প্রত্যেকটি ভালো কাজ…

প্রত্যেকটি ভালো কাজই সৎকর্ম, সাদাকা বা দান বা সেবা।
—জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা); বোখারী, মুসলিম 

প্রত্যেকটা ভালো কাজ। ভালো কাজ অর্থ কী? ভালো কাজ তো তাই যা নিজের ও অন্যের কল্যাণে করা হয়। 

নিজের কল্যাণটা করা কিন্তু সহজ নয়। আমরা অনেকেই পারি না, কারণ আমরা শিখি না। শিখি না কারণ আশেপাশে দেখি না। বা নিজের কল্যাণকে স্বার্থের সাথে মিলিয়ে ফেলি অনেক সময়। অথচ ব্যাপারটা একদম বিপরীত। যে নিজের কল্যাণে কাজ করবে সে কখনোই স্বার্থপর হতে পারবে না, কারণ স্বার্থপরতা-বোধ তাকে পীড়া দেবে। 

তো প্রত্যেকটা ভালো কাজ। 

ধর্মের গন্ডিকে আমরা কত সংকীর্ণ বানিয়ে ফেলি। কিছু পোশাকি ব্যাপার, জায়নামাজে উঠবস, রোজার দিনে না খেয়ে থাকা আর মুখস্থ কিছু আরবি আউড়ে যাওয়াটাই ধার্মিক ভালো কাজের কাতারে ফেলি। (এখানে আবার ভুল বুঝবেন না। নামাজ, রোজা, মার্জিত পোশাকের শুদ্ধাচার এগুলো মহৎ ব্যাপার। আমি বোঝাচ্ছি যে এগুলোকে খোলস ব্যবহার করেন অনেকে, মন থেকে পালন না করে)। বা অবচেতনভাবেই কিন্তু ব্যাপারটা ভেবে ফেলি। 

অথচ দেখুন, আপনি আজ সকালে ঘুম থেকে উঠলেন, বাসা থেকে বের হলেন, তখন আপনার দারোয়ান গেট খুলে দিল। সেই লোকটা কত বেতন পায় আর তার সংসারে কতজন? যে আর্থিক টানপোড়নের মধ্য দিয়ে তাকে চলতে হয়, তার জন্যে অসদোপায়ে আয় করাটা সহজ। কিন্তু সে করছে না। সে তার আয়কে শুদ্ধ রাখছে। তার মর্যাদা কিন্তু ধার্মিক দিক দিয়ে অনেক ওপরে। আপনি তাকে সালাম দেন, বা একটু হাসি দেন। বা আপনার মন মেজাজ যাই থাকুক, ঠিক করুন যে রোজ যে মানুষটার সাথে দেখা হয় সে মানুষটার সাথে আপনি আপনার মেজাজ অনুযায়ী আচরণ করবেন না। সবসময় ভালো আচরণ করবেন। আপনার জন্যে হয়তো এটা তেমন কিছুই না। রোজ তার সাথে কতক্ষণের জন্যে আর দেখা হয়? ৫ সেকেন্ড? ১০ সেকেন্ড? এইটুকু সময়েই তার সাথে ভালো থাকুন। এই মানুষটার প্রতিদিনের একটা ভালো সময়ের অংশ হবেন আপনি। এই মানুষটা মনে রাখবে যে অমুক স্যার বা আপা কখনো আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে নাই। দেখলেই একটা হাসি দেয়। হাসি দিয়ে কথা বলে। 

কত ছোট্ট একটা কাজ। এই কাজটুকু দেখার কোনো দর্শক নেই। কিন্তু স্রষ্টা তো দেখছেন। এই কাজটা ধার্মিক। এই কাজটা পুণ্যের। এই কাজের কথা হাদীস বলে। প্রতিটা ভালো কাজ…। 

বা দেখুন, এই যুগে হয়তো প্রচুর স্প্যাম কল আসে কাস্টোমার কেয়ার থেকে আপনার ফোনে। ব্যাপারটা খুবই বিরক্তিকর লাগে আপনার কাছে। এই কোম্পানিগুলোকে ধরে ধরে মামলা দিতে ইচ্ছে করে অসময়ে এভাবে ফোনে হ্যারাসমেন্টের কারণে। হয়তো আপনি চেষ্টা করেন কাস্টমার কেয়ারের সাথে এমন কাঠখোট্টা আচরণ করতে যেন আর দ্বিতীয়বার কল দেয়ার সাহস না করে। বা অন্তত আপনার বিরক্তিটুকু তার কাছে যেন ভালোভাবে যেন প্রকাশ পায়। বা হয়তো আপনি মুখের ওপরেই ফোনটা ঠাস করে রেখে দেন। 

যারা আপনাকে কল দেয় তারা আসলেও রোবটের মতন কাজটা করেন। তারা আপনার রাগ বিরক্তি প্রকাশের ব্যাপারে ট্রেনিংপ্রাপ্ত। আপনি যে ফোন কেটে দেবেন এতেও তাদের আহত হবার কোনো কারণ থাকে না। কিন্তু এটা তাদের জীবিকার উৎস। তাই তারা করেন। আপনাকে ফোন দেন। ধরুন, একদিন আপনি এমন একটা ফোন পেয়ে কোনো কোম্পানি থেকে ফোন পেয়েছেন ভাবলেন না। ভাবলেন যে একটা মানুষ ফোন দিয়েছে তাকে ফোন দিতে বলা হয়েছে বলে। আপনি সে মানুষটাকে দেখুন। তার কথা শোনার প্রয়োজন নেই, শুধু একটু সুন্দর করে বলুন, যেমন করে একজন  ভিয়াইপি গেস্টকে হয়তো বলতেন যখন কোনো ইমার্জেন্সি কারণে তাকে এটেন্ড করতে না পারেন। কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধিকে বলুন, যে আপু/ভাইয়া কিছু মনে করবেন না, কিন্তু আমি আসলে খুব ব্যস্ত আছি। এরপর সে কথা বাড়াতে চাইলেও তাকে শুধু – স্যরি/ দুঃখিত আপু/ভাইয়া বলুন। একটু বিনয়ের সাথে। একটু নরম সুরে। এবং সে যখন ফোন রাখছে তাকে বলুন – আপনাকে ধন্যবাদ। 

ফোনের ওপারে তার কন্ঠের পরিবর্তন আপনি লক্ষ্য করতে পারবেন। সারাদিনে হয়তো এই প্রথম তার মনে হবে যে সে কোনো কাস্টোমার নয়, একজন মানুষকে ফোন দিয়েছিল। আপনিও অনুভব করবেন যে কোনো কোম্পানির সাথে নয়, কোনো মানুষের সাথে আপনি কথা বলেছেন। 

কত ছোট একটা কাজ, কত ছোট্ট একটা চিন্তা, অথচ কাজটা কত বড়। একজন মানুষের জীবিকা নির্বাহের কাজটাও আপনি সুন্দর করে দিতে পারেন মাত্র ২ সেকেন্ড একটু নরম সুরে কথা বলে। 

এটা ধার্মিক কাজ। এটা পুণ্যের কাজ। এই কাজ স্রষ্টাকে খুশি করে। 

বা হয়তো আপনি একটা প্রোগ্রামে গেছেন। হয়তো কাউকে দেখছেন যে সে তার গেট-আপে বেশ সময় ও শ্রম ঢেলেছেন। হয়তো তাকে সুন্দর লাগছে বা লাগছে না। হয়তো অতিরিক্ত এফর্ট দিতে গিয়ে তাকে অতিরিক্ত লাগছে। তার সাজসজ্জাকে বেমানান লাগছে। বা হয়তো সে নতুন বিয়ে করেছেন, নতুন কোনো বউ। এখন বউ হিসেবে তাকে সুন্দর লাগছে কিনা, তাকে আসলেই বউ বউ লাগছে কিনা, এটা আমাদের দেশে সদ্য বিবাহিত নারীদের জন্যে একটা বেশ টেনশনের ব্যাপার হয়। আমরা ধরে নিলাম যে হয়তো তাকে সেরকম সুন্দর লাগছে না। কিন্তু সে চেষ্টা করেছে, এফর্ট দিয়েছে। এটুকুরই প্রশংসা করুন। একটু এগিয়ে বলুন, বাহ! আপনাকে তো বেশ লাগছে! 

হয়তো এই বলাটা আপনার জন্যে কিছুই না, কিন্তু দেখবেন সে মানুষটার চোখ ঝলমল করে উঠবে। কারণ সে খুব এফর্ট দিয়েছে। তার জায়গা থেকেই খুব চেষ্টা করেছে। 

একই রকম হয় নতুন মা-দের ক্ষেত্রে। বা চাকরিতে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত পেশাজীবী বা ব্যবসা আরও সম্প্রসারণ করছেন যারা তাদের বেলায়ও। তারা কিন্তু বেশ এফর্ট দেন। নতুন মা হিসেবে ঠিকঠাক সব করতে পারছে তো? চাকরিতে তার দায়িত্বটা ঠিকভাবে পালন হচ্ছে তো? তার ব্যবসাতে যে ইনভেস্ট করা হলো, এটা শেষ পর্যন্ত লাভজনক হবে তো? 

তো মানুষদের এই এফর্টগুলোকে কমপ্লিমেন্ট করা ছোট্ট একটা ব্যাপার হলেও তাদের জন্যে এটা বিশাল কিছু। কারণ এটা তাদের মনে সাহস দেয়, উৎসাহ দেয়। তাদের মনের মধ্যে আশা সঞ্চার হয়, সেটা বাহিরে প্রকাশ না করলেও, যে নাহ, আমি তো পারছি, নিশ্চয়ই আমি পারব। আমার অবস্থা যতটা খারাপ ভেবেছিলাম ততটা খারাপ না। শেষ পর্যন্ত আমি পারব।

মানুষকে তার যথাযোগ্য সম্মান দেয়া, তার চেষ্টাটাকে এপ্রিশিয়েট করা, এটাও ধার্মিক কাজ। এটাও পুণ্যের কাজ। 

তো নবীজী প্রতিটা ভালো কাজকে সাদাকা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। এই প্রতিটা ভালো কাজের ব্যাপারে আমরা সচেতন হই না কেন? 

কারণটা আমার মনে হয় আলস্য। আমরা এত চিন্তা করতে চাই না, এত ভাবতে চাই না। ধর্মকে পোশাক আর জায়নামাজে সীমিত করে ফেলাটা আরামের ও সহজের। এর বাইরে কিছু করা না লাগলে তো কথাই নেই! শর্টকাটে বেহেশত পাওয়া যাবে! ওখানে গিয়ে বেশ আয়েশ হবে! 

কিন্তু ধর্মকে জীবনে প্রতিফলন করতে চাইলে, সেটা জীবনের আরেক মাত্রা। ধর্ম যে জীবনকে কীভাবে বিকশিত করতে পারে, জীবন যে কতটা বিশাল হতে পারে, এবং রহস্যের ভেতরেও যে কত বড় রহস্য থাকে, তা আমাদের ধারণা বাইরে। তবে নবীজীর দেখানো পথে একটু একটু করে ধাপে ধাপে আমাদের মনের চোখগুলো এক এক করে খুলে যেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *