে। দুজন দূরে তাকিয়ে কি যেন দেখছে আর গল্প করছে।  

“এবার ঐ লোকটাকে দেখো, কি যত্ন নিয়ে ভ্যানের সবজিগুলো সাজাচ্ছে”

সুনীল তাকায়।

“কি ভাবছ?”

“ভাবছি লোকটা আমার চেয়েও বেশী খাটে কিন্তু আমার চেয়ে বেশী সুখী”

“এবার তুমি কি ভাবছ বল?”, সুনীল জিজ্ঞেস করে

“আমি ভাবছি যে তুমি সব্জিওয়ালা হলে তোমাকে বিয়ে করে কি কি লাভ হত। বাজার করতে হতো না, টাটকা সবজি পেতাম…হিহি”

সুনীল হাসে। খেলাটা ভালো লাগছে। এমনই হয়। নীলিমা পাগলামিটা আগে শুরু করে, এরপর সুনীল কনটিনিউ করে।  

“নীলিমা, ঐ গাড়ীটাকে দেখ, নীল সেডানটা। ধর আমি যদি সব বিক্রি করে এই গাড়িটা কিনে ওটার ভেতরেই ঘর সংসার শুরু করি, রাজি হবে?”


নীলিমা আবার খিলখিল করে হাসে। নীলিমার হাসির এই আওয়াজটা সুনীলের ভালো লাগে। এর একটা অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে যে হাসার সময় নীলিমাকে এক রকম সুন্দর লাগে, আবার না তাকিয়ে তার হাসিটা শুধু শুনলে আরেকরকম সুন্দর লাগে। সুনীল এখন রাস্তার দিকে তাকিয়ে নীলিমার হাসি শুনছে।

“সুনীল ট্রাফিক লাইট দেখো, এখন এটা নিয়ে বলো”

“উমম, বেশী কিছু ভাবার নেই তো, ভাবছি রেড সিগন্যাল না পড়লেই হয়”

“এই গাছটাকে দেখ সুনীল… এটা একটা বটগাছ। কত শাখা প্রশাখা মেলে দিগন্ত জুড়ে বিস্তৃত হতে পারতো। আর এখন পান্থপথের ধুলোময়লা খেয়ে খেয়ে শুকিয়ে গেছে”

“এই গাছটাকে দেখে আমার নিজেকে অফিসের ভেতর মনে হচ্ছে”

নীলিমা হো হো করে হেসে ওঠে। এই হাসিটা সুন্দরের হাসি না, পাগলাটে টাইপের হাসি, বাঁধছাড়া হাসি। এই হাসির সময় নীলিমার দিকে তাকাতে খুব মজা লাগে, আস্ত একটা কার্টুনের মতন লাগে ওকে।  

“আচ্ছা সুনীল এবার এই ভাঙ্গাচুরা পাবলিক বাসটাকে দেখো”

“এই টাইপ বাসগুলোকে বলে মুড়ির টিন”

সুনীল চায় নীলিমা আরেকটু হাসুক। নীলিমা হাসে, হাসতে হাসতে বলে,
“সুনীল আমি না খুব সিরিয়াস একটা ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে এটা খেলছিলাম, এখন হাসি থামাতে পারছিনা। এটা হলো?”

“ক্ষতি কি? তুমি হবে আমার মহীয়সী হাসিবতী”

“হিহি, লাফিং বোদ্ধার মতন!”

“একদম!”

“সুনীল একটা জিনিস খেয়াল করেছ, আমরা এতক্ষণ কি দেখছিলাম?”

“কি দেখছিলাম – ছাদ, গাছ, মানুষ, গাড়ি…”

“হ্যাঁ কিন্তু এসবকিছুকে কিন্তু আমরা দেখিনি। আমরা দেখেছি আমাদেরকে…”

“আমাদের মানে?”

“যেমন ধরো, ছাদটাকে না দেখে আমরা দেখেছি ছাদের উপর আমাদের, গাড়িকে না দেখে দেখেছি গাড়ির ভেতর আমাদের সংসার, গাছকে দেখেছি তোমার অফিসে, এমনকি সব্জিওয়ালাকেও আমরা তুমি বানিয়ে দিলাম, বানিয়ে আমি আবার সব্জিবিক্রেতার বউও হয়ে গেলাম!”

সুনীল কিছুটা ভড়কে যায়। নীলিমা যা বলছে সত্যি, আসলেই সত্যি! কি অদ্ভুত ব্যাপার। সুনীল এতক্ষণ যা দেখেছে তা সব নিজেকে দেখা। বাহিরের কিছু বা নতুন কিছু সে দেখেনি। কোনোদিন দেখেছে কিনা সেই প্রশ্ন জাগছে মনে।

নীলিমা বলতে থাকে, “আমরা সবকিছুকে আমাদের ভেবে দেখি। আমিত্ব থেকে আমরা বের হতে পারি না…”

“আসলেই…কি অদ্ভূত…”

“এটা না আমি আগে লক্ষ্য করিনি, জানো। সেদিন বাসে ফিরবার পথে খেয়াল করলাম। এত দুশ্চিন্তায় ছিলাম…নিজের সব চিন্তাগুলোর মধ্যে ডুবে থাকতে অসহ্য লাগছিল, তাই আশেপাশে তাকালাম। ভাবলাম অন্য কিছু দেখি, ভাবি, নিজেকে বাদ দিয়ে। পারলাম না …”


সুনীল চুপ করে শুনে। নীলিমার অনুভূতিগুলো কীভাবে যেন খুব দ্রুত সুনীলের মাঝে বিকিরণ হয়। সুনীলও এই চিন্তায় ডুবে যায়। বিড়বিড় কর বলে উঠে, “আমিও পারছিনা নীলিমা, নিজের গন্ডির বাইরে ভাবতে, আসলেই পারছি না…”

নীলিমা সুনীলের চোখের দিকে তাকায়। সুনীলের মতন যান্ত্রিকতায় অভ্যস্ত একটা মানুষ কীভাবে নীলিমার জগতে ঢুকে যায়, নীলিমা বুঝে পায় না। সুনীল এখন সত্যি সত্যি নীলিমার চিন্তার ভেতর ঢুকে গেছে। সুনীল এই প্রথম তার ভেতরে আমিত্বের কারাগার আবিষ্কার করেছে। এই চিন্তা থেকে বের হতে তার সময় লাগবে।

নীলিমা সুনীলের হাতটা নিয়ে কোলে রাখে। সুনীলের হাতগুলো সবসময় উষ্ণ থাকে, অথবা হয়ত নীলিমার কাছেই এমনটা মনে হয়। সুনীলের ভেতর একটা চিন্তাশীল ব্যাক্তি বাস করে, যে সত্য খোঁজে, গভীরতা খোঁজে, আধ্যাত্মিকতা খুঁজে। সুনীল নিজেও সেটা টের পায় না। সুনীল জানেও না যে এই কারণেই সে নীলিমার কাছে বারবার ছুটে আসে। কারণ নীলিমার কাছে এলে সে তার এই সত্ত্বাকে প্রকাশ করতে পারে। সুনীল ভাবে যে এটা ভালোবাসা, নীলিমা জানে এটা তা নয়। ভালবাসতে সুনীলের প্রথম প্রয়োজন নিজেকে আবিষ্কার করা। নীলিমা সুনীলকে সাহায্য করতে চায়, সুনীলের খাঁচা থেকে সুনীলকে মুক্ত করতে চায়। যদি কখনো সুনীল সত্যিই মুক্ত হয় তাহলে হয়তো তাকে সংসারলোকে পাওয়া যাবে না আর। নীলিমা জানে। তবুও নীলিমা তার সবটা দিয়ে সুনীলকে মুক্ত করতে চায় কারণ সুনীলকে সে মনেপ্রাণে ভালবাসে।


2 comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *