বক্তৃতা সংগ্রহ – প্রথম খন্ড আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

সুন্দর মানুষ সুন্দরের পূজা করেন, ঐ পূজার আর্তিতে যে সৌন্দর্য বিভা – তা শুনলেও সৌন্দর্য কিছুটা হলেও ছোঁয়া যায়। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এমন সুন্দর একজন মানুষ।  মানুষ আলোকিত করার জন্য বছরের পর বছর যুদ্ধ করে যাচ্ছেন, শত অন্ধকারেও মশাল ধরে রেখেছেন, আর তার বক্তৃতা বা এমনকি সাধারণ কথা শুনলেও মনে হয় যেন আলোর ছটা এসে ছুঁলো।  তার সত্য সুন্দরের পূজার আর্তি শুনে কিছুটা রেশ পাওয়ার জন্যে এই বইটা কিনেছিলাম।

এমনিতে তার বক্তৃতা শুনলে মনে হয় যেন আরও শুনি আরও শুনি। তার বক্তৃতা সংকলন পড়ে মনে হচ্ছে যে আরও পড়ি আরও পড়ি। যত পড়ি তত সৌন্দর্য এসে বিঁধে, যা আগে ভাবিনি ভাবতে শুরু করি, যা আগে দেখিনি দেখতে শুরু করি। বক্তৃতা বইয়ের প্রথম খণ্ডতে স্যার কথা বলেছেন মোট ১৮টি বিষয়ে, এর মধ্যে আছে শেকড়ের কথা, জীবনের কথা, প্রেমের কথা, সুন্দর মানুষের কথা আর সবচেয়ে বেশী যা প্রিয় –অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ তার নিজস্ব চিন্তা চেতনার কথা।

অনেকেই যাদের এত শত কথা শুনতে ভালো লাগে না, বইটা পড়লে নিশ্চিত এত শত কেন, হাজারো শুনতে ভালো লাগবে। আসলে আমরা গভীরে ডুব দিতে চাই না কারণ গভীরতায় সবাই অভ্যস্ত নই। এমনিতেই জীবনে উটকো ঝামেলার শেষ নেই, এর মধ্যে আবার এই জীবনের গভীরে কি আছে ঘেঁটে দেখবার জন্য অযথা কেন পরিশ্রম –অনেকেই এতে একমত। তবে গভীরে ডুব দিলে কিন্তু বোঝা উল্টো হালকা হয়ে ওঠে।  গভীরতায় জীবন শুধু সুন্দর হয়, হালকা হয়, আনন্দের হয়। এই গভীরতায় ডুব দেবার জন্য  গভীর জলের মানুষের প্রয়োজন, তবে তাদের মধ্যেও সবাই এটা পারেন না। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের একটি মারাত্মক গুণ হচ্ছে তিনি খুব সহজে সবাইকে নিয়ে অতল গভীরে ডুব দিতে পারেন। যারা গভীরতা ভয় পায় তারাও স্যারের কথা শুনলে বা পড়লে অনায়াসে সে আনন্দের গভীরতায় তলিয়ে যেতে পারে।

আর একটা কথা আমি ব্যাক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি – সত্য সুন্দর ও সরল। স্যারের কথাগুলো জীবনের আনাচে কানাচে পারিপার্শ্বিকতা সমাজ ব্যবস্থা ইতিহাস – সবকিছু নিয়ে, এবং তাতে সত্যের সৌন্দর্য ও সরলতার কোন কমতি নেই। এ যুগের অনেকরকম মারপ্যাঁচে প্রভাবিত হয়ে অনেক সত্য থেকে আমরা কোন না কোন ভাবে দূরে সরে যাই। তাই এই মানুষগুলোর আত্মা যেখানে, তাদের বই, তা আসেপাশে রেখে দেয়া দরকার, যাতে বারবার সত্যের কাছে ফিরে আসা যায়। কারণ সত্যের হাত ধরা ছাড়া সত্যিকার অর্থে কিছু করা যায় না। আর দিন শেষে, তা যে কারণেই হোক বা যে উপায়েই হোক, এক জীবনে আমরা সবাই-ই সত্যিকার অর্থে কিছু করতে চাই।

বই থেকে স্যারের কিছু উক্তি এখানে তুলে ধরলাম (পারলে গোটা বইটা তুলে ধরতাম) –

 “এই হল সন্ধ্যা। এর চেয়ে সৌন্দর্যবর্ণিল আর কেউ নয়। কেন সে এত অনিন্দ্য? কারণ, এ দিনের মৃত্যুমুহূর্ত। সে মরে যাচ্ছে। তাই মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করা রাজহংসের মতন সে এমন বর্ণছটায় রক্তিম। জীবনের সমস্ত প্রাণনাকে শেষবারের মতন জ্বালিয়ে দিয়ে সে চলে যাচ্ছে। বলে যাচ্ছে ঃ হে দর্শকরা, আমাকে শেষবারের মতো তোমরা দেখ। এ শিখা আর জ্বলবেনা।
সবকিছু তাই মৃত্যুমুহূর্তেই সবচেয়ে সুন্দর। সুধীবৃন্দ, তাই সন্ধ্যা সুন্দর, মৃত্যু সুন্দর, অস্তায়মান সূর্য সুন্দর।”

“আমাদের বোকা লোক চাই। বোকা হওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ চাই। বোকা না হলে নিজেদেরকে অন্যের জন্য আমরা দেব কি করে? আমাদের কিছু ক্ষুব্ধ, রাগী লোক দরকার। অনমনীয়, আপোষহীন, জেদি লোক। না হলে প্রতিরোধ করবে কারা? আসুন, আমরা কিছু প্রেমবান নির্বোধের মতো আজ অনমনীয় শক্তিতে জেগে উঠি। নিজেদের প্রদীপে অন্যদের প্রজ্বলিত করি।
   হৃদয়কে উদ্বুদ্ধ করাই আসল ঘটনা। কার ভাঁড়ারে কত জ্ঞান আছে, তাতে কিছু এসে যায় না। ব্যবহার না হলে সে বিদ্যায় জং ধরে যাবে। জীবনের ব্যবহারের নামেই জীবন। ”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *