যা চলে যায়, যা রয়ে যায় …

গল্পটি একজন বিখ্যাত চিত্রশিল্পীর। তিনি তখন তার জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে, শয্যাশায়ী। আর্থরাইটিসে আক্রান্ত হয়ে তার শরীর প্যারালাইজড। এই অবস্থাতেই তিনি প্রতিদিন আঁকতেন। তার নার্স আঙ্গুলের মধ্যে একটি ব্রাশ ধরিয়ে দিতেন এবং একটু একটু করে তিনি আঁকতেন। এভাবে আঁকার সময় তার ভয়ানক যন্ত্রণা হতো, তবু এই যন্ত্রণাটুকু নিয়মিত সঙ্গী করেই তিনি এঁকে যেতেন।

ততদিনে দিনে তিনি যথেষ্ট খ্যাতিমান, তার কাজ যথেষ্ট সম্মান সুনাম অর্জন করেছে। কিন্তু এরপরও জীবনের শেষ সময়ে এসে এভাবে নিজেকে রোজ রোজ যন্ত্রণা দিয়ে শিল্পকর্ম চালিয়ে যাওয়া দেখে তার এক বন্ধু প্রশ্ন করেছিলেন, “এত কষ্ট করে, এত যন্ত্রণা সহ্য করে আঁকার দরকারটা কি তোমার?”

জবাবে তিনি বলেছিলেন,

“এই যন্ত্রণাগুলো কষ্টগুলো একটা সময় চলে যাবে, কিন্তু সুন্দর একটা কাজ রয়ে যাবে…”
“The pain passes, but the beauty remains.”

 সেই ফরাসি চিত্রশিল্পীর নাম পিয়ের অগাস্টে রেনোয়ার। তিনি ঠিকই বলেছিলেন। তার শারীরিক যন্ত্রণাগুলো কষ্টগুলোর সাথে তিনিও শেষ পর্যন্ত চলে গেছেন, কিন্তু তার কাজটা রয়ে গেছে। তিনি তার জীবন দিয়ে একটি সুন্দর কথা বলে গেছেন – সেই সুন্দর কথাটুকু রয়ে গেছে।

আমার এক চিত্রকর বন্ধু আছে, যে ভয়ানক মানসিক চাপে থাকে প্রতিনিয়ত। এই চাপের ফলে সে আঁকতে পারেনা নিয়মিত। আমি একজন তরুণ লেখিকাকে চিনি, যে পারিবারিক সমস্যায় জর্জরিত থাকে, তাই প্রতিদিন লিখতে বসে না। তার গল্পগুলো সব আধা পড়ে থাকে। একজন যুবককে চিনি যার মাথায় দারুণ বিজনেস প্ল্যান, কিন্তু বেকারত্ব নিয়ে সবসময় কথা শুনতে হয় দেখে সে সংকুচিত হয়ে থাকে। কাজগুলো সব থেমে থাকে।

আমি আপনি সবাই জীবনে কোন না কোনদিক দিয়ে প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাই। হয়ত আমরা এটাকে সামলাতে পারছি, হয়ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ভালো থাকতে পারছি,

কিন্তু মধ্য দিয়েও আমরা আমাদের সেরা কাজটা কি দিতে পারছি?

এই প্রশ্নটা করছি কারণ একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম, যে পজিটিভ থাকা যতটা প্রয়োজন, একই সাথে, জীবনে যে কোন প্রতিকূল অবস্থায়ও নিজের সেরা কাজটা দেয়াও ততটাই প্রয়োজন।

আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের কাছে একদিন শুনেছিলাম যে ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র এমন কোন প্রতিকূলতা নেই, যার মধ্য দিয়ে তিনি যাননি। তাই মজা করে তিনি বলতেন, “নাম অনুকূল হলে কী হবে…”

 আমি চলে যাব, আপনি চলে যাবেন, সবাই চলে যাবে। কষ্ট যন্ত্রণা আফসোস বেদনা কিংবা হাসি আনন্দ উল্লাস – সবই আমাদের সাথেই যাবে। কিন্তু একটা সুন্দর কাজ, একটা সুন্দর কথা – রয়ে যাবে।

কিছুদিন আগে একজন কলিগের কাছ থেকে শুনলাম যে তার নাকি এক বন্ধু আছে যে খুব সুন্দর কবিতা লিখে। কিন্তু কবিতাগুলো সে লেখে রাস্তায় কুঁড়িয়ে পাওয়া ঠোঙার উপর বা ফেলে দেয়া টুকরো কাগজের উপর। তার কবিতা আমি কোনদিন পড়িনি, তাকে আমি চিনিও না। কিন্তু এই অদ্ভুতভাবে জীবনকে দেখার ব্যাপারটা ভালো লেগেছে। ফেলে দেয়া জিনিসকে কবিতা দিয়ে রিসাইক্লিং করা ব্যাপারটা ভালো লেগছে। আপাতত খুব ক্ষুদ্র মনে হলেও তার কাজটা আমার মধ্যে গেঁথে গেছে, হয়ত আপনাদের কারো মনেও গাঁথবে।

ভুবনজোড়া খ্যাতি হোক কিংবা না হোক, কখন কীভাবে কার হৃদয়ে কোন কথাটা কোন কাজটা যে রয়ে যায়, তা আসলে কেউ বলতে পারে না। তবে মানুষের মধ্যেই তা রয়ে যায়। মানুষেরা মানুষের মাঝেই বেঁচে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *